না.গঞ্জে জাহাজশিল্প

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

* শীতলক্ষ্যা তীরে কর্মচাঞ্চল্য * সৃষ্টি হচ্ছে হাজারো কর্মসংস্থান

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

আব্দুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

নদী মাতৃক বাংলাদেশে এক সময় পণ্য পরিবহনের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌপথ। শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশে পন্য পরিবহন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখনো নৌপথে একসঙ্গে অধিক পরিমাণের পণ্য কম খরচে পরিবহন করা যায়। যা অন্য পথে সম্ভব নয়। বর্তমানের সড়ক যোগাযোগের প্রভুত উন্নতির পরেও ব্যবসায়ীরা নৌপথে পণ্য পরিবহনকেই প্রাধাণ্য দিতে চান। তাই দরকার হয়ে পড়েছে ছোট বড় জাহাজের সংখ্যা। একারণে নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে কয়েদপাড়ার চরে গড়ে উঠেছে জাহাজ মেরামত ও নতুন জাহাজ তৈরির অসংখ্য কারখানা।

নারায়গঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর ঘেষে যে পিচঢালা সড়কটি গাজীপুরের কালীগঞ্জে গিয়ে মিশেছে, সেই রাস্তা ধরে মাত্র এক কিলোমিটার এগোলেই বিভিন্ন গ্রামের নদীর চরে জাহাজ তৈরির অসংখ্য কারখানার দেখা পাওয়া যায়। কোনোটি এখনো তৈরি হচ্ছে, কোনোটি শেষের পথে। যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে যাবে বড় বড় জাহাজ দেখে। ইতিমধ্যেই শীতলক্ষ্যা পাড়ের এ চরটি এলাকাবাসীর কাছে জাহাজের চর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আর এ জাহাজের চরটিই হলো রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়ন।

কায়েতপাড়া এখন হাজার মানুষের পদচারণা আর কর্মচাঞ্চল্যমুখর জনপদ। কায়েতপাড়ার পূর্বগ্রাম, বড়াল, মাঝিনা, ভাওয়ালীয়াপাড়া, ডাক্তারখালী, হড়িনা ও ইছাখালীর চরে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা। এ ছাড়া উপজেলার দাউদপুরের বেলদী এবং মুড়াপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানগর, মাঠেরগাট ও দড়িকান্দির চরে রয়েছে আরো ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান। মাসটাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, শামস ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানাগুলোর অন্যতম।

আড়াইশ ফিট থেকে শুরু করে শত ফিটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পন্টন, বালবাহী ট্রলার, বলগেট আর ডেজার তৈরী হয় শীতলক্ষ্যার এই চরে। দিনভর টানা খুটখাট আর টুং টাং শব্দে মুখরিত এলাকায় অচেনা কেউ এলে হয়তো ভাবতে পারে এলাকাজুড়ে চলছে কোনো উৎসব।

জাহাজ তৈরির পদ্ধতি: জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেনশিট আর এঙ্গেল। অতিরিক্ত উপাদান বলতে টি-গার্ডার, বিট-গার্ডার, রং, ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং বড় আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরো কাজ। মেশিন আনতে হয় বিদেশ থেকে। একটি বড় মাপের কোস্টার জাহাজ তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেইস লাইন তৈরি করেন। পরে ঠিকাদারের নির্দেশনাক্রমে ফিটাররা জাহাজের মলিন তৈরি করেন। ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজটির খাঁচা তৈরি করেন। একটি বডি দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন আর রঙের কাজ। জাহাজে তিন-চারটি খুঁপড়ি বা হোস থাকে। যেখানে ৩০০-৪০০ টন পর্যন্ত মাল বহন করা যায়। প্লেনশিট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশি কাটা জাহাজের ৮ থেকে ১২ মিলির শিট ব্যবহার করা হয় জাহাজ তৈরিতে। ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে শিট কিনতে হয়। আর লোহার এঙ্গেল ১২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৮-৯ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে আর অন্য মালামাল আসে ঢাকার বংশাল অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী থেকে। সর্বসাকুল্যে একটি বড় জাহাজ তৈরিতে ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা খরচ হয়। এরপর মালিকরা সুবিধা মতো লাভ করে তা বিক্রি করেন। একটি জাহাজ ২০ থেকে ২৫ জন কারিগর মিলে তৈরি করলে ১২ থেকে ১৫ মাস লাগে।

শোনা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে জাহাজ তৈরির জন্য ভারতবর্ষ থেকে শ্রমিক নেয় ব্রিটেন। তারমধ্যে ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন ৩২০ জন। তাদের সকলের বাড়ি ছিল দোহারে। সেই থেকে জাহাজ তৈরি দোহারবাসীর আদি ব্যবসা। অনেকে মজা করে বলেন, ‘বাড়ি আমার দোহার, কাজ করি লোহার।’ এখন বিক্রমপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ আর নবাবগঞ্জের শ্রমিকরাও কাজ করছেন সমানতালে। রং এবং রাজমিস্ত্রির কাজ করেন স্থানীয়রা। জাহাজ তৈরির জন্য যিনি জমি দেন এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন, তাকে বলা হয় কারখানা মালিক। আর যারা জাহাজটি ফিটিংস করেন, তাদের বলা হয় ফিটার। জাহাজে ঝালাইয়ের কাজ করেন ওয়েল্ডার আর পুরো ব্যাপারটা যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি হলেন ঠিকাদার। জাহাজ তৈরির সব উপকরণ কিনে দেন জাহাজের মালিক। জমির মালিক একটি জাহাজ ফেলার জন্য জমির ভাড়া নেন ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন ঠিকাদারের মাসিক বেতন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একজন রাজমিস্ত্রি দৈনিক হাজিরা পান ৫০০ টাকা, তার সহযোগী ৪০০ টাকা। ফিটারের দৈনিক বেতন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ওয়েল্ডার পান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। রং মিস্ত্রির হাজিরা ৫০০ টাকা, তাদের সহকারীদের বেতন ৩০০ টাকা। আর সব হেলপারের দৈনিক হাজিরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে। সব খরচা শেষে একটি জাহাজ পানিতে নামানোর পর জাহাজের মালিক আলোচনার ভিত্তিতে তা বিক্রি করেন। বছরে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মতো তাদের আয় হয় বলে জানা যায়।

শ্রমিক ও মালিকদের কথা : ফিটার লোকমান, জাফর, জাহিদ, আলম; ওয়েল্ডার কবির, মালেক আরো অনেকে জানান, করোনার সময় শুয়ে বসেই দিন কাটিয়েছেন তারা। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কাজের চাপ বাড়ছে। তবে কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম। তারা বলেন, এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ তারা শিখেননি। এটাই করতে হবে। এছাড়া উপায় নাই।

জাহাজের মালিক ওসমান ঢালী, লতিফ, আনোয়ার হোসেন, কামাল, মাহফুজ, আবদুল মজিদসহ আরো অনেকে বলেন, রোজ হাজিরা মালামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিল আর জমির ভাড়ার ভিতর লুকিয়ে থাকে জাহাজের লাভ-লোকসানের ব্যাপার। এসব হিসাব কষে সবাইকে টাকা দিতে হয়। তবে বেশ খুশি মাসটাং ডকইয়ার্ডের ম্যানেজার ফারুক আহমেদ, বাড়িওয়ালা নুরুল হুদা, সাঈদ আহমেদ, হাবিব, সুমন, খোকন, আলী আকবরসহ আরো অনেকে। তাদের মতে, এলাকায় জাহাজ শিল্প গড়ে উঠায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ।

শীতলক্ষ্যা পাড়ের জাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি এবং মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাস্টাং ডকইয়ার্ডের স্বতাধিকারী সাজ্জাদ হোসেন তুহিন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মালামালের বাড়তি দাম এবং কাচামাল আমদানীর ভালো সুবিধা না থাকায় যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে কায়েতপাড়ার একমাত্র শিল্পটি।

এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর (বীরপ্রতিক) জানান, বন্যাকবলিত অবহেলিত কায়েতপাড়ায় জাহাজ শিল্প গড়ে উঠায় ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। জাহাজ কারখানা পরিবেশের কোনো দূষণ করছে না বলে তিনি দাবি করেন।

 

 

"