ফসিয়ার রহমান, পাইকগাছা (খুলনা)

  ২৮ নভেম্বর, ২০২২

বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি

‘...ও বউ ধান ভানেরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে বউ নাচে হেলিয়া দুলিয়া ও-বউ ধান ভানেরে...’। গ্রাম বাংলার মহিলাদের কণ্ঠে আগে প্রায়ই শোনা যেত এ ধরনের সুর আর ঢেঁকির দুপ দুপ শব্দ। ঢেঁকিতে পা রেখে কত গান ও কত প্রবাদ গাওয়া হতো গ্রাম্য মেয়েদের। ঐতিহ্যবাহী সেই ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির খাতায়। সময় আর জীবন দুটিই বহমান শিবসা নদীর মতো। জোয়ারে এক রকম আর ভাটায় ভিন্ন রকমের পরিবেশ মুহূর্তেই যেন পাল্টে যায় চিত্র।

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এক সময় ঢেঁকি দিয়ে চাল তৈরি, চিড়া ভাঙা, আটা, গম, জব, পায়েসের চালের গুঁড়া, খির তৈরির চাল বানানোর সেই ঢেঁকি-আজ অসহায় হয়ে পড়েছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনের কাছে।

বর্তমান যান্ত্রিকতার যুগে এই চির চেনা সুর যেন প্রায়ই হারিয়ে গেছে। কালের বিবর্তনে প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে পাইকগাছা থেকে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প। এক সময় জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রায় সব বাড়িতে ছিল ঢেঁকি। কিন্তু এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। গ্রামের অভাবগ্রস্ত গরিব অসহায় মহিলাদের উপার্জনের প্রধান উপকরণ ছিল ঢেঁকি। গ্রামের বিত্তশালীদের বাড়িতে যখন নতুন ধান উঠত তখন অসহায় অভাবগ্রস্ত মহিলারা ঢেঁকিতে ধান ছেঁটে চাল বানিয়ে দিত। তা থেকে তারা যা পেত তা দিয়েই ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চলে যেত। ঢেঁকিতে ধান ভানতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হাসি-তামাশার কথা বলত ও গান গাইত। কিন্তু ৮০ দশক হতে খুলনার দক্ষিণ অঞ্চল পাইকগাছা-কয়রার আবাদি জমিতে ধানের পরিবর্তে চিংড়ি মাছের চাষ আসায় ঢেঁকির ব্যবহার বিনষ্টের দিকে চলে যায়। কোনো আবাদি জমিতে আর ধান চাষ হয় না। সেক্ষেত্রে ধান মাড়াই করার কোনো সুযোগ নেই। অল্প কিছু জমিতে ধান চাষ হলেও সেটা মাড়াই হয় মেশিনে। আর বিত্তশালীরা তাদের জমি চিংড়ি চাষিদের কাছে টাকার বিনিময়ে হারিতে দিয়ে শহরে পাড়ি জমিয়েছে।

অতীতে গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি ঐতিহ্য বহন করত। তাল বা অন্য গাছের গুঁড়ার ওপর লম্বা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি হতো ঢেঁকি। শক্ত ধরনের প্রশস্ত গাছ কেটে সটান আকৃতি করে ঢেঁকি তৈরি করা হয়। এর মাথার দিকটা মোটা। আর পেছনের দিকটা চ্যাপ্টা। মাথার দিকে থাকে একটি শুঁড়। একে বলে মুষল। মুষলের শেষ প্রান্তে লাগানো থাকে লোহার আংটা। কেউবা কাঠ দিয়ে, কেউবা সিমেন্ট দিয়ে আংটা ও মুষল পড়ার জায়গা তৈরি করে। একে বলে নোট। এই নোটের মধ্যেই ফেলানো হয় ধান। ঢেঁকির পেছনের দিকে লাখি দিয়ে সামনের মাথা উঁচু হয়ে ধানের ওপর পড়তে থাকে। এরপরই ক্রমাগত পাড় দিতে দিতে ধান ভানা হয়ে যায়। গ্রামের ফাঁকা স্থানে বা কোনো রকম ছাউনি দিয়ে বাড়ির এক পাশে তৈরি করা হতো ঢেঁকি ঘর। শীত মৌসুমে ধান ভাঙার পাশাপাশি ঠিকরে কলাই বড়ি বানাতে ঢেঁকি ব্যবহার হতো। সন্ধ্যা হতে গভীর রাত পর্যন্ত অথবা খুব ভোরে উঠে মহিলারা ঢেঁকিতে পাড় দিত। সকালের ঘুম ভাঙত তখন ঢেঁকির ক্যাচণ্ডকুচ, ডুক-ঢাক শব্দে। ঢেঁকি দিয়ে ধান ভাঙতে সর্বনিম্ন দুজন মহিলা হলে চলত। কেউ পাড় দেয়, কেউ এলে দেয়। এভাবেই চলে ধান ভানার কাজ। বাড়িতে অতিথি এলে ঢেঁকিতে ধান কুটার তোড়জোড় শুরু হতো। এই নিয়মে চিড়ে, ছাতু তৈরি করা হতো। তারপর গভীর রাত অবধি চলত রকমারি পিঠাণ্ডপায়েস বানানো আর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার আমেজটা ছিল খুবই উপভোগ্য। ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত, পোলাও, জাউ আর ফিরনি ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। ঢেঁকিতে কোটা চিড়া আর চালের গুড়ির পিঠার কোনো জুড়ি ছিল না। এসব খাদ্যের সুবাতাস কয়েক বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সে কথা মনে হলে এখন খাওয়ার জন্য মনটা পাগল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ঢেঁকিছাটা চালে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে বলে চিকিৎসাবিদরা রোগীকে ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খেতে বলত।

কিন্তু কালের বিবর্তনে আমরা সবই হারাতে বসেছি। আর এখন পিঠা বানানোর অন্যতম উপকরণ চালের গুঁড়া বানাতে দু’এক গ্রাম খুঁজলেও ঢেঁকির দেখা মেলা না। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে এখন ঢেঁকি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কয়েক বছর আগেও গ্রামগঞ্জের বিত্তবানসহ প্রত্যেক বাড়িতে দেখা যেত ঢেঁকি। এখন ঢেঁকির পরিবর্তে আধুনিক ধান ভাঙার রাইচ মিলে চাল কোটার কাজ চলছে। পাইকগাছার যেসব গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি সেখানে ডিজেলের মেশিন ছাড়াও ভ্যান গাড়িতে শ্যালো ইঞ্জিন নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে ধান মাড়াই করেন। যার কারণে গ্রামের অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মহিলারা যারা ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করত তারা বিকল্প পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অনেকে ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছে। পাইকগাছার খড়িয়া গ্রামের সন্ধ্যা রানী (৪০) লতিকা (৪০), মনিরা বেগম (২৮), লাভলি আক্তার (৪০), তপতী (৪২) এ রকম অনেকে জানান, ঢেঁকিতে ভাঙা চালের গুঁড়ার পিটা-পায়েস স্বাধ ছিল অতুলনীয়। ঢেঁকির অভাবে অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও পিঠা তৈরি করে খাওয়া হয় না। তাছাড়া এখন আর কারোর বাড়িতে ঢেঁকি পাওয়া যায় না।’ ঢেকির ঢেক ঢেকানি আর শোনা যায় না। শুধু পাইকগাছা নয় জেলার প্রায় সব অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প। তাইতো কবির ভাষায় বলি-

‘তব রাজপথে চলিছে মোটর সাগরে জাহাজ চলে/ রেলপথে চলে রেল ইঞ্জিন দেশ ছেয়ে গেছে কলে।’

পাইকগাছার গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা সব আবাদি জমিতে চিংড়ি চাষের পাশাপাশি ধান চাষের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, যেন তারা ধান চাষের মাধ্যমে প্রাচীন কালের ঐতিহ্য ঢেঁকি শিল্প ফিরিয়ে আনতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close