নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১১ জুন, ২০২১

শিখতে না পারার ঝুঁকিতে স্কুলগামী শিশুদের ২৫%

বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ধাক্কায় হেলে পড়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রায় ১৫ মাস ধরে বন্ধ শিক্ষা কার্যক্রম। নেই ক্লাস, পরীক্ষা এমনকি স্কুলে যাতায়াতও। তবে বিভিন্ন উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলেও তেমন কাজে আসেনি। উল্টো বাল্যবিয়ে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, পড়াশোনার অনাগ্রহ, হতাশা বৃদ্ধিসহ নানা সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ‘প্রজন্ম বিপর্যয়’ বলছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় মহামারি যে ক্ষতি করেছে তা কাটিয়ে উঠতে আসন্ন বাজেটে ২০-২৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। জ্ঞানমুখী ও অনুসন্ধিৎসু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পাঠ্যপুস্তক এবং মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ওপর বিনিয়োগ বাড়ানোয় জোর তাদের।

২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে দেশের স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ডজনখানেক বার স্কুল বন্ধ রাখার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৩ জুন পর্যন্ত বন্ধ বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ১৫ মাস শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী।

------
দীর্ঘসময় ধরে পাঠদান থেকে দূরে থাকায় এই শিশুরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা পূরণ করা সহজ হবে না। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, দেশের স্কুলগামী প্রায় ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মে মাসে প্রকাশিত গবেষণার তথ্যানুসারে, প্রাথমিক পর্যায়ের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ স্কুলগামী শিশু শিখতে না পারার ঝুঁকিতে আছে।

শহুরে অঞ্চলে মাধ্যমিক স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিখতে না পারার এই ক্ষতি আরো বেশি। এই ঝুঁকি মেয়েদের মধ্যে ২৬ শতাংশ ও ছেলেদের মধ্যে ৩০ শতাংশ। কোভিড-১৯ চালিত অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণেই সম্ভবত মাধ্যমিক পর্যায়ের অতিদরিদ্র পরিবার থেকে আসা ছেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

বিশ্বে করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ সরিয়ে ফেলা হলেও প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মেয়েশিশু সম্ভবত আর স্কুলে ফিরবে না। গত বছর এক সতর্কবার্তায় এই তথ্য জানায় ইউনেস্কো। স্কুল পুনরায় চালু হলে এই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর জোর প্রদান করে সংস্থাটি।

এই অবস্থায় কেমন বাজেট হওয়া উচিত এ নিয়ে গত রবিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বরাবর ১৭টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান।

এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. রাশেদা কে চৌধুরী জানান, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন মতবিনিময় সভার প্রস্তাবনা, এডুকেশন ওয়াচসহ অন্য গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য, শিক্ষাবিদদের নির্দেশনার ভিত্তিতে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০, রূপকল্প-২০৪১, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-এর সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষা বাজেট পেশ করতে হবে। আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। ঝরে পড়া ঠেকাতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের মাসিক ২৫০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা, স্কুল রি-ওপেনিং গাইডলাইন অনুসরণ করে ১০ শতাংশ অর্থ জেলা, উপজেলা ও বিদ্যালয় পর্যায়ে বরাদ্দ দিতে হবে।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিখনসামগ্রী নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। ইন্টারনেটভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে একটি করে আইসিটি ডিভাইস প্রদান করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার অপটিক কেব্ল সংযোগ থাকলেও বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায়নি, এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শিক্ষা খাতে আইসিটি উন্নয়নে বরাদ্দ দিতে হবে।

মূল ধারার সব বিদ্যালয়ে স্কুল মিল চালুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া, চর-হাওর ও উপকূলীয় এলাকার বিশেষ চাহিদা সামনে রাখে বরাদ্দ দিতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সফটওয়্যার প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বই ছাপানো, করোনাকালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতে মন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ রেখে একজন শিক্ষককে মনোসামাজিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করা, এজন্য ল্যাবরেটরি, উপকরণসহ প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক নিয়োগ। শিক্ষা গবেষণার জন্য সরকারি-বেসরকারি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া। শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর লক্ষ্যে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে করের আওতা বৃদ্ধি করা। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, করোনা মহাসংকটে সারা পৃথিবীতেই পরিকল্পনা, কর্মসূচি এবং বাজেটে শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে আমরা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো পাঠ্যপুস্তক ও কারিকুলাম। বর্তমানে দেশে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যে পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হচ্ছে তা মানসম্মত নয় উল্লেখ করে এর আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, ২০১০ সালে শিক্ষানীতি করেও শিক্ষার উন্নয়ন ঘটানো যায়নি। জিপিএ-৫ নির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিলে শক্তিশালী জাতি গঠন দুরাশা। এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক তৈরিতে বারবার ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে। এজন্য এ খাতে বড় বিনিয়োগ দরকার। বাজেটে এই দিকটি লক্ষ রাখতে হবে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষা বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ২০ শতাংশ হওয়া জরুরি। জিডিপির আকারে যা হবে ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে এ বরাদ্দের পরিমাণ ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার কথা জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, শিক্ষায় বরাদ্দের কমতি আছে এ কথা সত্যি। তবে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সেটাই পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেটুকু হচ্ছে তাও গুণগত ও দুর্নীতিমুক্তভাবে হচ্ছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্বাধীন। শিক্ষার উন্নয়নে তারা গবেষণা করছে না। গবেষণা করে যেখানে ব্যয় করা উচিত সেখানে করুক। তখন বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সরকার অবশ্যই বাড়াবে। তারা কেন এটা করতে পারছে না এজন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামসুদ্দিন মাসুদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের। বাজেটে তাদের জন্য খাতা-কলম, স্কুলের পোশাক, স্কুল ফিডিংয়ের বরাদ্দ থাকা জরুরি। বাংলাদেশ বেসরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এনামুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা খাতে বর্তমানে যা হচ্ছে সবটাই অবকাঠামো উন্নয়ন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারো উন্নতি হচ্ছে না। সরকার শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাবরেটরি নেই। ফলে এ প্রশিক্ষণ কাজে লাগছে না। সর্বোপরি লেকচার মেথড থেকে বের হয়ে আমাদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা পদ্ধতিতে যেতে হবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close