আল-আমিন মিয়া, পলাশ (নরসিংদী)

  ০৫ ডিসেম্বর, ২০২০

হাঁড়িধোয়া নদী পুনঃখনন

লাগামহীন বালু উত্তোলন ঝুঁকিতে সেতু-ফসলিজমি

‘নদীর যেখানেই বালু পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই ড্রেজার বসিয়ে তোলা হচ্ছে’

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার হাঁড়িধোয়া নদী পুনঃখননের কাজে ড্রেজার বসিয়ে লাগামহীন বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে আছে এই নদীতে নির্মিত সেতু এবং নদী তীরবর্তী রাস্তা ও স্থাপনা। কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি ধসে নদীতে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় আছে গ্রামবাসী। অভিযোগ আছেÑ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় এই বালু ব্যবসা করছেন প্রভাবশালীরা। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত দিয়েও মেলেনি এর সমাধান। তবে প্রজেক্টের সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার আবদুুল মাজেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

নরসিংদীর অন্যতম নদী হাঁড়িধোয়া। শীতলক্ষ্যা থেকে ভেলানগর পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটারের এই নদীতে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ১০-১২টি সেতু এবং এর পাড়ে স্কুল-কলেজসহ আছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া দুই তীরেই রয়েছে অনেক ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও গ্রাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর যেখানেই বালু পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই ড্রেজার বসিয়ে ২০-৩০ ফুট গভীর করছেন বালু উত্তোলনকারীরা। একেকটি স্থানে ৮-৯ মাস ধরে বালু তুলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে তা।

------
নরসিংদীর আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া, পাহাড়িয়া, মেঘনা শাখা নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ ও নারায়গণঞ্জের অন্তর্গত পুরোনো ব্রহ্মপুত্র শাখা নদ পুনঃখননে ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেয় সরকার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্পের দায়িত্ব পায় বাস্তবায়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড। এপ্রিল ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্প সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।

২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল সদর উপজেলার চর এলাকা করিমপুর ইউনিয়নের শুঁটকিকান্দি গ্রামে এই নদী খনন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম হিরু (বীরপ্রতীক)। এ সময় তিনি জানিয়েছিলেন, প্রায় ২৩২ কিলোমিটার ব্রহ্মপুত্র খনন, ২২ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ৮৫টি সেতুর ফাউন্ডেশন শক্তিশালী করা হবে। তবে চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর এক সভা শেষে নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহান কাউনাইন জানিয়েছিলেন, নরসিংদী নদ-নদীর ভরাট দূর করতে ইতোমধ্যে খননের কাজ প্রায় ৭১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। সেখানে এক প্রতিবেদনে তিনি জানান, হাঁড়িধোয়া নদীর অবৈধ দখলদারের কাছ থেকে মুক্ত করা হয়েছে ৮৪ একর জমি। যার বাজার মূল্য ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

এদিকে সেতুর ফাউন্ডেশন শক্তিশালীকরণ এবং জেলা প্রশাসক হাঁড়িধোয়ার দখল উদ্ধারের তথ্য জানালেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন অবস্থা। তবে জেলা সদরের ভেলানগর সেতু থেকে শুরু করে শিবপুর উপজেলার সাধারচর ও পলাশের সীমান্তবর্তী শীতলক্ষ্যা পর্যন্ত হাঁড়িধোয়া নদীতে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এই বালুতীরবর্তী জমিতে স্তূপ করে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল। হুমকির মুখে পড়ছে সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। সরেজমিনে গিয়ে চরনভরদী বাজার, গজারিয়া বাজার, রামপুর, চর আলীনগরসহ চরসিন্দুর কলেজের পাশেই দুটি স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলতে দেখা গেছে। এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানের কথা জানা গেলেও, বালু তোলা ও বিক্রির কাজ করা শ্রমিকরা কারো নাম বলতে চাননি।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে উপজেলার গজারিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমপর্যায়ে নদী খননকাজ সেনাবাহিনী তদারকি করত। তখন নদী খননকাজে কোনো অনিয়ম ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেনা সদস্যদের তদারকি কমে যাওয়ার কারণে নামে-বেনামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে এই হাঁড়িধোয়া থেকে রাত-দিন চলছে বালু উত্তোলনকাজ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গজারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বদুরুজ্জামান ভূঁইয়াসহ স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে অনুমোদন ছাড়াই হাঁড়িধোয়া নদী থেকে বালু তুলে বিক্রি করছে। এভাবে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

এদিকে কৃষিজমি ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গজারিয়া ইউনিয়নের দড়িচর গ্রামের আমিনুল ইসলাম খোকা উদ্যোগী হয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বদুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন। একই কারণে আদালতে মামলা এবং নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঠিকাদার শাহীন।

সোনালি ড্রেজার নামক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নদী খননের কাজ পেয়েছে। চরসিন্দুর ইউনিয়নের শফিউল আলম শাহীন নামে এক ঠিকাদার বলেন, সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে নদী খননকাজ আগে সঠিকভাবেই হচ্ছিল। কিন্তু নতুন প্রজেক্টের সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার আসার পর বিভিন্ন স্থানে বালু বিক্রি হচ্ছে।

ঠিকাদার শাহীন আরো বলেন, আমি নিজেও বৈধভাবে মাটি নেওয়ার ঠিকাদার হিসেবে চুক্তিনামা করি। যেখানে উল্লেখ আছে, স্কুল-কলেজ ও মসজিদগুলোতে আমি এক গাড়ি মাটি নিজের টাকায় ভরাট করে দিলে পাঁচ গাড়ি মাটি আমি নিতে পারব। টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্থানে মাটি-বালু বিক্রি শুরু হওয়ার পর এ নিয়ম কোথাও মানা হচ্ছে না। এ অভিযোগে প্রজেক্টের সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার আবদুল মাজেদের বিরুদ্ধে গত ২০ অক্টোবর নরসিংদী জেলা দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন ঠিকাদার শাহীন। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন এই ঠিকাদার।

অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে প্রজেক্টের সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার আবদুল মাজেদের মোবাইলে প্রতিদিনের সংবাদ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। সেনাবাহিনীর সাবেক এই সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার জানান, তার অধীনেই ড্রেজিং হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, সাব-কন্টাক্টের অধীনে অনেক জায়গায়ই কাজ চলছে, সবখানে একই সঙ্গে সেনা সদস্য দিয়ে তদারকি সম্ভব হয় না। এই সুযোগে কেউ অবৈধভাবে বালু তুলতে পারে, তবে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাঁড়িধোয়া থেকে বালু তুলে অন্যত্র বিক্রির অভিযোগ আছে গজারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বদুরুজ্জামান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি নদী খননের ঠিকাদার শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে ট্রলিপ্রতি ২৫০ টাকা ও ড্রাম ট্রাকপ্রতি ৪০০ টাকা দরে বালু কিনে ব্যবসা করি।’

এ বিষয়ে কথা বলতে নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহান কাউনাইনের ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পলাশ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম এ বিষয় বলেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বালু উত্তোলনের অভিযোগে গজারিয়া বাজারের পাশে নদী থেকে শাহজালাল এন্টার প্রাইজের শহিদুল ইসলাম ও আবু ছালেহ মো. রায়হান নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তারা বালু উত্তোলন না করার শর্তে মুচলেকা দিয়ে তারা ছাড়া পান। বিষয়টি নরসিংদীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়