ব্রেকিং নিউজ

প্রবেশমুখে ভয়ংকর চক্র হাতাচ্ছে বিপুল টাকা

* বরিশালে খেয়াঘাট ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিধর চক্র * দিন শেষে মাঝিদের কাছ থেকে অবৈধ টাকার ভাগ নিচ্ছেন কোটা মালিকরা

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

মাসুদ রানা, বরিশাল

কীর্তনখোলা নদী পাড়ি দিয়ে বরিশাল নগরে প্রতিদিন যাতায়াত করা হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে একদল মাঝিমাল্লা চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। বিআইডব্লিউটির ইজারামুক্ত এ ঘাটটি পারাপারে জনপ্রতি ২ টাকা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে ৫ টাকা। যাত্রীরা এই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর হামলা করেন ভংয়কর মেজাজের মাঝিমাল্লারা। এদিকে খেয়া পারাপারের নৌকা ও ট্রলার স্থানীয় ক্ষমতাধর এবং প্রশাসনের অসাধু একাধিক কর্মকর্তার নামে কোটা পদ্ধতিতে চলাচল করছে। দিন শেষে কোটা মালিকরা মাঝিদের কাছ থেকে অবৈধ টাকার ভাগ নিচ্ছে। এভাবে খেয়াঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিধর মাঝিমাল্লা চক্র। বরিশাল সদর উপজেলা চরকাউয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি এবং তার আপান ভাই জেলা পরিষদ সদস্য মুনাওয়াল ইসলাম অলি এসব টাকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানিয়েছেন মাঝিমাল্লা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সজীব হোসেন। অপরদিকে মুনাওয়াল ইসলাম অলি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, ঘাটে জনগণের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলি বলে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়ানো হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বরিশাল সিটি এলাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার নগরীর চরকাউয়া খেয়াঘাট। ঘাটের একপার সিটি করপোরেশনের ৯ ও ১০নং ওয়ার্ডের কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীর এ স্থানটিতে দাঁড়ালে দেখা যাবে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে হাজার হাজার যাত্রী নদী পাড়ি দিচ্ছেন। এক দল আসছে নগরীর দিকে, অন্য দল নগরী ছেড়ে যাচ্ছে পূর্ব পাড় সদর উপজেলার চরকাউয়ায়। খেয়ার মাঝিদের তথ্য মতে, প্রতিদিন কমপক্ষে অর্ধলাখ মানুষ কীর্তনখোলা পাড়ি দিয়ে নগরীতে আসা-যাওয়া করে। শত বছরের পুরোনো চরকাউয়ার এ খেয়াঘাটটি দিয়ে বরিশাল সদর উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন, বাকেরগঞ্জ উপজেলা, ভোলা জেলা এবং পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাসিন্দাদের বরিশাল বিভাগীয় ও সিটি শহরে আসতে সহজ পথ। এ কারণে খেয়াঘাটে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা যাত্রী পারাপার হয়। যাত্রী পারাপার সহজলভ্য করতে তৎকালীন মেয়র ও বিআইডব্লিউটিএ এই খেয়াঘাট ইজারা মুক্ত করে দেন। সে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যাত্রী প্রতি ২ টাকা হারে খেয়া পার হবে। করোনা অজুহাত দেখিয়ে লকডানের সময় ৫ টাকা ভাড়া নেওয়া শুরু করে মাঝিমাল্লারা। লকডাউন শেষ হলেও কেন ২ টাকার ভাড়া ৫ টাকা করে নেওয়া হয় এ নিয়ে প্রতিদিন যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে চড়কাউয়া খেয়াঘাটে। প্রায় সময়ই হামলার শিকার হন যাত্রীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুটি চক্র নিয়ন্ত্রণ করে খেয়াঘাট। একটি চক্র হচ্ছে, যাত্রী পারাপারে যে ট্রলার বা নৌকা ব্যবহৃত হয় তা কোটা পদ্বতিতে চলে বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার নামে। মাঝিমাল্লারা রাত-দিন নৌকা চালিয়ে কোটার মালিকদের হাতে ৩০০ টাকা করে দিতে বাধ্য থাকেন। তার ওপর ক্ষমতাধরদের তো প্রতিনিয়ত বখরা দিতে হয়। অপর চক্রটি হচ্ছে মাঝিমাল্লা চক্র। তারাও অতি মুনাফার আশায় কোটা মালিকদের আস্ফলনে ৫ টাকা করে ভাড়া আদায় বন্ধ করছে না যাত্রীদের কাছ থেকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে খেয়াঘাটে ১০৫টি নৌকার কোটা আছে। মাঝিদের ভাষ্যানুযায়ী, প্রতিদিন তারা এপার ওপার মিলিয়ে একেকটি নৌকা অন্তত ৬০টি ট্রিপ দেয়। প্রতি ট্রিপে ১০ জন করে ৫ টাকা হারে দিন-রাত মিলিয়ে ১০৫টি নৌকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা করে আদায় হয়। এর মধ্যে শুধুমাত্র প্রতিটি নৌকায় তেল খরচ হয় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা করে। বাকি টাকা ভাগাভাগি হয় কোটা মালিক ও মাঝিমাল্লা চক্রের মধ্যে। মাঝিমাল্লা সমিতির সাধারণ সম্পাদক সজীব হোসেন কোটা পদ্ধতি ও ভাড়া বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এই সমস্যার সমাধান চরকাউয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি ও তার ভাই জেলা পরিষদ সদস্য মুনাওয়াল ইসলাম অলি দিতে পারবেন। তবে জেলা পরিষদ সদস্য মুনাওয়াল ইসলাম অলি এ প্রতিবেদককে জানান, আমি সদর উপজেলা পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আছি। আমি প্রকৃত মাঝিদের বাদ দিয়ে কোটা পদ্ধতিতে নৌকা চালানোর বিরোধিতা করায় আমার ওপর এ অনিয়মের দায় চাপানো হচ্ছে। আর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে কি করা যায় তা নিয়ে তিনি শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।

 

"