প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ০৬ জুলাই, ২০২৪

বন্যা পরিস্থিতি

সিলেটে বাড়ছে দুর্ভোগ উত্তরে প্লাবিত গ্রাম

সিলেটের চার উপজেলায় নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন গ্রাম * সুনামগঞ্জের গ্রামীণ সড়কগুলো এখনো পানির নিচে * গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত * রৌমারী ও নাগেশ্বরীতে পানিবন্দি ৮০ হাজার মানুষ

বৃষ্টিপাত কম হওয়া সিলেটে নদ-নদীগুলোর পানি খুব ধীরগতিতে নামছে। তবে ভারতের বরাক নদের শাখা কুশিয়ারায় পানিপ্রবাহ বাড়ায় তীরবর্তী কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এদিকে সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকার গ্রামীণ সড়কগুলো এখনো পানিতে তলিয়ে থাকায় চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এদিকে গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। সিরাজগঞ্জের যমুনার পানি সকাল থেকে পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে আছে ৫০ গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। উপজেলার স্থলবন্দর ও ফেরিঘাটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া জেলার নাগেশ্বরীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে পানিবন্দি আছে ৩০ হাজার মানুষ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট প্রতিনিধি জানান, সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় চারটি স্থানে কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে ৮৭টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। একইভাবে বিয়ানীবাজার উপজেলায়ও প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। এছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জে নদীর পানি উপচে পড়ে চারটি গ্রাম ও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার প্লাবিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলার প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পাঁচটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে সিলেট পয়েন্টে এ পানির উচ্চতা কমে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছে। তবে জেলার অন্য নদ-নদীর পানি আজ (গতকাল) কিছুটা কমেছে।

এদিকে বিয়ানীবাজার উপজেলার দেউলগ্রাম, গোবিন্দশ্রী, আঙ্গুরা মোহাম্মদপুর, আলীনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় কুশিয়ারার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। সিলেট নগরে জলাবদ্ধতা এখনো কাটেনি। শহরের বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের সব উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। জেলায় ৬৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২০৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ অবস্থান করছেন। বন্যাকবলিত বাসিন্দাদের জন্য ত্রাণসহায়তা অব্যাহত আছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও অপরিবর্তিত রয়েছে হাওর এলাকার গ্রামগুলোর বন্যা পরিস্থিতি। এতে হাওরের কুলঘেঁষা বিভিন্ন এলাকার পানি কমেনি। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের মল্লিকপুর ও কালিপুর গ্রামগুলো দেখার হাওরের পাড়ে অবস্থিত। এসব এলাকায় এখনো কোমর পানি রয়েছে। স্থানীয়দের নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে জেলার ১২ উপজেলায় এখনো পানিবন্দি পৌনে ৪ লাখ মানুষ। জেলায় ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৪০০ বন্যাকবলিতরা এখনো আশ্রয়ে আছেন।

এদিকে ‘ত্রাণ চাই না, বন্যা মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান চাই’ স্লোগানে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন করেছে স্বেচ্ছসেবী রক্তদান সংগঠন বিশ্বজন। গতকাল বেলা ১১টায় সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কর্ণ বাবু দাস সুনামগঞ্জে প্রতিবছর কয়েকদফা বন্যার জন্য সুরমাসহ বিভিন্ন নদ-নদী খনন না করাকে দায়ী করেন। সে সঙ্গে সিলেট-সুনামগঞ্জের পানি প্রবাহে ইটনা-মিঠামইন সড়ক নিয়ে হাইড্রোলজিকাল স্টাডি করতে হবে বলে জানান তিনি।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, করতোয়া, ঘাঘটসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে চরাঞ্চলসহ নদীর তীরবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে মাঠে ও শ্রেণিকক্ষে পানি থাকায় নদী তীরবর্তী এলাকার ৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. রোকসানা বেগম ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি জেলার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে তিস্তা ও করতোয়ার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলায় যমুনা নদীতে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এদিকে কাজিপুরের খাসরাজবাড়ী, তেকানি, চরগিরিশসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। আর বন্যার পানি প্রবেশ করেছে প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

কাজিপুর শিক্ষা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, ‘যেভাবে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকতে পারে। ফলে পাঠদানও বন্ধ করতে হবে। তবে শিক্ষকদের মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া আছে, ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করার দরকার নেই।’ গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি সমতলে রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ২৮ মিটার। পয়েন্টে নদীর পানি ১২ ঘণ্টায় ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে কাজিপুর মেঘাই পয়েন্টে পানি সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১৫ দশমিক ১২ মিটার। এ পয়েন্টে নদীর পানি ১২ ঘণ্টায় ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জুনের প্রথম থেকে যমুনায় পানি বাড়া- কমার মধ্যে ছিল। কিন্তু ২৭ জুন থেকে পানি ব্যাপকভাবে বেড়ে চলেছে। সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হাসান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

কুড়িগ্রামের (রৌমারী) প্রতিনিধি জানান, জেলার রৌমারীতে উপজেলা সদর, যাদুরচর, বন্দবেড়, চরশৌলমারী, দাঁতভাঙ্গা ও শৌলমারী ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার প্রায় ৫০টি গ্রামের ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জিঞ্জিরাম নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদ উপচে ওই সব এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ওইসব এলাকার লোকজন ঝুঁকি নিয়ে নৌকা বা ভেলা নিয়ে পারাপার হচ্ছে।

এদিকে চরনতুনবন্দর স্থলবন্দর ও রৌমারী ফেরিঘাটটিও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে রৌমারী চিলমারী রুটে মালবাহী গাড়িচলাচল বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে চর নতুনবন্দর স্থলবন্দরটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভারতের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে মানবেতর জীবন যাপন করছে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক।

রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু বলেন, ‘আমি অনেক এলাকা পরিদর্শন করেছি, বন্যার পরিস্থিতি ভালো না। অস্বাভাবিক ভাবে বন্যার পানিবৃদ্ধি হচ্ছে। এরই মধ্যে ৫০টি গ্রামে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণ সংকট দেখা দিয়েছে।’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান বলেন, বন্যার পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জিআর চাল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল, চারাঞ্চল ও দীপচরসহ বিভিন্ন এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ১০ হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দফা বন্যায় এ উপজেলার বন্যাকবলিতদের জন্য ৩০ হাজার ৫০০ টন চাল ও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাল, ডাল, তেল, লবণসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী প্যাকেজ আকারে ৫৮৫ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। আরো ৩১৫ প্যাকেট মজুদ রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিব্বর আহমেদ জানান, ‘উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে সেখানে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক বন্যার্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবরসহ বিতরণ কার্যক্রম চলমান থাকবে।’

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি তিনটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া পয়েন্টে গতকাল ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রসহ অন্য নদ-নদীর পানি আরো ৪৮ ঘণ্টা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close