ইসরাত জাহান, বাকৃবি

  ২৪ জুন, ২০২৪

যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো বাকৃবির চার স্বপ

বিজ্ঞানের ভাষায় স্বপ্ন হলো মানুষের কিছু কল্পনার সমষ্টি। মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে পড়ে থাকা অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি বা ভাবনার কাল্পনিক রূপ। বিজ্ঞানের সংজ্ঞাধারী এ স্বপ্নের প্রায় ৫০ শতাংশই মানুষ ভুলে যায় পরবর্তী ৫ মিনিটে। আর এরও ১০ মিনিট পরে ভুলে যায় প্রায় ৯০ শতাংশ। তবে বাস্তব জীবনে স্বপ্ন কথাটির সুন্দর কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। এখন অনেকেই হয়তো বলে উঠবেন, ‘কি মুশকিল! স্বপ্নের আবার ব্যাখ্যা কী করে হয়? ওটা তো শুধু কাল্পনিক!’ তবে বোধহয় তাদের সঙ্গে বাস্তবে দেখা স্বপ্নের পরিচয় ঘটেনি। যে রকম স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থী মো. মেফতাহুল জান্নাত, মো. সামিউল ইসলাম, মো. নাঈমুল ইসলাম এবং ফারহান জামিল ইমন। তাদের ওই স্বপ্ন চারটি হলো লালিত স্বপ্ন, যা তাড়না দিয়েছে সেগুলোকে পূরণ করার। স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে তাদের স্বপ্নগুলো আজ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমা, নিকোলস স্টেট ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক এবং ওয়েস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছেছে। তবে বাস্তবিক স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে একটি শক্ত ভিতের প্রয়োজন। তাদের তিনজনের সেই শক্ত ভিত হলো বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান। একজন কারিগরের চারটি স্বপ্নের সফলতার গল্পই আজ শুনব চলুন।

‘নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস নয়’

জয়পুরহাট থেকে উঠে আসা এক স্বপ্নবাহক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথমশ্রেণির একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শতভাগ স্কলারশিপ পাওয়া আমার কাছে কল্পনার এক বিশাল বাস্তবায়ন। গবেষণার হাতেখড়ি বাকৃবির অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান স্যারের ল্যাবরেটরি অব ফিশ ইকোফিজিওলজি গবেষণাগারে। স্নাতকোত্তরের দেড় বছর সময়ে আমার গবেষণার পথচলাকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছেন তিনি। গবেষণা এবং স্কলারশিপ দুটোর জন্যই প্রয়োজন ধৈর্য, যা আমার মধ্যে ছিল। সারা দিন ল্যাবের খাটুনি, সন্ধ্যায় স্কলারশিপ অন্বেষণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে ই-মেইল পাঠানো আর মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের উত্তরের অপেক্ষাই ছিল দৈনিক কাজ। বারবার অপ্রত্যাশিত উত্তর পেয়েও হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা কখনো মাথায় আসেনি। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সবুরে মেওয়া ফলে’- কথাটির সত্যতা হাতেনাতে পেলাম। একসঙ্গে পেয়ে গেলাম ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমা, ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা এবং ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে শতভাগ স্কলারশিপসহ উচ্চতর গবেষণা ও পড়াশোনার সুযোগ। আমেরিকান প্রফেসরদের সঙ্গে আমার ইন্টারভিউ হতো রাত ১টা থেকে ২টার দিকে। আমার সরকারি চাকরিজীবী ক্লান্ত মা জেগে থাকতেন ওই গভীর রাত পর্যন্ত। দোয়া করতে থাকতেন যেন ইন্টারভিউগুলো সহজ হয়ে যায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবা আমাকে সফলতার মন্ত্র শিখিয়েছেন। মন্ত্রটি হলো ভরসা রাখা ও বিনয়ী থাকা। চেষ্টা করেছি সেটি মেনে চলার। এতগুলো মানুষের চেষ্টায় তৈরি মনোবল দিয়ে অনেক কঠিনপথ পাড়ি দিয়েছি খুব সহজেই। নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস করিনি বলেই আজ আমার স্বপ্ন পূর্ণতা পেয়েছে।

মো. মেফতাহুল জান্নাত

গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিসটেন্ট, ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমা

নরম্যান, ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র

‘আমি পারব- এই আত্মবিশ্বাসটুকু ছিল’

নিজের কৌতূহলী মন থেকেই বিদেশে স্কলারশিপ অর্জনবিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ই-মেইল করতাম। টুকটাক চর্চায় থাকা যাবে এটা ভেবেই চিঠিগুলো পাঠাতাম। ১১ নম্বর মেইলে আশানুরূপ উত্তর পেলাম। তবে সেখানেও কিছু খটকা লাগছিল। দুদিন পরে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওই শিক্ষককে আবার মেইল করলাম। ইংলিশের ওপর দক্ষতার প্রমাণ, জিআরই নম্বর এগুলোর কোনো কিছুই ওনাকে দিতে পারিনি আমি সে সময়। তবে তিনি কিছুটা সময় দিয়েছিলেন নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য। নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকলাম। ক্লাসের পড়াশোনা, গবেষণা ও স্কলারশিপ প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম কিছুদিন। এরই মাঝে হাজির হলো মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে ১৪ দিন সময় হাতে ছিল জিআরই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। তখনই কেমন জানি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলাম, ‘আমি পারব’। পরীক্ষা দিলাম। স্কোর দেখে আশাহত হলাম। তবে আত্মবিশ্বাসকে হারিয়ে যেতে দিইনি। আবারও যোগাযোগ শুরু করলাম প্রফেসরের সঙ্গে। কথা বললাম, কিছুটা ভরসাও পেলাম। পাঠিয়ে দিলাম আমার যোগ্যতার প্রমাণপত্র। দিন গুনতে গুনতে গত বছর নভেম্বরের ১ তারিখ ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমায় আবেদনের নোটিশ পেলাম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও পাঠিয়ে দিলাম। ২ তারিখ ভর্তির কাজ সম্পন্ন হলো। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়ে যাবে এটা কখনোই ভাবিনি। আসলে কাজের পেছনে কিছু ধনাত্মক প্রভাবক থাকলে কাজের গতি বেড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছেন ড. মো. শাহজাহান স্যার। স্যারের নির্দেশনায় গবেষণা কাজের সুবাদে বিশেষ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক জার্নালে বেশ কয়েকটি পেপার পাবলিশ করারও সুযোগ পেয়েছি। গবেষণা আমাকে দক্ষ করেছে। জ্ঞানকে কাজে লাগাতে শিখিয়েছে। এই দক্ষতাগুলো আমার স্কলারশিপ অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। স্কলারশিপের ক্ষেত্রে গবেষণার দক্ষতা বাকি ছোটখাটো অপারগতাকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়। আর মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সাধারণ ছাত্র থেকে গবেষণা কাজে নিজেকে দক্ষ করে তোলার এই পথে আমার বড় আশ্রয় হয়ে ছিলেন ড. মো. শাহজাহান স্যার।

মো. সামিউল ইসলাম

গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যান্ড টিচিং অ্যাসিসট্যান্ট, নিকোলস স্টেট ইউনিভার্সিটি লুইসিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র

‘ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি নতুন প্রস্তুতির’

উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যাব এই একটি অনুপ্রেরণা নিয়ে বাকৃবির মৎস্যবিজ্ঞন অনুষদে ভর্তি হই। প্রস্তুতি পর্যায়ের সবচেয়ে কার্যকর অংশের শুরু হয় ২০২২ সালে ল্যাবরেটরি অব ফিশ ইকোফিজিওলজিতে কাজের মাধ্যমে। তখন স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমি। ইচ্ছা ছিল ২০২৪ সালের ফল সিজনের (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) জন্য আবেদন করব। সে লক্ষ্যেই স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই ড. মো. শাহজাহান স্যারের গবেষণা কাজে সংযুক্ত হয়ে যাই। কাজের ফলস্বরূপ দুটি গবেষণা প্রবন্ধ কিউ ওয়ান জার্নালে (বৈজ্ঞানিক জার্নাল তালিকায় শীর্ষ ২৫ শতাংশ জার্নাল) প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসের মধ্যে ভর্তির আবেদনের সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমি প্রস্তুত করে ফেলি। এ সময় গবেষণার কাজের পাশাপাশি আমার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমেরিকান প্রফেসরদের ই-মেইল করা শুরু করি। আমার ২য় ই-মেইলে মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাই। তবে সেবারে ভর্তির সুযোগ না পেলেও নিজের ভুলগুলো পেয়েছি। এরপর আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে কাজ করতে থাকি। ডিসেম্বরেই আবার ই-মেইল করা শুরু করি। দুই সপ্তাহের মধ্যে স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্ক কলেজ অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ফরেস্ট্রি এর প্রফেসরের সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষা শেষে সুখবরটি শুনতে পাই। আমি সেখানে শতভাগ বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছি। আমার স্নাতক জীবনের এই অল্প অর্জন দিয়ে এত ভালো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগের এই কল্পনাকে বাস্তব করেছে ল্যাবরেটরি অফ ফিশ ইকোফিজিওলজি এবং আমার পরিবারের সবার সহযোগিতা। এই ল্যাব সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা না থাকলে এত ভালো গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ হয়ত পেতাম না। আমার কাজের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তারা আমাকে প্রতিনিয়ত শেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে পরিবারের মানুষগুলো আত্মবিশ্বাস ও ভরসা যোগান দিয়েছে সবসময়। আমার এই অর্জন তাদের সকলের নির্দেশনার আর সহযোগিতার ফলাফল।

মো. নাঈমুল ইসলাম

পিএইচডি শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজ অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ফরেস্ট্রি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

‘গবেষণার প্রতি আগ্রহ আমাকে তাড়া করেছে’

বাকৃবির মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু। শুরু থেকেই গবেষণার প্রতি আলাদা একটি আগ্রহ কাজ করত। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে কঠিন এক ব্রত হয়ে উঠল যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাজে নিজের নামটি লেখব। ইচ্ছা ছিল, চেষ্টাও ছিল। দরকার ছিল ‘কাজ করো, নিজেকে গড়ো’ এমন একটি নির্দেশনা। নিজেকে গবেষণা কাজে এগিয়ে নেওয়ার সেই নির্দেশনা পেলাম আমার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান স্যারের কাছে। স্যারের তত্ত্বাবধায়নে ল্যাবরেটরি অফ ফিশ ইকোফিজিওলজি হয়ে উঠলো আমার নতুন আবাসন। নিজের সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান দিয়ে কাজ শুরু করলাম। কাজ করলাম এবং স্বীকৃতিস্বরূপ কিছু সনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধও প্রকাশিত হলো। একরাশ স্বপ্ন নিয়ে গতবছর জুলাই থেকে আইএলটিএস এর মাধ্যমে শুরু করলাম উচ্চতর শিক্ষার লড়াই। অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলাম। ধাপগুলোর গল্প বলাটা যতটা সহজ কাজগুলো ছিল এর চেয়েও অধিক কঠিন। যাত্রাপথে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিজেকে নিত্যদিন চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। হোঁচট খেয়েছি কিন্তু থামিনি। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাাস করতাম, নিজের লক্ষ্যে অটল থাকলে সফলতা আসবেই। আমার এই বিশ্বাস তৈরি করেছিল আমার তত্ত্বাবধায়কের প্রতিটি সঠিক নির্দেশনা ও আশপাশের ভালো কিছু বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুপ্রেরণা। দেখতে দেখতে এ বছর চারজন প্রফেসরের সঙ্গে ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ পাই। এর মধ্যে মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ওয়েস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি থেকে জীববিজ্ঞান বিভাগে শতভাগ বৃত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাই। এর মধ্যে ফুল টাইম টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ নিয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী হিসেবে ওয়েস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে যাত্রার পথটি বেছে নিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন নিয়ে আমরা চারজন একসঙ্গে কাজ শুরু করেছিলাম। একই ল্যাব থেকে একসঙ্গে চারজনের স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু করা ও স্বপ্ন পূরণ করার নজির আমাকে খুবই আনন্দ দেয়।

ফারহান জামিল ইমন

গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিসট্যান্ট, জীববিজ্ঞান বিভাগ

ওয়েস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি

যুক্তরাষ্ট্র

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close