বিনয় আর সারল্যেপূর্ণ বাংলার সূর্যসন্তান : শেখ কামাল

বাদল চৌধুরী

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

তারুণ্যদীপ্ত, সদা হাস্যোজ্জ¦ল এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আজন্ম স্বাপ্নিক মানুষ শেখ কামাল যিনি স্বপ্ন দেখতেনÑ ফুটবল, হকি কিংবা ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। যিনি স্বপ্ন দেখতেনÑ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত বাংলাদেশের। তবে সে স্বপ্ন দেখেই তিনি ক্ষান্ত হননি। সেই লক্ষ্য রচনা করেছেন প্রায়োগিক নীতিমালা আর আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন সবক্ষেত্রেই। উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টে দিয়েছিলেন সব খেলার ধারাবাহিকতা। সেই সুবাধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। শৈশব থেকে বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহ ছিল তার। কেবল তাই নয়! পড়াশোনা, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার প্রচেষ্টায় সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন শেখ কামাল। অধ্যয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিম-ল তার পদচারণায় ছিল মুখর। সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে সমাজকে মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে মঞ্চনাটক পরিচালনা করতেন। দেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শেখ কামাল একজন প্রথম সারির সংগঠক ছিলেন। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিত, সংগ্রামী ও আদর্শবাদী কর্মী হিসেবে শেখ কামাল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

শেখ কামাল শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ কামাল সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই সব ধরনের খেলাধুলায় প্রচ- আগ্রহ ছিল তার, ঢাকার শাহীন স্কুলে থাকাকালীনই বিষয়টি সবার নজরে আসে। তবে ক্রিকেটটা তাকে টানত সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলার ছিলেন, নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর প্রচ- গতি দিয়ে খুব সহজেই টালমাটাল করে দিতেন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে। অবিভক্ত পাকিস্তানের অন্যতম উদীয়মান পেসার ছিলেন। কিন্তু একমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে এবং মুজিবের ছেলে হওয়ার অপরাধে এই প্রতিভা অবহেলিত, উপেক্ষিত হয়েছেন নিদারুণভাবে। শেখ কামাল আজাদ বয়েজ ক্লাবে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাসিন্দা শেখ কামাল বাস্কেট বল টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। বাস্কেটবলে তার অসামান্য দক্ষতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার হলের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিল দীর্ঘ সময়।

’৭২-এ ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার নামে সংগঠিত করেন ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোর্টিং’, আর ক্রিকেট, হকির দল ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’। পরে এসব দলের সমবায়ে বন্ধুদের নিয়ে ধানমন্ডির সাতমসজিদ এলাকায় নবোদ্যমে গড়ে তোলেন ‘আবাহনী ক্রীড়াচক্র’। উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল ক্লাব ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আধুনিকতার নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন। বিশেষ করে ফুটবল খেলায় তিনি গোটা উপমহাদেশেই পশ্চিমা স্টাইলে বিপ্লব এনেছিলেন। জাতীয় দলের কোনো বিদেশি কোচ ছিল না। ঠিক তখন ১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য বিদেশি কোচ বিল হার্টকে এনে ফুটবলপ্রেমীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন শেখ কামাল! ১৯৭৪ সালে আবাহনী যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘আইএফএ’ শিল্ড টুর্নামেন্ট খেলতে যায়, তখন আবাহনীর বিদেশি কোচ আর পশ্চিমা বেশভুষা দেখে সেখানকার কর্মকর্তা আর সমর্থকদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল। এখন উপমহাদেশে জাতীয় দল থেকে শুরু করে ক্লাব পর্যায়ে বিদেশি কোচের ছড়াছড়ি। অথচ শেখ কামাল তা করেছিলেন সেই ১৯৭৩ সালে। আমাদের দেশের ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মান উন্নয়নে শেখ কামাল অক্লান্ত শ্রম দিয়েছিলেন। ক্রীড়াজগতে তিনি রেখেছেন অপরিসীম অবদান। পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য প্রশিক্ষণশিবির গড়ে তুলেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে হাতিয়ার তুলে নিয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি হিসেবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংগঠিত করেন। হকিতে নতুন দিনের সূচনা করেছিলেন কামাল। যোগ্যতা, দক্ষতা আর মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি দেশপ্রেমের অসামান্য স্ফুরণে এই মানুষটা বদলে দিচ্ছিলেন সদ্য স্বাধীন একটা দেশের পুরো ক্রীড়াক্ষেত্র।

শেখ কামাল খেলাধুলাকে জীবনের এতটাই অপরিহার্য অংশ মনে করতেন যে, যাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনিও ছিলেন একজন বড় খেলোয়াড়। দৌড়বিদ সুলতানা খুকিকে শেখ কামাল ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বিয়ে করেছিলেন। এক মাসও ঘর-সংসার করা হয়নি তাদের। রূপকথার চেয়েও অসম্ভব সুন্দর তাদের ভালোবাসার পরিণয় স্থায়ী হয়েছিল মাত্র এই কয়েকটা দিন। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু নর্দমার কীটের হাতে নির্মম ব্রাশফায়ারে শহীদ হয়েছিলেন শেখ কামাল। খুনিরা আর সবার সঙ্গে নববধূ সুলতানা খুকিকেও হত্যা করে সে ভয়াল শেষ রাতে।

শুধু ক্রীড়াই নয়, শিল্প-সাহিত্যের সব শাখা পুনর্গঠনে তিনি পালন করছিলেন অসামান্য অবদান। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শেখ কামালের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছায়ানট থেকে সেতার শিক্ষার তালিম নেন। এর মাঝে ৬৯ সালে পাকিস্তানি জান্তা রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে ধর্মীয় উগ্রতার পরিচয় দিয়ে। কিন্তু শেখ কামালকে কি আর থামানো যায়? বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার সন্তান তিনি, নেতৃত্বগুণ আর জাতীয়তাবোধের চেতনা তার ধমনিতে জন্ম থেকেই বাই ডিফল্ট সেটআপ করা। তার প্রতিবাদের ভাষা হলো রবীন্দ্রসংগীত, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যেখানে যখনই সুযোগ পেলেন, তখনই বিশ্বকবির গান গেয়ে অসহিংস প্রতিবাদের অসাধারণ উদাহরণ রাখলেন তিনি। ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালের সংগীতের ওপর দখল ছিল বেশ। তার গলা বেশ ভালো ছিল। একবার একটি ডকুমেন্টারিতে শেখ কামাল গান গেয়েছিলেন। শুধু গান গাইলেও তিনি বাংলাদেশের বড় তারকা হয়ে বেঁচে থাকতেন আমাদের মাঝে, এ কথা বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। শেখ কামাল সংগীতে কী রূপ প-িত হয়ে উঠেছিলেন, তার একটা উদাহরণ দিই। তিনি নিজ দায়িত্বে বন্ধুদের সহযোগে ‘স্পন্দন’ নামে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি ব্যান্ডদল গঠন করেছিলেন। এ গানের দলের মাধ্যমে তিনি পল্লীগীতি আর আধুনিক নানা সংগীত যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় করে দেশের সংগীতজগতে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে তিনি ছিলেন সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠক এবং অভিনেতা। প্রকৃতপক্ষে শেখ কামাল ছিলেন একজন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমনা সুকুমার মনোবৃত্তির মানুষ। তিনি কখনো ব্যবসায়িক কার্যকলাপে জড়িত হননি, অনর্থক ছোটেননি অর্থের পেছনে। আচার-আচরণে অতি সহজ সদালাপী, সদা হাসিখুশি মনখোলা প্রাণবন্ত শেখ কামাল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি কী হতেন? শহীদ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। মাত্র ২৬ বছরের অতিক্ষুদ্র জীবনকে তিনি অসামান্য সব কর্ম দিয়ে সাজিয়েছিলেন, মাতৃভূমির ইতিহাসের অন্যতম সূর্যসন্তান হিসেবে নিজেকে চিনিয়ে গিয়েছিলেন অসম্ভব বিনয় আর সারল্যে।

 

"