বঙ্গবন্ধু ও ছয় দফা

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচিকে ‘ম্যাগনা কার্টা’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ছয় দফা প্রকৃতপক্ষেই ছিল বাঙালিদের মুক্তির সনদ। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে সব ধরনের মুক্তি আসার যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল তা অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। অথচ মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন ও আদায় সব ক্ষেত্রেই (পূর্ব) বাংলার মুসলমানদের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। যদিও ইংরেজি চঅকওঝঞঅঘ পাকিস্তান শব্দটি যেসব (তৎকালীন ইংরেজ শাসিত ভারতের) প্রদেশের আদ্যাক্ষর নিয়ে প্রণয়ন করেছিলেন চৌধুরী রহমত আলী তার মধ্যে ‘বাংলা’ ছিল না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দ্বারা তাড়িত হয়ে (পূর্ব) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে তখন যে পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিম আমলা তথা এলিট গোষ্ঠী ছিল তারা শুধু তাদের নিজেদেরই স্বার্থ দেখত, মুসলমান, হিন্দু বা অন্য যেকোনো ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের স্বার্থ তারা অবহেলা করত। যেমনটি পাকিস্তানে এখনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আচরণ করা হয়ে থাকে। ১৯৬০ সালের দিকে তৎকালীন পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির বিতর্কে এবিএম রুহুল আমিন বলেছিলেন, বাঙালিদের ‘মানবাধিকারের’ প্রতি দীর্ঘকালব্যাপী এই অবহেলা বৃথা যাবে না এবং এমন একসময় আসবে যখন সরকারকে জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং একসময় আসবে যখন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম... আমাদের যুবক ভাইয়েরা, ছেলে এবং মেয়েরা ‘শুভ বিদায়’ বলতে বাধ্য হবে। ( “ধ ফধু রিষষ পড়সব যিবহ ড়ঁৎ ভঁঃঁৎব মবহবৎধঃরড়হং—ড়ঁৎ ুড়ঁহম নৎবঃযৎবহ, নড়ুং ধহফ মরৎষং রিষষ নব পড়সঢ়বষষবফ ঃড় ংধু ‘এড়ড়ফ নুব”) [ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব পাকিস্তান ডিবেটস, ভলিউম ২, নম্বর ১৭, ১৯৬৫, পৃষ্ঠা ১২৭৮ দ্রষ্টব্য]

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে যে সরকার গঠিত হয়েছিল তা বাতিল করা হয় এবং ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের নেতৃত্বে সামরিক আইন জারি করা হয় ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এ সময় সামরিক শাসনের অধীনে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এভাবে তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি আদায়ের শাসনতন্ত্রসম্মত সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে (পূর্ব) বাংলাকে অরক্ষিত রাখার মাধ্যমে পাকিস্তানের ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও ছয় দফা ছিল আওয়ামী লীগের জয়লাভের ভিত্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষক, পন্ডিত, কূটনীতিক এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ক্রেইগ ব্যাক্সটারের মতে, ‘ছয় দফা’ ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ‘বেসিক প্ল্যাটফরম’। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের আগে ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত বিরোধী দলের এক কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। তবে কনভেনশনের সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ছয় দফা নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করতে দেননি। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৬৫ সালের সেপ্টেবরে ভারতে পশ্চিম ফ্রন্টে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলের এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যুদ্ধটি যদিও অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল তথাপি ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের ভূখন্ডের বড় একটি মূল্যবান অংশ হারিয়েছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উদ্যোগ এবং পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকের মধ্য দিয়ে এটি মীমাংসিত হয়। এখানে দুই বিবদমান প্রতিবেশী সম্মত হয়, উভয় দেশ তাদের দখলীকৃত ভূখন্ড থেকে সৈন্য অপসারণ করবে এবং ভবিষ্যতে সব সমস্যা দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা এবং কূটনৈতিক দেন-দরবারের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

বিরোধী দলগুলোর লাহোর কনভেনশনে উত্থাপিত হলেও সেখানে ছয় দফা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে না দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু ১১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলন করে ছয় দফা সম্পর্কে বিস্তারিত জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। ছয় দফা প্রচার ও প্রকাশের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় সদস্যবিশিষ্ট উপকমিটি গঠন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে ১৪৪৩ জন কাউন্সিলর বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত করেন। ছয় দফা কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর একান্ত ঘনিষ্ঠ অনুসারী জননেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ছয় দফা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ বস্তুত ছয় দফা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর।

ছয় দফা দাবি কালক্রমে ব্যাপক বিস্তৃত আন্দোলন, যা পরবর্তীকালে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার দিকে এগিয়ে নিয়েছিল। ছয় দফা কর্মসূচি প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ছয় দফার ভিত্তিতে দলীয় গঠনতন্ত্র এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তা পরবর্তীকালে ছয় দফার চূড়ান্ত পরিণতি এক দফা তথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত বহন করে।

ছয় দফা পরিকল্পনাটি বঙ্গবন্ধুকে এবং আওয়ামী লীগের বেশ কিছুসংখ্যক বাঙালি নেতাকর্মীকে নবাবজাদা নসরুল্লা খানের নেতৃত্বাধীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি মুখোমুখি সংঘাতমূলক পথে নিয়ে যায়। এটি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের প্রচন্ড ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানের এই লৌহ শাসক প্রকাশ্যে ছয় দফার প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আইয়ুব শাহী এবং তার সহযোগীরা মনে করতেন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচি পাকিস্তানকে ভেঙে এর পূর্ব অংশকে দেশের অবশিষ্ট অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের যে ছয় দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিল, তা ছিল নি¤œরূপ।

এক নম্বল দফায় বলা হয়েছিল, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা; সংসদীয় পদ্ধতির সরকার; সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন।

দুই নম্বর দফায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে দুটি বিষয় ন্যস্ত থাকার কথা বলা হয়েছিল, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র; অন্য সব বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।

তিন নম্বর দফায় মুদ্রানীতির কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা দুই অঞ্চলে প্রবর্তন অথবা একক মৃদ্রা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধে সাংবিধানিক বিধান রাখতে হবে। পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভ রাখতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে।

চার নম্বর দফায় যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিটগুলোর হাতে করারোপ ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রের হাতে এ রকম কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবে কেন্দ্র তার নিজ ব্যয় বা চাহিদা মেটানোর জন্য প্রদেশগুলোর করের একটা অংশ পাবে।

পাঁচ নম্বর দফায় দেশের দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের জন্য দুটি পৃথক বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রার হিসাব রাখা; এ দেশের অর্জিত বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রা এ দেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে; কেন্দ্রীয় সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন দুই অঞ্চল কর্তৃক সমান হারে অথবা নির্ধারণযোগ্য অনুপাতে দুই অঞ্চল কর্তৃক মেটানো হবে; দেশজ পণ্য দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে শুল্কমুক্তভাবে অবাধে চলাচল করবে; সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিটের সরকারগুলো বিদেশে বাণিজ্য মিশন খোলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করবে।

ছয় নম্বর দফায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা অতিদ্রুত বাঙালিদের মুক্তি সনদ হিসেবে (পূর্ব) বাঙালি জনগণের প্রাণের দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১৯৬৬ সালের মার্চ এবং মে মাসে বঙ্গবন্ধু এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী এবং আরো অনেকে ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন সৃষ্টির লক্ষ্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সফর করেছেন। ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন দেখে আইয়ুবের তোষামোদে এক অনুগত গভর্নর মোনায়েম খান আওয়ামী লীগ নেতাদের কারান্তরীণ করার হুমকি প্রদান করেন। ওই বছরের ৮ মে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অধিকাংশ সহযোগীকেও কারান্তরীণ করা হয়েছিল। এ সময় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মিজানুর রহমান চৌধুরী আওয়ামী লীগ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। মিজানুর রহমান চৌধুরী তখন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব পাকিস্তানের) সদস্য। তার দায়িত্ব ছিল ছয় দফার পক্ষে সমর্থন সংগঠিত করা। তিনি বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করেন।

মিজানুর রহমান চৌধুরী এ সময় খুব দৃশ্যমান এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, মনোবল ভেঙে পড়া একটি দলকে উজ্জীবিত করে তিনি হরতালের জন্য প্রস্তুত করান। একই সঙ্গে তিনি এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ আওয়ামী লীগের এমএনএ-বৃন্দ আওয়ামী লীগের ওপর সরকারি নিপীড়নের কথা আইনসভায় উত্থাপন করেন। আর এভাবে ছয় দফা দাবিকে সমগ্র (পূর্ব) বাঙালির দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। অপরদিকে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারী সরকার পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর হরতালের খবর না ছাপানোর আদেশ দেন। গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ সত্ত্বেও সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালিত হয়। হরতাল পালনকারীদের ওপর পুলিশ এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের গুলিবর্ষণের ফলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী এবং দেশের অন্যান্য স্থানে আন্দোলনরত ১০ জন শহীদ হন। পরদিন ৮ জুন সংবাদপত্রগুলোতে আগের দিনের ঘটনা সম্পর্কে সরকারি ভাষ্যই কেবল প্রকাশিত হয়েছিল। সরকারি ভাষ্যে রাজপথে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সহিংসতার কথাই ফুটে উঠেছিল।

এভাবে ইতিহাস পুনঃসংজ্ঞায়িত করার কাজ শুরু হয়। (পূর্ব) বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি-সংবলিত বাংলাদেশের ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ‘জাতীয় চেতনা’ সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের যৌথ মানসিকতায় নিশ্চিত এবং দ্রুততার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের চেতনায় বাঙালিরা নিজেদের পুনরায় আবিষ্কার করে। ছয় দফা আন্দোলনের পথ ধরে এরপর আসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর নির্বাচন। ১৯৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের প্রতি এ দেশের জনগণ তাদের সমর্থন ব্যক্ত বরে। পাকিস্তানি ধর্মীয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয় পরিচিতি উদ্ভব এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছয় দফা অন্যতম একটি মাইলফলক।

১৯৭০-এর নির্বাচনের পরে আসে ‘জাতীয় পরিচিতি’ ও ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পর্যায় ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ বাঙালির আত্মদান, প্রায় তিন লাখ বাঙালি মা-বোনের ইজ্জত এবং প্রায় কয়েক হাজার ভারতীয় সৈন্যের আত্মাহুতি এবং সমগ্র বাংলাদেশকে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মধ্য দিয়ে বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

"