উজ্জ্বল নাথ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)

  ১৭ মে, ২০২২

হালদায় এবার ডিম কম

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র জোয়ার ভাটার নদী সরকার ঘোষিত বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ চট্টগ্রামের হালদা নদীতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কার্প জাতীয় মা মাছ স্বল্প পরিমাণ ডিম ছেড়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে নদীতে মাছ নমুনা ডিম ছাড়ে। ডিমের নমুনা দেখে ডিম আহরণকারীরা রাতভর মা মাছ নদীতে ডিম দেবে এই প্রত্যাশায় ডিম আহরণকারী নদী পাহাড়ায় বসেছিল। কিন্তু রাতে ডিম ছাড়েনি। গত রবিবার দিবাগত রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত মা মাছ নদীর বিভিন্ন স্থানে ডিম ছাড়ে। এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে নদীতে মা মাছ সাংকেতিক ডিম ছাড়ে। এটা নমুনা ডিম ছাড়ার পূর্বাভাস বলে ডিম আহরণকারী মন্তব্য করেন। গত রবিবার পূর্ণিমার তিথি জো ছিল। গত বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ণিমার জো শুরু হয়। আগামী বুধবার পর্যন্ত জো চলবে। নদীতে মা মাছ নমুনা ডিম দেওয়ার পর ডিম আহরণকারীরা মনে করেছিল জো চলাকালে যেকোনো সময় মাছ নদীতে ডিম ছাড়বে। অবশ্য ডিম ছাড়তে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, শীতল হওয়া অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। এবার কিন্তু জো চলাকালে সেই রকম পরিবেশ ছিল না। গত রবিবার রাতে বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তবে ডিম ছাড়ার মতো পরিমিত বৃষ্টিপাত হয়নি। তাছাড়া নদীর উপরি অংশে প্রবল বর্ষণ না হওয়ায় ডিম ছাড়ার অন্যতম প্রধান উপকরণ নদীতে ঢল ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে রবিবার দিবাগত রাত ও সোমবার দুপুর পর্যন্ত যে পরিমাণ মা মাছ ডিম ছেড়েছে তা গত বছরের তুলনায় কম। এতে করে ডিম আহরণকারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশের তৎপরতা, হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য এবং মিঠা পানির ডলফিন রক্ষায় নানামুখী কার্যক্রম এবং নদীদূষণের ব্যাপারে নিত্যসময় অভিযান অব্যাহত ছিল। নদী থেকে মাছ চুরির ঘটনা শনাক্ত করতে মদুনাঘাট থেকে আমতুয়া পর্যন্ত সিসি ক্যামরা স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন, ড্রেজার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা বন্ধের পরও আশানুরূপ ডিম না পাওয়ায় ডিম আহরণকারীসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে ২০২১ সালের ৩৫০টি নৌকার মাধ্যমে ৭০০ ডিম আহরণকারী প্রায় ৮ হাজার কেজি ডিম আহরণ করেছিল। সে তথ্যনুযায়ী গত শনিবার মধ্যরাত ও রবিবার দুপুরে দুই দফা নমুনা ডিম পাওয়া যায়। গত রবিবার মধ্যরাত থেকে মা মাছ নদীতে ডিম ছাড়তে শুরু করে গতকাল সোমবার নদীতে জোয়ারের সময় ডিম সংগ্রহকারীরা নদী থেকে ডিম আহরণ করেছে।

সরেজমিনে গিয়ে হালদার পাড়ে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলা ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে কর্ণফুলী ,সাঙ্গু, মাতামুহুরী, চাঁনখালী, চেংখালী, সোনাইখাল, কুমারখালী , বোয়ালিয়া, সর্ত্তাখালসহ বিভিন্ন নদী, খাল ও ছরা থেকে মা মাছ হালদা নদীতে ছুটে আসে ডিম ছাড়তে। পরিবেশ অনুকূল থাকলে চৈত্র-বৈশাখ মাসের আমাবস্যা, অষ্টমী ও পূর্ণিমা তিথির জোতে হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছাড়ে। কিন্তু এবার বাংলা বছরের চৈত্র বৈশাখ মাসে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃষ্টি হয়নি। যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে এ বৃষ্টি হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও ছরায় ঢল সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। এমনকি নদীর উপরিভাগ থেকেও বৃষ্টিতে ঢলের প্রকোপ দেখা দেয়নি। ঢলের প্রকোপ না থাকায় হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছেড়েনি। এ বছর মে মাসে পূর্ণিমার তিথির জোর পূর্বে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ফলে আবাহাওয়ায় কিছুটা শীতল ভাব দেখা দেওয়ায় মা মাছ নদীতে পরপর দুই দফা ডিম ছাড়ার আলমত হিসেবে নমুনা ছেড়েছে। হালদা নদীর আমতুয়া, আজিমারঘাট, নাপিতেরঘাট, কুমারখালী, বাড়িয়াঘোনা ও রামদাশ মুন্সীরহাট, গড়দুয়ারা নয়াহাট, ছিপাহীরঘাট, কাগতিয়ারচড়, পাতাইজ্জারটেক, মাছুয়াঘোনা স্লুইস গেট, পোড়াকপালীর মুখ, আজিমারঘাট, আমতুয়া, কুমারখালী, বাড়িয়াঘোনা, রামদাশ মুন্সীরহাট, মাদার্শা বড়ুয়াপাড়া, মদুনাঘাট, মাদারী স্লুইসগেট প্রভৃতি এলাকায় কার্প জাতীয় মা মাছ নদীতে ডিম ছাড়ে। ডিম থেকে রেণু ফোটানোর জন্য প্রশাসন হাটহাজারী অংশে সরকারিভাবে স্থাপিত মদুনাঘাট, মাছুয়াঘোনা, শাহামাদারী হ্যাচারি ও নয়াহাট এলাকায় প্লাস্টিকের কুয়াগুলো সংস্কার করে ডিম ফোটানোর জন্য তৈরি করে রেখেছেন। তাছাড়া রাউজান উপজেলার হালদা অংশে স্থাপিত হ্যাচারিগুলো ও মেরামত করা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু ফোটানোর জন্য ডিম সংগ্রহকারীরা বিভিন্ন হ্যাচারি ও মাটির কুয়ায় গতকাল সোমবার ব্যস্ত সময় কাটান।

ডিম আহরণকারী কামাল সওদাগর জানান, তিনি এবার ডিম সংগ্রহের জন্য ৬টি নৌকায় এক বালতি করে ৬ বালতি ডিম আহরণ করেছে। যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম।

মাদার্শা মাছুয়াঘোনা এলাকার ডিম সংগ্রহকারী শফিউল আলম জানান, তিনি ৩টি নৌকার মাধ্যমে ৩ বালতি ডিম সংগ্রহ করেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী কাছে এবার কী পরিমাণ ডিম পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, হালদা গবেষকদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। তারা হিসাব-নিকাশ করে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলে সেখান থেকে আহরিত ডিমের পরিমাণ জানানো হবে। হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া গত বছরের তুলনায় এবার ডিমের পরিমাণ কম হয়েছে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, আবহাওয়া গরম, বৃষ্টির পরিমাণ কম। হালদা গবেষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, এই জোতে নদীতে মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশ অনুকূলে নয় বিধায় ডিম কম ছেড়েছে। ইউএনও মোহাম্মদ শাহিদুল আলম বলেন, এবার ডিম ছাড়ার মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃষ্টি না হাওয়া ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে ডিম ছাড়ার পরিমাণ কমে গেছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close