নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৩ অক্টোবর, ২০২২

জিয়ার ১৩০০ সেনা হত্যার নথি উধাও!

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ‘তথাকথিত সামরিক বিদ্রোহ দমনের নামে যাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে’, তাদের সমাধিস্থল রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীদের পরিবার। তারা জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচারেরও দাবি জানান। রবিবার (২ অক্টোবর) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন সে সময় সেনা ও বিমানবাহিনীর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত এবং ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা। ‘মায়ের কান্না’ নামে সংগঠন এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর। ঢাকায় সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। গবেষকরা বলছেন, কথিত সেই বিচারে সেনা ও বিমানবাহিনীর ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি সদস্যকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গুমণ্ডখুনের ৪৫ বছর পর কবরের সন্ধানও পাননি স্বজনরা। ছোট-বড় ২১টি অভ্যুত্থানের দায়ে সেনাশাসক জিয়ার কলমের খোঁচায় শত শত গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

খোদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য মওদুদ আহমদ তার ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’ বইয়ে বলেন, জিয়া যাকে সন্দেহ করেছেন তাকেই কঠোর শাস্তি দিয়েছেন।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার লেখা ‘আ লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়ে লেখেন, ১৯৭৭ সালে মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১ হাজার ১৪৩ জন সেনাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন জেনারেল জিয়া। তা ছাড়া শত শত সেনাকে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

জিয়ার সহযোগীদের একজন অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে বলেন, জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক প্রশাসকের দ্বৈত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিজ হাতে এসব হতভাগ্য সেনার দণ্ডাদেশে অনুমোদন দিতেন।

লেখক ও গবেষক জায়েদুল আহসান পিন্ট বলেন, এক দিনে গ্রেপ্তার, পরদিন বিচার, তার পরদিন কার্যকর করে দেওয়া হয়! প্রতিটি ধাপেই অবিচার হয়েছে। ১৯৭৭ থেকে ২০২২ সাল। এ পর্যন্ত জানা যায়নি মরদেহগুলো কোথায়।

সে সময় দ্রুত ফাঁসি দিতে গিয়ে ভুলে একই নামের অন্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া ছাড়াও লাশ গুম করার রেকর্ডও ইতিহাস বিশ্লেষক ও গবেষকদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথায় দাফন করা হয়েছে, তাণ্ডও জানানো হতো না স্বজনদের। এ ছাড়া হিন্দু সেনার মরদেহ সৎকারের সুযোগও দেওয়া হয়নি তখন। কবর খোদকরা যেন বিষয়টি প্রকাশ না করেন, সেজন্য তাদের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি দিয়ে কুলাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা কারাগারেও ৭২ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় বলে বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত রবিবারের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা এবং শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে; নিহত সদস্যদের স্ব-স্ব পদে সর্বোচ্চ র?্যাংকে পদোন্নতি দেখিয়ে বর্তমান স্কেলে বেতন-ভাতা, পেনশনসহ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন ও সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং জিয়াউর রহমানের কবর জাতীয় সংসদ এলাকা থেকে অপসারণ করতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের পিতারা দেশকে স্বাধীন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। অথচ আমরা জানি না কোথায় তাদের কবর? কেন তাদের হত্যা করা হলো এই স্বাধীন বাংলাদেশে?’

লিখিত বক্তব্যে বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট আবুল বাশার খানের মেয়ে বিলকিস বেগম অভিযোগ করেন, ‘১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর তথাকথিত বিদ্রোহ দমনের নামে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের আগে ফাঁসি কার্যকর করে পরে কোর্ট মার্শাল করে বিচার করা হয়েছে। ফাঁসি কার্যকর শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর। অথচ বিদ্রোহ দমনের বিচার কাজের আইন পাস হয় ১৪ অক্টোবর। খুনি জিয়া ঘোষিত মার্শাল ল’ ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচার প্রহসনের সময় একজন সৈনিকের জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নিতে গড়ে ১ মিনিটের চেয়েও কম সময় দিয়েছিলেন তৎকালীন ট্রাইব্যুনাল প্রধানরা। যারা অনেকেই বিচারকের আসনে বসে তারা অসহায় সৈনিকদের সঙ্গে তামাশা করেছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ইচ্ছামতো রায় দিয়েছেন।’

বিলকিস বেগম বলেন, ‘পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হওয়া ১২১ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। কুমিল্লা কারাগারে ৭২ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বগুড়া কারাগারে ১৬ জন, রংপুরে ৭ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। কিন্তু বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরের হিসাবে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর পরবর্তী সময়ে ৫৬১ জন সৈনিক নিখোঁজ হয়েছেন। যাদের কখনোই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনার দিন যারা সেনা ছাউনিতেও ছিলেন না, ছুটিতে ছিলেন; তাদেরও ধরে এনে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিয়েছেন ওই সামরিক জান্তা খুনি জিয়া।’

মায়ের কান্না সংগঠনের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান মিয়া লেলিন বলেন, ‘১৯৭৭-এ একটি চিঠি দিয়ে আমার মাকে জানানো হয়েছিল, আপনার স্বামীকে মারা হয়েছে। কিন্তু আমার বাবার লাশ পাইনি।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close