ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

  ১৭ মে, ২০২২

বাজারে দাম বেশি গম সংগ্রহ ব্যাহত

সরকারিভাবে প্রতি কেজি গমের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ টাকা। আর ঠাকুরগাঁওয়ে হাটবাজারে প্রতি কেজি গম বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকায়। তাই কৃষকরা গম বিক্রি করছেন খোলা বাজারে। এ কারণে চলতি মৌসুমে জেলায় গম সংগ্রহ করতে পারছে না খাদ্য বিভাগ।

শুধু উদ্বোধনী দিনে জেলায় চার উপজেলায় এক টন করে গম সংগ্রহ করেছে খাদ্য বিভাগ। এরপর থেকে ঠাকুরগাঁও জেলায় খাদ্যবিভাগের গম সংগ্রহ অভিযান থমকে গেছে।

কৃষকরা বলছে, খোলাবাজারে গমের দাম কেজিপ্রতি ৩২ টাকা ৫০ পয়সা। আর সরকারিভাবে প্রতি কেজি গমের দাম ২৮ টাকা। তাই খাদ্য বিভাগের কাছে গম বিক্রি করতে গেলে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এজন্য কৃষকরা খাদ্যবিভাগে গম বিক্রি না করে খোলাবাজারেই বিক্রি করছেন।

সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চৌধুরীহাট, খোঁচাবাড়ি, ভুল্লী, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী, রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ও হরিপুরের যাদুরানী হাটে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে ৮০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা গম বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি কেজি গমের দাম হচ্ছে ৩২ টাকা ৫০ পয়সা।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে ও চাষ হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯২ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭১ টন।

ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ গম সংগ্রহের আওতায় সারা দেশে ২৮ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন গম কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও জেলায় গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ হাজার ২৮২ টন। এরই মধ্যে জেলার পাঁচটি উপজেলায় লটারির মাধ্যমে ২৪ হাজার ২৮২ কৃষককে সরকারি গুদামে গম বিক্রির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল থেকে জেলায় সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়; চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রায় ৪১ দিন পর গত বুধবার পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে ৪টি উপজেলায় মাত্র ৪ টন গম কেনা হয়েছে।

সদরের চৌধুরীহাট গ্রামের কৃষক বাবুল চন্দ্র বলেন, গত বছর বাজারে গমের দাম কম ছিল তাই সরকারি গুদামে গম বিক্রি করেছি। কিছু টাকা লাভও হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর সরকার ২৮ টাকা কেজি দরে গম কিনছে, সে হিসেবে প্রতি টনে তিন হাজার টাকার ওপরে লোকসান হবে। আমরা যেহেতু বাজারেই গমের দাম বেশি পাচ্ছি তাহলে কেন সরকারের কাছে গম বিক্রি করতে যাব?

ভুল্লীর বালিয়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে গমের দর এমন দেওয়া হয়েছে এতে আমাদের লোকসান হবে। তাই আমার রোপণ করা পাঁচ বিঘা জমির গম বাজারেই বিক্রি করে দিয়েছি। আমার মতো অন্য কৃষকরাও তাদের গম খোলাবাজেরই বিক্রি করেছে। এখন সরকার গমের দাম বাড়ালেও কৃষকদের কাছ থেকে হয়তো কম কিনতে পারবে না। কারণ আমাদের কাছে তো গম মজুদ করার কোনো ব্যবস্থা নেই।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি গুদামে গম বিক্রির জন্য গত ১৮ এপ্রিল বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় লটারির মাধ্যমে ১ হাজার ৯৭৫ জন কৃষককে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু আগ্রহী কৃষক না পাওয়ায় সেখানে চলতি বছরের গম সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধন করা যায়নি।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার খাদ্যগুদামে গম বিক্রির জন্য লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষক খসিয়ার রহমান। তিনি বলেন, এ বছর ছয় বিঘা জমিতে গম চাষ করেছি। এতে প্রতি বিঘায় ৩০ মণ করে ১৮০ মণ গম পেয়েছি। কিন্তু সরকারি দরের চেয়ে বাজারে দাম বেশি, তাই সরকারি গুদামে গম বিক্রি করার কোনো আগ্রহ নেই।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিখিল রায় বলেন, সরকারিভাবে ২৮ টাকা কেজিতে গম কিনতে বলা হয়েছে। আর স্থানীয় বাজারে এখন সরকারি দামের চেয়েও বেশিতে গম কেনাবেচা হচ্ছে। এই কারণে নির্বাচিত কৃষকরা খাদ্যগুদামে গম বিক্রি করছে না। গত ১৩ এপ্রিল হরিপুর উপজেলার চৌরঙ্গী এলাকার কৃষক মোজাফফর হোসেনের কাছ থেকে এক টন গম নিয়ে উপজেলায় গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এরপর ওই উপজেলায় আর কোনো কৃষক সরকারি গুদামে গম বিক্রি করতে আসেনি।

মুঠোফোনে কৃষক মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, খাদ্যবিভাগের অনুরোধ করেছি গম দেওয়ার জন্য, তাদের অনুরোধের কারণে খাদ্যগুদামে গম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। তবে সে সময় বাজারেও গমের দাম কম ছিল, ২৮ টাকায় সরকারি খাদ্যগুদামে গম বিক্রি করে লোকসান হয়নি। তবে এখন সরকারি দামের চেয়ে বাজারে গমের দাম অনেক বেশি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে প্রতি কেজি গমের দাম নির্ধারণ করা হয় ২৮ টাকা। আর বর্তমানে জেলার খোলা হাটবাজারে প্রতি কেজি গম ৩১ বা ৩২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে কৃষকরা যেখানে তাদের ফসলের দাম বেশি পাবেন সেখানেই তো তারা বিক্রি করবেন- এটা স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতি চলমান থাকলে চলতি মৌসুমে জেলায় সরকারিভাবে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হওয়ার সুযোগ নেই।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close