ব্রেকিং নিউজ

আগস্ট এলেই শ্রদ্ধায় অবনত হয় বাঙালি

জান্নাতুন নিসা

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

আগস্ট মানেই স্বাধীন বাঙালি জাতির বেদনাবিধুর শোকের মাস। দুঃখ, লজ্জা এবং অসহনীয় কষ্টের মাস। তাই আগস্ট এলেই শ্রদ্ধায় অবনত হয় বাঙালি; ডুকরে কেঁদে ওঠে ভাবাবেগে আর চারদিকে কেবলই স্রোত নামে শোকস্তব্ধ মানুষের। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, আগস্ট গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার বা খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের অষ্টম মাস। যা কি না রোমান জাতি তাদের সম্রাট আগস্টাসের সম্মানে নামকরণ করেছে। অথচ বীরের জাতি বাঙালি যার নেতৃত্বে আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ ছিনিয়ে এনেছে, তাকেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে বিপন্ন বাতাসের হাত ধরে রক্তাক্ত হলিখেলায় মেতে ওঠে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। আর তাই বাঙালি জীবনে ১৫ আগস্টÑ শোকার্দ্র বাণী পাঠের দিন; এদিন মানুষ কাঁদে, বেদনায় গান গায়, নামে শোকের মিছিল। এ যেন কেবল একটি দিন নয়, পূর্ণ একটি মাসের খেরোখাতা। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশে এ মাসে বাঙালি জাতির ওপর নেমে আসে ভয়ংকর এক কালো থাবা। আর সেই কালোর শোকে বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে গোটা দেশ, দেশের মানুষ। যুগে যুগে, জাতিতে-জাতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বা টিকে থাকতে খুব স্বাভাবিকভাবেই লড়াই-সংগ্রাম চলেছে। তবে সেই লড়াই-সংগ্রাম যদি হয় সভ্য সমাজের কিংবা সুন্দর জীবনের জন্য তাহলে তা হয়ে উঠে আলোকিত কিংবা গ্রহণীয়। বাঙালির ইতিহাসে সংগ্রাম আর বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছে হাজার বছর ধরে। হাজার নদীর জলধারা যেমন মিলিত হয় কোনো এক মোহনায়। তেমনি হাজার বছরের বিদ্রোহের আগুনের সন্নিবেশ ঘটিয়ে জন্মেছিলেন আমাদের টুঙ্গিপাড়ার খোকা। যার জন্মের মধ্য দিয়ে ধরণিতে সূর্য ছড়িয়েছিল মুক্তির আভা। বাঙালির মুক্তির তাগিদেই তিনি জন্মেছিলেন ধরণিতে, উড়িয়েছিলেন মানবমুক্তির কেতন, গেয়েছিলেন শোষিতের জয়গান আর তার আগমনী বার্তায় হয়েছে শোষকের প্রস্থান। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালি। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই বঞ্চিত মানুষের মুক্তির ঠিকানা। মানবতার মুক্তির সেই দূতকেই হারতে হয়েছে মানুষরূপী অমানুষের কাছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, কাকডাকা ভোরে বিপথগামী সেনাসদস্য আর হায়েনারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাঙালির ললাটে এঁকে দেয় কলঙ্কের তিলক। ঠিক যেন ভরা পূর্ণিমার বুক চিরে বেড়ে ওঠা ঘোরতর অমানিশার রাত। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল, তখনো বৃষ্টি ঝরছিল, তবে তা ছিল স্বাধীন বাংলার আকাশ-বাতাস-প্রকৃতির অশ্রুপাত। সমগ্র বাংলায় কেঁদেছে ভেজা বাতাস। ঘাতকদের ঔদ্ধত্য সঙ্গিনের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়। বেদনার্ত হাহাকার কাল থেকে কালান্তরে সেই সঙ্গে সীমানার গ-ি পেরিয়ে গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। স্তম্ভিত সেই আকুতি স্বাধীন বাংলায় নদীর স্রোতের মতো চির বহমান। শ্রাবণের অনিঃশেষ করুণধারা আগস্ট মাসে বারংবার ছুঁয়ে যায় বাঙালিকে, মনে করিয়ে দেয় পিতা হারানোর বেদনা। ১৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় শোক দিবস। প্রজন্মের কাছে পিতৃহীন স্বদেশের বেদনাবিধুর আর শ্রীহীন চিত্র তুলে ধরতে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়। আর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে স্মরণের আবরণে মরণকে ঢেকে রেখে আমরা ঘাতকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলি এই দিনে।

১৯৭৫ সালের শ্রাবণের অন্তিম দিনে সেদিন বৃষ্টি নয়, ঝরেছিল বুকের তাজা রক্ত। বাঙালি জাতির এত বড় একজন নেতা আর কোনো দিন জন্মাবে না। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব এক দিনে তৈরি হননি। এমনকি তিনি হঠাৎ কোনো চায়ের দোকানে বা প্রেস ক্লাবে ঘোষণা দিয়ে নেতা হননি; পারিবারিক তেমন কোনো পরম্পরাও ছিল না তার। তিনি কোনো দেবতা হয়ে নয়, ভূমিপুত্র হিসেবে একেবারেই মাটি থেকে উঠে এসেছিলেন। নরম মাটির গন্ধ ছিল তার শরীরজুড়ে। তার নিজের ভাষায় বলা চলে, রীতিমতো ‘চোঙা ফুঁকে’ রাজনীতিবিদ হয়েছেন তিনি। দুই দশকের রাজনীতির পরিক্রমায় তিনি হয়ে উঠেন বাঙালির আশা-ভরসার প্রতীক। বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বন্ধু এই মহৎ হৃদয় মানুষটির দেশ আর মানুষের সঙ্গে ছিল আত্মার আত্মীয়তা। এই ভালোবাসা, এই আত্মীয়তাই ছিল তার শক্তির উৎস। মোহনায় মিলিত হওয়ার পর নদীর জলধারা যেমন আলাদা করার উপায় নেই; তেমনি বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ ভিন্নমাত্রায় অভিন্ন হয়ে উঠেছে।

স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে সেদিন যখন এই বাংলাদেশেরই কতিপয় লোভী, বিশ্বাসঘাতক কুলাঙ্গার ও পথভ্রষ্ট সেনাসদস্য বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে; তখন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বিশাল বুক থেকে তাজা রক্ত ঝরেছিল লাল-সবুজ পতাকার আঁচলে। যুগে যুগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেনÑ মার্টিন লুথার কিং, লিংকন, লুমুম্বা, কেনেডি, মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধীর মতো নেতারাও। কিন্তু কাউকেই বঙ্গবন্ধুর মতো সপরিবারে হত্যা করা হয়নি। সেই কালরাতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, আত্মীয়স্বজনসহ ২৬ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘাতকদের বুলেট থেকে শেখ রাসেলের মতো ছোট্ট শিশুও রেহাই পায়নি! নির্মম সেই হত্যাযজ্ঞে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বর্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যে কাজটি করার দুঃসাহস করেনি, সেই কাজটিই করেছে বর্বর পিশাচের দল। দেশের মানুষের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েও স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই জাতির চেতনায় তিনি চিরঞ্জীব। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে যখন আলোর নিশানা দেখিয়ে এগিয়ে নিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু, ঠিক তখনই ‘আগস্ট’ নামের অন্ধকার নেমে আসে। স্বাধীনতার সূতিকাগার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে ঘাতকের দল হামলা চালায় গভীর রাতে। আগস্টের সেই রাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হত্যা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে। কেবল তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেসময় দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান। বিশ্ব ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেদিন তারা কেবল বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার সঙ্গে বাঙালির হাজার বছরের প্রত্যাশার অর্জন স্বাধীনতার মহত্তম আদর্শগুলোকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। মুছে ফেলতে অপপ্রয়াস চালিয়েছিল বাঙালির বীরত্বগাথার ইতিহাসও। কবির ভাষায়Ñ ‘তারা বুঝতে পারেনিÑ/৩২ নম্বরে সেই বাড়িটির রক্তাক্ত সিঁড়িগুলোর আর্তনাদÑ/প্রতিধ্বনিত হবে স্বাধীন বাংলার আকাশে-বাতাসে।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/বঙ্গমাতার শুভ্র শাড়ি ও পানের বাটা,/সেই ছায়া সুনিবিড় বাড়িটিকে আগলে রাখবেÑ/পরম মমতায়, বছরের পর বছর।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/ছোট্ট রাসেলের সেই যেÑ/ছাই রঙা জামা-জুতো, সাইকেল/নতুনের জয়গানে পথ চেয়ে থাকবে অনন্তকাল।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/তারুণ্যদীপ্ত শেখ কামালের পিয়ানো আর সেতার/সুর খুঁজে বেড়াবেÑ/লাল-সবুজের এই বাংলাদেশে।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/কামালের নবপরিণীতা বধূ সুলতানা কামাল,/যুগের পর যুগ উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেÑ/বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের আকাশে।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/সোহাগী যতনে গুছিয়ে রাখা/শেখ জামালের সাহসী ঊর্দিটিও/কাচের ভেতরে মুহুর্মুহু স্লোগানে/বিপ্লবী বাংলার পতাকা হয়েÑ/পতপত করে উড়বে বাংলার আকাশে।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/চন্দ্রমল্লিকার ভালোবাসায় ফুটন্ত গোলাপের মতো সুশ্রী বলেই/জন্মের পর বঙ্গবন্ধু যার নাম রেখেছিলেন রোজী,/মাত্র ত্রিশ দিনের পরিণত হাতের মেহেদীর গন্ধ/ম ম করে সুরভী ছড়াবে কালের বুকে।/আসলেই তারা বুঝতে পারেনিÑ/বঙ্গবন্ধুর নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাথা হয়েÑ/বেজে যাবে কাল থেকে কালান্তরে।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/তাই বুঝি, তারা নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল ‘স্বাধীনতার সূর্য’/বাংলার বন্ধু, বিশে^র বন্ধু- বঙ্গবন্ধু নামের প্রদীপ।/কিন্তু তারা বুঝতে পারেনিÑ/স্বাধীন বাংলায়ও যে, সূর্য ওঠবে রোজ।/আর বঙ্গবন্ধু নামের কেতন উড়িয়ে/স্বপ্নজয়ের প্রত্যয়েÑপ্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে চলবে প্রতিদিন।/তারা বুঝতে পারেনিÑ/জয়বাংলা স্লোগানে/বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে এগিয়ে চলবে বাংলাদেশ/জনকের স্বপ্ন পূরণে।’ তবে অনেক কিছুর পরও শোকের মাসে এসে আমরা থমকে দাঁড়াই। কারণ, পিতার সে স্বপ্নে অপূর্ণতা রয়ে যায়। আর সে অপূর্ণতা যেন কেবলই স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হারানোর, কেবলই পিতা হারানোর।

 

"