সাকিবা আক্তার লাবন্য

  ১৯ জুন, ২০২২

মৃৎশিল্পের কথন বাকৃবির ক্যাম্পাসে

বিশ্বে প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করে একেকটি দেশ। একইভাবে বাংলাদেশেরও রয়েছে হাজারও রূপ বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। মধ্যযুগের আগে থেকে বিকাশ ঘটেছে শত ধরনের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের। বাংলাদেশের এমন হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি নির্দশন এবং ইতিহাসের সংরক্ষণশালা হলো মৃৎশিল্প।

মৃৎশিল্পকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো ঐতিহ্য বা ইতিহাস চিন্তা করা যায় না। এই ঐতিহ্যের রূপকার হলেন কুমার। সাধারণত আমাদের দেশের কুমার পেশাজীবীরা হিন্দু সম্প্র্রদায়ভুক্ত। বংশপরম্পরায় তারা এই কাজ করে আসছেন। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না মৃৎশিল্প কী? মৃৎ মানে মাটি আর শিল্প মানে সুন্দর সৃষ্টিশীল বস্তু। তাই মাটি দিয়ে নিজ হাতে তৈরি শিল্পকে মৃৎশিল্প বলে। কুমাররা তাদের সুনিপুণ হাতের দক্ষতা, মনের সব কারুকার্য ও মাধুরী মিশিয়ে করে থাকেন চোখ ধাঁধানো সব কাজ। মাটি দিয়ে তৈরি এই শিল্পের মধ্যে রয়েছে হাঁড়ি-পাতিল, চাড়ি, কলস, খানদা, ফুলের টব, ফুলদানি, জীবজন্তু, পাখির অবয়ব, ঘটিবাটি, ডাবর-মটকি, প্রতিমা, মাটির ব্যাংক, শোপিস, পিঠা তৈরির ছাঁচ ও নানা রকম খেলনা। এই শিল্পের প্রধান হাতিয়ার হলো মাটি। মাটিকে ভালোবাসতে না পারলে এই শিল্পের প্রতিকৃতি ফুটে উঠে না।

কালের বিবর্তনে শিল্পায়নের যুগে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার গৈৗরবমন্ডিত ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প। বাজারে যথেষ্ট চাহিদা না থাকায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজের পরিধি পরিবর্তন না করা, কাজের নতুনত্বের অভাবসহ নানা সমস্যার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলার বহু বছরের শিল্প। এ ছাড়াও প্লাস্টিক, স্টিল, ম্যালামাইন, সিরামিক ও সিলভারসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা তৈজসপত্রের সহজলভ্যতা ও

নানাবিধ সুবিধার কারণে দিন দিন প্রাণ হারিয়ে প্রায় নিষ্প্রাণ এখন মাটির তৈরির শিল্পকর্ম।

মৃৎশিল্পের ভাটা পড়া শাখাকে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগিয়ে মানুষের দ্বারে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ মৃৎশিল্পী ফোরাম। তারা টেরাকোটা বা মৃৎফলককে খোদাই করে সুন্দর সুন্দর শোপিস তৈরি করেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন মূর্তি, নকশিপাত্র, ঘণ্টা ইত্যাদি তৈরি করছেন।

বাংলাদেশ মৃৎশিল্পী ফোরাম পুরোনো গৌরবকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন সময় পোড়ামাটির গহনা প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় একের পর এক প্রদর্শনী করে তাদের ৩০তম একক মৃৎশিল্পী-পোড়ামাটির গহনার প্রদর্শনী আয়োজন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) টিএসসি মিনি কনফারেন্স রুমে। ওই প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম। প্রদর্শনীটির সময়কাল ৬ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ছিল। নকশিপাত্র ও বিভিন্ন অলংকার যেমন মালা, চুড়ি, ব্রেসলেট ইত্যাদি উপস্থাপন করা হয়। প্রদর্শনী দেখতে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্লাসের ফাঁকে বা অবসর সময়ে কেউ কেউ বারবার এসে ঘুরে যান। দর্শনার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই ছিল বেশি। মেলায় মাটির তৈরি অলংকারগুলো সূলভ মূল্যে পাওয়ায় তাদের খুশির সীমা ছিল না। ময়মনসিংহের নানা স্থান থেকে বহু মানুষের আগমন ঘটে এই প্রদর্শনীতে।

বাংলাদেশ মৃৎশিল্পী ফোরামের শিল্পী শহীদুল হাসান বলেন, প্রাচীনকালের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা। আর তাই আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকি। যাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে প্রাচীনতম ও গৌরবমন্ডিত এই ঐতিহ্যের কথা। সেই চিন্তা করেই প্রদর্শনীতে বস্তুর মূল্য ক্রেতদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের কাসফিয়া হোসেন বলেন, ছোট থেকে ঢাকায় বড় হওয়ায় মৃৎশিল্পের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। প্রদর্শনী দেখে মনে হচ্ছে মাটির নগরীতে চলে এসেছি। আমাদের পায়ের নিচের মাটি দিয়ে যে এত সুন্দর আর মায়াবিনী শিল্পকর্ম করা যায়, ভাবতেই অবাক লাগছে। এই শিল্পের নিখুঁত ও সুনিপুণ কাজ যত দেখছি, ততই মৃৎশিল্প সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মাচ্ছে। মনে হচ্ছে বাঙালিদের কতইনা বাহারের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। আশা করি এমন উদ্যোগ আরো বেশি বেশি করে নেওয়া হবে। এতে করে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে হাজার বছরের পুরোনো এই মৃৎশিল্প।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close