প্রফেসর মো. আবু নসর

  ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট...

‘হৃদয়ে লালন করি বাংলা ভাষাকে’

বরেণ্য শিক্ষাবিদদের মতে, এই উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা হচ্ছে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই উপমহাদেশে নবজাগরণের সূচনা করেছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন এখন আর একপক্ষীয় দাবি বা কর্মসূচি নয়, বরং বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য সংস্কৃতির সমৃদ্ধকরণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতিফলন।

ভাষার মাস প্রত্যয়দীপ্ত একটি মাসই শুধু নয়, এটা স্বাধীনতার সোপান, জাতীয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের বাতিঘর।

ভাষার মৃত্যু হয় দুভাবে। যখন সংশ্লিষ্ট কোনো ভাষায় কথা বলার লোক বেঁচে থাকে না এবং যখন কোনো ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই সেই ভাষাকে অবহেলা করে। কথা বলার মানুষের অভাবে বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে না, কিন্তু ভাষাভাষীদের অবহেলার কারণে বাংলা ভাষার কার্যকর মৃত্যুর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলা ভাষা এখন অনেকটা স্বদেশে পরবাসীর মতো।

উপমহাদেশের বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য প্রথম দাবি উত্থাপন করেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯২০ সালের বিশ্ব ভারতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা ভাষার দাবি পেশ করেন। ওই প্রবন্ধে তিনি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করে বলেন, ‘শুধু ভারতে নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ।’ ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই দৈনিক আজাদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা নামে তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই প্রবন্ধে বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবিই সবচেয়ে বেশি এবং গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণ করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও সূত্র অন্বেষণ করতে গেলে সবার আগে মনে আসে বহু ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের কথা। এরপরই আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আবুল কাশেম ও তমদ্দুন মজলিশের ঐতিহাসিক ভূমিকা।

শুধু বাংলাদেশে নয়, উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিলেন সৈয়দ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯১১ সালে রংপুরে শিক্ষা সম্মেলনে তিনি যুক্তিসহকারে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার জোর সুপারিশ করেছিলেন। ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্যও প্রথম লিখিত প্রস্তাব করেছিলেন তিনি। এ প্রস্তাব পেশ করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে বলেছিলেন, ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে।’

ব্রিটিশ আমলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দানের বিষয়ে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন আলহাজ আবদুল হামিদ চৌধুরী ওরফে সোনা মিয়া। তিনি ১৯২৭-২৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আসাম পরিষদের শ্রীহট্ট সদর-মহাকুমা সদর দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে আসাম ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। সরকারের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও তার দাবির মুখে আসাম ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষার বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি প্রদানে সরকার বাধ্য হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাসিম কর্তৃক প্রাদেশিক কাউন্সিলের কাছে পেশ করা খসরা ম্যানিফেস্টোতে বাংলাকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন আবুল মনসুর সম্পাদিত দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা ভাষাই হইবে ইহা বলাই বাহুল্য’ বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়। একই বছরের ৩০ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা শীর্ষক প্রবন্ধে আবদুল হক বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন।

১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ সিয়েরালিয়ন। ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ বাংলাকে সে দেশের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। আশা করা যায় অচিরেই বাংলা জাতিসংঘেরও অন্যতম ব্যবহারিক ভাষা হয়ে উঠবে।

বিশ্বে প্রচলিত প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা সমমর্যাদায় আপন স্থান অধিকার করেছে। বাংলা ভাষায় এখন বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি লোক কথা বলেন। অনুমান করা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাভাষীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩২ কোটি। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, প্রচলিত ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলার স্থান চতুর্থ। আর ভাষিক বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। এ বিচারে বিশ্বের প্রধান ১০টি ভাষা হলো- মান্দারিন (চীনা), ইংরেজি, হিন্দি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, আরবি, বাংলা, রুশ, মালয়, ইন্দোনেশিয়ান ও ফরাসি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামের ভেতরে স্থাপিত কলেজে প্রথম বিদেশিদের জন্য বাংলা ভাষায় পাঠদান শুরু হয়। উইলিয়াম কেরি ৩০ বছরের বেশি সময় বাংলা চর্চা করেন এবং বাংলায় শিক্ষকতা করেন। তিনি বাংলায় পাঠ্যবই প্রকাশেরও ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য, ১৮৩৫ সালে ফরাসি ভাষার আধিক্য খর্ব হতে থাকে। ফারসির পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠী বাংলা শিখতে উদ্যোগী হয়। যার ফলে ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ চালু হয়। কিন্তু ১৮১৭ সালে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে বাঙালিদের ইংরেজি শেখানোর চেষ্টা চলে। ফাদার জেমস ১৮৩৬ সালে প্রায় ৬০০০ বাঙালিদের ইংরেজি শেখান।

পরে জার্মানির মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয়, হাইডেল বার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ বিভাগ এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা চালু করা হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল বহু ভাষা আর জাতিগোষ্ঠীর মিলনকেন্দ্র। দীর্ঘকাল থেকে এখানে উল্লেখযোগ্য সাত থেকে দশটি প্রতিষ্ঠিত জাতিগোষ্ঠী বাস করত। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিও ছিল। জানা যায়, বাংলার আদিম অধিবাসীদের ভাষা ছিল অষ্ট্রিক। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসন থেকে মুক্ত হয় ভারতীয় উপমহাদেশ। দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় ভারত। ফলে স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গেই দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে এ উপমহাদশের ভাষাসহ সবকিছু।

ইংরেজ আমলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীরা এ দেশে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধি করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯২ সালে কংগ্রেসের রাজশাহী সম্মেলনে প্রথম মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রথম মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন। বাংলাকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য বা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক ভাষায় উন্নীত করে গেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাংলাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় উন্নীত করে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস প্রাচীন। ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে ভাষার জন্ম আজ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ বছর আগে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক অবদান সর্বজনবিদিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম নয়, ভাষা আন্দোলন ছিল লাহোর প্রস্তার অনুযায়ী পাকিস্তান আন্দোলনেরই বর্ধিতরূপ। ইতিহাসের পেছনে যেমন ইতিহাস থাকে, তেমনি বায়ান্নর পেছনের ছিল আটচল্লিশ। ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ সংঘটিত হয় বাংলা ভাষার দাবিতে প্রথম সফল গণবিস্ফোরণ। শুধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ নয়, আমরা দেখেছি ১৯৪৭ সালেও রয়েছে ভাষা আন্দোলনের এক গৌরবময় সূচনা-পর্ব। বায়ান্নর গোড়ায় যেমন ছিল আটচল্লিশ, তেমনি আটচল্লিশের গোড়ায় ছিল সাতচল্লিশ। বলতে গেলে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হয়েছিল ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভাগাভাগির প্ল্যাটফরম। সে হিসেবে বলা যায় ১৪ আগস্টের আগে যেমন রচিত হয় ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত-পর্ব, তেমনি ১৯৪৭ সাল ছিল এ আন্দোলনের সূচনা-পর্ব। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম সফল বিস্ফোরণ-পর্ব এবং বায়ান্নর একুশ ফেব্রুয়ারি ছিল চূড়ান্ত বিস্ফোরণ-পর্ব। এর কোনো একটাকে অন্যটা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই।

মাতৃভাষার মর্যাদা জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। মাতৃভাষাকে যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন করতে না পারলে সে জাতিকে চিরদিন আত্মগ্লানিতে ডুবে থাকতে হবে। তাই মাতৃভাষা সব মানুষের পরম সম্পদ। মাতৃভাষার অধিকার সর্বাগ্রে আর ভাষা আন্দোলন আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু বাংলাকে এখনো পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ করতে পারিনি। ভাষা আন্দোলন শেষ হলেও ভাষা সংগ্রাম শেষ হয়নি। বাংলা ভাষা যেন ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক না হয়। বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চা সমুন্নত রাখতে হবে। আসুন, হৃদয়ে লালন করি বাংলা ভাষাকে, সর্বত্র ধারণ করি বাংলা ভাষাকে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close