কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

  ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২

রাবারশিল্পে প্রাণ ফেরাতে সরওয়ার জাহানের লড়াই

এক সময় বাংলাদেশে রাবারের বেশ চাহিদা ছিল। উৎপাদনও হতো প্রচুর। বিদেশে রপ্তানিযোগ্য বাংলাদেশে রাবারের বেশ চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে এ শিল্পের প্রতি কারো মনোযোগ নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা রাবার বাগানগুলো বেদখলে চলে যেতে থাকে। চট্টগ্রামে রাবার বোর্ডের অফিসটি কাগুজে অফিসে পরিণত হয়।

এই অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারী কয়েকজন থাকলেও তাদের হাজিরা দেওয়া ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। রাবার বোর্ডের অফিসটি নগরীর পাহাড়ি এলাকায় হওয়াতে লোকজনের যাতায়াতও তেমন ছিল না। রাবার বোর্ডের সঙ্গে বাগান মালিকদের যোগাযোগ ছিল না বললে চলে। ক্রমশ ধ্বংসের পথে যাওয়া এ রাবার শিল্পকে রক্ষা করতে সৈয়দা সরওয়ার জাহানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চট্টগ্রামের সৎ ও দক্ষ সরকারি আমলা হিসেবে পরিচিত সরওয়ার জাহান দায়িত্ব নেওয়ায় রাবারশিল্পে প্রাণ ফিরে আসতে থাকে।

আশার কথা হচ্ছে সৈয়দা সরওয়ার জাহান যোগ দেওয়ার পর পরই রাবার রপ্তানি বেড়েছে। গত ২০২১ সালে ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাবার রপ্তানি হয়েছে। যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বে রাবার থেকে তৈরি হয় ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি রকমের পণ্য। তাই বিশ্বজুড়ে রাবারের চাহিদা ব্যাপক। রাবার উৎপাদনে এশিয়ার দেশগুলো ৯৩ শতাংশ জোগান দেয়। থাইল্যান্ড থেকে রপ্তানি সবচেয়ে বেশি। তালিকায় এক সময় বাংলাদেশের অবস্থান সুবিধাজনক থাকলেও ক্রমশ এটি গুরুত্ব হারাতে থাকে। ৯০-এর দশকে বিশ্বে বাংলাদেশে রাবারের চাহিদা ছিল ব্যাপক। এ সময় প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রাবার উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। কিন্তু দিন যত যায় এ শিল্পের অগ্রযাত্রা থমকে যেতে থাকে। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ২০ নম্বরে চলে গেছে। অথচ এ রাবারকে এক সময় বাংলাদেশে সাদা সোনা বলা হতো। বিশ্বে ব্যাপক চাহিদার কারণে এশিয়ার দেশগুলো রাবার উৎপাদনের জন্য ক্রমশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশ রাবার শিল্পের জন্য প্রান্তিক চাষিদের অনেক সুবিধা দেয়।

মৃতপ্রায় এ রাবারশিল্পে প্রাণ ফেরাতে চেয়ারম্যান সৈয়দা সরওয়ার জাহান দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যে ফিরিয়ে আনেন শৃঙ্খলা। তিনি যোগাযোগ করতে থাকেন সরকারের বিভিন্ন মহলে। একই সঙ্গে নিজের একটা অফিস এবং লোকবল বাড়ানোর জন্য তদবির করেন। সরকারের বিভিন্ন মহলে ধরনা দিয়ে তিনি একটির পর একটি সমস্যা মোকাবিলা করে এগোতে থাকেন। বাগান মালিকরা এ শিল্পে কেন আগ্রহ হারাচ্ছে তার সন্ধানে তিনি নামেন। ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ যেসব সমস্যা রয়েছে তার জন্য তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা চান। রাবার উৎপাদন এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা অপসারণে তিনি সরকারের বরাবরে একের পর এক পত্র দেন।

রাবার বোর্ড চেয়ারম্যান সারওয়ার জাহান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, রাবার বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। তারপর থেকে এটিকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রচুর সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। রাবারশিল্পে বাংলাদেশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, আমি মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। তাদের প্রযুক্তিগত দিক আমাদের চেয়ে উন্নত। মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতামূলক চুক্তির মাধ্যমে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি।

সরওয়ার জাহান বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার একর জমিতে রাবার চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৮ সরকারি বাগানসহ ৪ হাজার ১২০টি রাবার বাগানে চার ধরনের উৎপাদিত প্রাকৃতিক রাবারের পরিমাণ প্রায় ৬৭ হাজার টন। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২৫ হাজার টন। বাকি উদ্বৃত্ত রাবার বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। রাবার বোর্ডের চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ রাবার বোর্ড স্বতন্ত্রভাবে কাজ শুরু করে। এই প্রথম প্রাকৃতিক রাবার ও রাবারভিত্তিক শিল্পপণ্য মেলার আয়োজন করা হয়। আমরা এই মেলার মাধ্যমে রাবারশিল্প বিকাশের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মেলা আয়োজন অব্যাহত থাকবে।’

রাবার বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন প্রায় ৪০ হাজার একর জমিতে ১৮টি রাবার বাগান সৃজন করেছে। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি ৩৩ হাজার একর জমি রাবার চাষের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিসহ দেশের ১২টি জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ১৩ হাজার ২০০ একর জমিতে রাবার চাষের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাজ করছে রাবার বোর্ড।

সূত্র মতে, সরকার রাবারশিল্পের দিকে নজর দেওয়ার পর এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা রাবারের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার, বাগান হস্তান্তর ও নবায়ন সহজকরণ, পুনরায় ব্যাংকঋণ চালুসহ ১০ খাতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে। বর্তমানে রাবার চাষের ওপর নির্ভরশীল রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক, কর্মচারী। বাংলাদেশে রাবারশিল্পের প্রধান সমস্যা হচ্ছে দেশীয় উৎপাদিত রাবার বাজারে বিক্রিতে ২৫ শতাংশ ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায়। যার কারণে এ শিল্পটি ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আদায় করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের চিত্র রীতিমতো উল্টো। ২০১০ সালে প্রতি কেজি রাবার বিক্রি হতো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি রাবার বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। ফলে রাবারের উৎপাদন খরচ পাচ্ছেন না বাগান মালিকরা। প্রান্তিক চাষিরা এভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হলে রাবার চাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টরা মত ব্যক্ত করেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close