মাহমুদুল হাসান, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

  ০৮ ডিসেম্বর, ২০২২

পাতিলে ভেসে স্কুলযাত্রা

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৮টা ৩০ মিনিট। স্কুল শুরুর ঘণ্টা বাজতে তখন ৪৫ মিনিট বাকি। এরই মধ্যে স্কুলে যাওয়ার তড়িঘড়ি। বাড়ি থেকে বই-খাতাণ্ডকলমের সঙ্গে রান্নার পাতিল নিয়ে রওনা করে কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী। সেই পাতিলের মধ্যে বই আর স্কুলের পোশাক নিয়ে রওনা করে ওরা। এর মাঝপথেই খাল। সেই খালে পাতিল ভাসিয়ে সাঁতরে সাঁতরে তীরে ওঠে শিশুরা। ২০০ ফুটের বেশি চওড়া খাল পেরোতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ মিনিট। হিম শীতল পানিতে সাঁতরে শরীরে কাঁপুনি ধরে। খাল পার হয়ে ভেজা কাপড় পাল্টে পরে নেয় স্কুলের পোশাক। আর ভেজা জামা স্কুলে গিয়ে রোদে শুকাতে দেয়। এরপর ক্লাসে যায় ওরা।

এই চিত্র এই প্রতিবেদকের কাছে নতুন হলেও স্থানীয়দের কাছে পুরোনো। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দিয়ারচর ও উত্তর চরমোন্তাজ (দক্ষিণ অংশ) নামের দুটি চর এলাকা থেকে এভাবে খাল সাঁতরে স্কুলে আসা-যাওয়া করে প্রায় অর্ধশত শিশু শিক্ষার্থী।

খাল সাঁতরে স্কুলে যাতায়াতকারীদের একজন শিক্ষার্থী জান্নাতুল (৮)। তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া এ শিক্ষার্থীর বাড়ি দিয়ারচর গ্রামে। পড়ালেখা করে মাঝেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এর মাঝখানে বয়ে যাওয়া বাইলাবুনিয়া নামক একটি খাল সাঁতরে ওর যেতে হয় স্কুলে। জান্নাতুল বলে, ‘আমাদের আসতে অনেক ভয় হয়। দুই-এক সময় হাত থেকে পাতিল ছুইট্টা (ছুটে) যায়। আমরা অনেক কষ্ট করি। দুই-তিন দিন আগে হাত থেকে পাতিল ছুইট্টা গেছে। আমরা অনেক কান্না করছি। কেউ ছিল না। পরে আমরাই আস্তে আস্তে কিনারে আসছি। বই খাতা ভিজে গেছে। এখনো শুকায়নি।’

জান্নাতুলের মতো ওই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির নাসরিন, চতুর্থ শ্রেণির কেয়ামনি ও নাজমুলের ভাষ্য- খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে ভয় করে। কষ্ট হয় এই শীতে ঠাণ্ডা পানিতে সাঁতরে খাল পার হতে। খালটিতে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়ে ভালো হতো।

স্থানীয় লোকজন জানায়, উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দিয়ারচর ও উত্তর চরমোন্তাজ (দক্ষিণ অংশ) গ্রামে কোনো স্কুল নেই। তাই পার্শ্ববর্তী মাঝেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে ওই দুই চরের শিশুরা। কিন্তু স্কুল এবং দুই চরের মাঝখানে বাইলাবুনিয়া খাল। এ খাল পেড়িয়ে স্কুলে যেতে হয় শিশুদের। কেউ খাল সাঁতরে পার হয়। কেউ আবার পার হয় নৌকায়। কাঁচা হাতে নিজেই নৌকার বৈঠা বেয়ে খাল পার হওয়া দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইউসূফ বলে, ‘যহন (যখন) নৌকা পাই, তহন স্কুলে আই (আসি)।’

স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয়দের উদ্যোগে কয়েকবার বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নোনা জলে সাঁকো বেশি দিন টেকে না। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে সাঁকো থাকাকালীন ৩০০-৪০০ শিক্ষার্থী ছিল। এরই মধ্যে ২০০-এর মতো শিক্ষার্থী ছিল ওই দুই চরের। সাঁকো না থাকায় এখন শিক্ষার্থী কমে গেছে। এখন দুই চর থেকে ৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী আসে। এদের কেউ কেউ নিয়মিত আসেও না।

শিক্ষার্থী অভিভাবক দিয়ারচর গ্রামের হোসেন মিয়া বলেন, ‘আমার দুই ছেলে এই স্কুলে পড়ে। সপ্তাহ খানেক আগে আমার এক ছেলে খাল পার হতে গিয়ে ডুবে যাওয়া ধরছে (যেতে ধরেছে)। আমি এসে উডাউয়া (উঠিয়ে) স্কুলে দিয়ে গেছি। আমার অনেক কষ্টে এই দুই ছেলে এখন স্কুলে আনা-নেওয়া করতে হয়। এর চেয়ে এখানে একটি স্কুল হলে ভালো হয়। আর তা না হলে এই খালে একটি ব্রিজ হলেও ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়তে দেওয়া যায়।’

মাঝেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘দিয়ারচর ও উত্তর চরমোন্তাজের শিক্ষার্থীরা পাতিল নিয়ে খাল সাঁতরে এই বিদ্যালয়ে আসে। অনেক অভিভাবকই এই ঝুঁকি নিয়ে ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে আসতে দেয় না। যদি স্কুলের পূর্ব পাশের এই খালে একটি ব্রিজ হতো, তাহলে শিশু শিক্ষার্থীরা এই ঝুঁকি থেকে রেহাই পেত। এই শীতের সময়ে শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হয়। অনেকেই প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে স্কুলে আসে। অনেকে নিয়মিত স্কুলেও আসতে পারে না।’

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্গম এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের একটি খাল পেরিয়ে আমাদের স্কুলে আসতে হয়। সেখানে একটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য বেশ কিছুদিন আগে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে। এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প কি করা যায়- এজন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে অতি দ্রুত বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব।’ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মিজানুল কবির বলেন, ‘আমরা সেখানকার খোঁজখবর নেব। প্রয়োজনে ব্রিজ নির্মাণের জন্য আয়রন ব্রিজ প্রকল্পে প্রস্তাবনা পাঠাব।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা জেনেছি স্কুলে যেতে শিশু শিক্ষার্থীরা বই-খাতা এবং জামা-কাপড় পাতিলে ভরে সাঁতার কেটে স্কুলে যায়। যেটা জেনে আমার কাছে খুব খারাপ লেগেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। আগামী দিনে কোমলমতি শিশুরা যাতে সুন্দরভাবে স্কুলে যেতে পারে সেজন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব এবং কোমলমতি শিশুদের পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সালেক মুহিদ জানান, ‘৭ ডিসেম্বর আমাদের মাসিক মিটিংয়ে এ বিষয়টি আমরা উত্থাপন করব। দ্রুত বিষয়টি সমাধানের জন্য রাজস্ব তহবিল অথবা পিআইও অফিসের প্রকল্পের মাধ্যমে ওখানে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close