নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৯ জুলাই, ২০২৪

দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে দূষণে মৃতপ্রায় ৪ খাল

কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল * সাময়িক দখলমুক্ত নয়, দেখভালে চাই নিয়মিত তদারকি : নগর পরিকল্পনাবিদ

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় রাজধানীর চারটি খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করতে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খালের জন্য ৮৯৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় চারটি খালের দুই পাড়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, বাইসাইকেল লেন, বাচ্চাদের খেলার মাঠ, মাছ ধরার শেড, ফুডকোর্ট ও কফিশপ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া নাগরিক সুবিধা ও জনপরিসর বাড়াতে খালগুলোর পাশে গড়ে তোলা হবে পথচারী সেতু, শপিংমল এবং পাবলিক টয়লেট।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসা থেকে খাল বুঝে নেওয়ার পর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সরকার বিভাগে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) দেয় ডিএসসিসি। প্রকল্প যাচাই কমিটির সুপারিশের আলোকে পরবর্তীকালে ২০২২ সালের অক্টোবর একনেক সভায় পাশের পর নভেম্বর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়। সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে ডিএসসিসি আওতাধীন খালগুলোর সুষ্ঠু পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করে জলাবদ্ধতা নিরসন, নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার মাধ্যমে নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করা। প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের জানান, এরই মধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য আলাদা ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চারটি খাল ঘিরে নেওয়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার অন্তত ৫০ লাখ লোক জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে। যে চার খাল ঘিরে পরিকল্পনা- প্রকল্পভুক্ত খালগুলো হলো কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১৪ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কালুনগর খালের দৈর্ঘ্য ২.৪ কিলোমিটার। ৫, ৬, ৭৪ এবং ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের জিরানি খালের দৈর্ঘ্য ৩.৯ কিলোমিটার। ৫৮ ও ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডে শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য ৪.৭৮ কিরোমিটার এবং ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মান্ডা খালের দৈর্ঘ্য ৮.৭ কিলোমিটার। চার খাল মিলিয়ে ১৯.৭৮ কিলোমিটার খাল দখলমুক্ত, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

কালুনগর খালের দুই পাশে চারটি পথচারী সেতু, দুটি পাম্প হাউস, ১৪৪০ মিটার ওয়াকওয়ে তৈরি, ৯৬টি বৈদ্যুতিক বাতি, ৮০টি বসার বেঞ্চ এবং একটি ফুডকোর্টসহ সবুজায়ন, বাগান নির্মাণ, ওয়েস্টবিন ও অন্য নাগরিক সুবিধা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। জিরানি খালে ৯ হাজার ৬০০ মিটার ওয়াকওয়ে, দুটি পাবলিক টয়লেট, ৯ হাজার মিটার বাইসাইকেল লেন, দুটি ব্যায়াম করার শেড, ১৭ হাজার মিটার সবুজায়নসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৯ কোটি ৯১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। গাড়ি চলাচলের ছয়টি সেতু, ২২টি পথচারী সেতু, পাঁচটি ফুডকোর্ট, চারটি প্লাজা এবং অন্যসব সুবিধা নিশ্চিত করতে মান্ডা খালের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। ১৭ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে সবুজায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিং, ১৯২টি বৈদ্যুতিক পোল ও নান্দনিক বাতি স্থাপন, ১০০টি ওয়েস্ট বিন ও বাচ্চাদের জন্য খেলার মাঠ নির্মাণে শ্যামপুর খালের উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৭ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটির ২৬টি খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। যার কোনোটিতে অল্প পানির দেখা মেলে আবার কোনোটি শুধুই আবর্জনা আর বসতবাড়ির দখলে রয়েছে। বর্জ্য ফেলায় বিষাক্ত হয়ে পড়েছে অনেক খালের পানি, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হুমকি। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু সাময়িক দখলমুক্ত নয়, দেখভালে চাই নিয়মিত তদারকি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সবচেয়ে বড় খাল মান্ডা খাল। ২০২২ সালে মান্ডাসহ ঢাকার ৪টি খাল সংস্কারে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় ডিএসসিসি। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। স্থানীয় একজন বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, এখানে পরিষ্কার, সুন্দর পানি ছিল। এখানে আমরা সাঁতার কাটছি। আমাদের মা-বোনরা কলস দিয়ে এখানকার পানি উঠিয়েছে। অন্য একজন স্থানীয় বলেন, সবাই এর ভেতর ময়লা ফেলে। ময়লা দূরে নিতে সমস্যা মনে হয় বলে আমি নিজেও এখানে ময়লা ফেলি। এভাবে চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে খালটি।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ১৯৮০ সালের দিকে ঢাকায় ৬০টি খালের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দিকে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫০টিতে। কিন্তু ২০১৭ সালে সরকার গঠিত টাস্কফোর্স খাল খুঁজে পায় ৩৮টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার অধীনে ছিল ২৬, যা ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। বর্তমানে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা আরো ১৪টি খাল ডিএসসিসিকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে ঢাকার বাদবাকি খালের আর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সরকারি নথিপত্র থেকে কীভাবে হারিয়ে গেল এসব খাল? পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার যদি বলে যে আগে ৫০টি খাল ছিল, এখন ৩৮টি আছে আর বাকি ১২টি হারিয়ে গেছে। খাল আমার সম্পদ। জনগণের সম্পত্তি হারিয়ে গেছে বলে সরকারের কাঁধঝাড়া দিয়ে দায়ের ওপরে ওঠার কোনো সুযোগ নেই।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close