প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ১১ জুলাই, ২০২৪

পানি কমছে ধীরে বাড়ছে ভাঙন

বন্যা পরিস্থিতি : যমুনায় কবরস্থান ভেঙে ভেসে যাচ্ছে মরদেহ, কয়েকটি উদ্ধার করে দাফন * নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সিলেটের পানি খুবই ধীরগতিতে নামছে * টাঙ্গাইলে ধলেশ্বরী নদীর ব্রিজের সংযোগ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

সিলেটে পানি কমছে ধীরগতিতে। সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে যমুনার ভাঙনে বাদ পড়ছে না কবরস্থান। ভেসে যাচ্ছে মরদেহ। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের গালা ইউনিয়নের যমুনা নদীতে ভাঙন ও প্রভাবশালীর লুটপাটে গুচ্ছগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের বাড়িঘর লোপাট। টাঙ্গাইলে ধলেশ্বরী নদীর সংযোগ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েক উপজেলার মানুষ। প্রতিনিধিদের খবর-

সিলেট : সিলেটে বর্তমানে বন্যার পানি কমছে। তবে এর আগে কয়েক দফা বন্যায় জেলার হাওর ও নিম্নাাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বর্তমানে পানি কমছে ধীরগতিতে। গতকাল বুধবার সিলেটে বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। এখনো দুটি নদীর পানি তিনটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সিলেটের পানি খুবই ধীরগতিতে নামছে। যদি রোদের প্রখরতায় পানি দ্রুত বাষ্পীকরণ হয় তাহলে পানি কমবে। এখন রোদই একমাত্র ভরসা। এছাড়া পানি কমার সুযোগ খুবই কম। তবে বুধবার সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সিলেটে এখনো পানিবন্দি রয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮২০ জন। ১০৬৪ গ্রাম এখনো বন্যার পানিতে প্লাবিত। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত রয়েছেন ৯ হাজার ৩৬০ জন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, দুর্যোগ পরিস্থিতিতে উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা ও উপজেলার প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রেসকিউ বোট ও স্পিডবোটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় যমুনায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙছে বাড়িঘর, স্থাপনা ও ফসলি জমি। নদীভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার চর ছলিমাবাদ দক্ষিণা পাড়া কবরস্থান। এক সপ্তাহ ধরে ওই কবরস্থানের ১৫ থেকে ১৬টি মরদেহ নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে দাফন করেছে পরিবারের লোকজন।

ময়নাল সরকারের কবরস্থান এলাকার হোমিও চিকিৎসক কামরুল ইসলাম বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে চৌহালী উপজেলার ভূতের মোড় থেকে ময়নাল সরকারের কবরস্থান পর্যন্ত তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কবরস্থানের অধিকাংশ জায়গা নদীতে ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, ভাঙনের সময় আমরা আত্মীয়স্বজনের কবরের পাশে ছিলাম। আমার ফুফা সন্তেশ আলী শিকদার প্রায় ৪০ দিন আগে মারা গেছেন। তার মরদেহও নদীতে ভেসে যায়। আমরা উদ্ধার করে অন্যত্র দাফন করেছি। এছাড়া তাহেজ ফকির, সোহার সরকার ও বুদ্দু শিকদারের মায়ের মরদেহ উদ্ধার করে অন্যত্র দাফন করা হয়েছে। ভাঙনে অনেক মরদেহ নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে।

ওমারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মাস্টারের ছেলে আবদুল হাদি বলেন, যারা ভাঙনের সময় কবরস্থানের পাশে ছিল, তাদের কয়েকজনের মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করে অন্যত্র কবরস্থ করা হয়েছে। এটি দিনের বেলার ঘটনা। কিন্তু রাতে বেলায় কেউ তো থাকে না। তখন কত মরদেহ ভেসে গেছে তা কেউ জানে না। আমার বাবা, দাদির কবর ভাঙনের মুখে রয়েছে।

চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল কালাম মোল্লা বলেন, কবরস্থানের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। কিছু মরদেহ ভাসতে দেখেছি। আত্মীয়স্বজনরা কয়েকটি মরদেহ নদী থেকে উঠিয়ে অন্যত্র দাফন করেছে।

যমুনায় পানি বৃদ্ধি এবং কমার সময় নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। বর্তমানে যমুনার পানি কমতে থাকায় জেলার অরক্ষিত নদী তীরে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

গত মঙ্গলবার পাউবোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মুখলেসুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মেঘাই স্পার বাঁধ, হাটপাচিল ও চৌহালী উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর প্রতি আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে জিওব্যাগ বা জিওটিউব (বালিভর্তি বিশেষ ব্যাগ) ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা হবে।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের গালা ইউনিয়নের বি-হাতকড়া গুচ্ছগ্রামের সব ঘরবাড়ি যমুনায় এবং প্রভাবশালীরা ভেঙে নিয়ে গেছে। গুচ্ছগ্রামের ভূমিহীনদের ঘরদোর নির্মাণে সরকারে ৭৫ লাখ টাকা গচ্ছা গেল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, বি-হাতকড়া গুচ্ছগ্রামটি যমুনা নদীর মধ্যে দ্বীপের মতো ভাসছে। দেখা যায়, গুচ্ছগ্রামে কোনো মানুষ না থাকায় নৌকা নিয়ে যে যার মতো ঘরদোর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ বাড়ির পিলার ভাঙছে, কেউ নিয়ে যাচ্ছে ঘরের টিন। কেন ভাঙছেন, জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, কেউ নাই তাই ভেঙে নিয়ে যাচ্ছি। নদী ভাঙবে তাই সব ঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছি। এলাকার ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, গুচ্ছগ্রামের ঘর নির্মাণে খুব অনিয়ম ছিল। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুচ্ছগ্রামের একাংশ ডুবে যায়। আরেকাংশ এখনো ডোবে নাই। ভাঙবে এই অজুহাতে কিছু প্রভাবশালী ঘরদোর সব ভেঙে নিয়ে গেছে।

গালা ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বাতেন জানান, ঘর ভাঙার বিষয়ে কিছুই জানেন না। প্রতিটি ঘর বাবদ সরকারের খরচ হয়েছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এটি ছিল ১০ বিঘা জায়গার ওপর। অথচ মানুষ এতই খারাপ যা ভাষায় বলা যাবে না। উপজেলা নির্বাহী মো. কামরুজ্জামান জানান, আমি নিজে নৌকা নিয়ে গিয়েছিলাম। নদীতে ঘর চলে যাবে এই অজুহাতে সব ঘর ভেঙে নিয়ে গেছে। তবে যারা ঘর ভেঙে নিয়ে গেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চৌবাড়িয়া এলাকায় ব্রিজের সংযোগ সড়ক ভেঙে পাঁচটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত এসডিএস ব্রিজের পশ্চিম পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে যায়।

জানা যায়, সদর উপজেলার চরাঞ্চলের কাতুলী, হুগড়া, কাকুয়া, মাহমুদনগর ও নাগরপুরের ভাড়রা ইউনিয়নে (আংশিক) যাতায়াতের জন্য টাঙ্গাইল-তোরাপগঞ্জ সড়কে ধলেশ্বরী নদীর ওপর ২০০৬ সালে ১৭০ দশমিক ৬৪২ মিটার দৈর্ঘ্যরে ব্রিজটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মাণ করে।

ব্রিজটি নির্মাণের পর থেকেই অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে কয়েকবার বর্ষায় দফায় দফায় পূর্ব ও পশ্চিম তীরের অ্যাপ্রোচ ধসে যায়। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এলজিইডি স্থানীয়দের সহায়তায় বালুর বস্তা ও লোহার পাত দিয়ে সাময়িক সংস্কার করে যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়।

এ সড়কের সিএনজিচালক জাকির হোসেন বলেন, ব্রিজের উভয়পাড় বারবার ধসে যাচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফা বলেন, সম্প্রতি বৃষ্টি ও প্রবল স্রোতে ব্রিজের পাড় ধসে পড়ছে। যেহেতু এটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তাই দ্রুত ধস বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close