ব্রেকিং নিউজ

মাছ ধরার উৎসব

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বিল জলাশয়ে পানি স্বল্পতায় গাইবান্ধা জেলার গ্রামাঞ্চলে এখন চলছে মাছ ধরার মৌসুম। সেই সঙ্গে বিল জলাশয়গুলোতেও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী আর আনন্দময় ‘বৈদ’ নামের দলবদ্ধ মাছ শিকার। গত সোমবার সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের ঝিনিয়ার বিল ও কুপতলা ইউনিয়নের নলিগলির বিলে মাছ শিকারের মধ্য দিয়েই এবার শুরু হয়েছে বৈদ নামে দলবদ্ধ মাছ শিকারের পর্ব। এদিকে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে কার্র্তিক মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই খাল-বিলের পানি শুকিয়ে গেছে। নিচু জমি বা খালের পানি অগভীর নলকূপের মেশিন ব্যবহার করে অন্য জমিতে সরিয়ে নিয়ে চলছে মাছ ধরার উৎসব। গ্রামের যুবকরা দলবেঁধে নেমেছেন এই মাছ ধরার উৎসবে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি মুকুল মাসুদ জানান, প্রাচীনকাল থেকেই এ জেলার গ্রামে গ্রামে বৈদ নামের এই মাছ ধরা চলে আসছে। বৈদ নামে প্রকৃত অর্থ কি জানা না গেলেও এর বিশেষ শিংগার ফুৎকার আর দলবদ্ধ মাছ ধরার আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে এই নামের সংশ্লি­ষ্টতা রয়েছে। সাধারণত কার্তিক মাসের প্রথমদিক থেকে শুরু করে মাঘ মাস অবধি যখন বড় বড় বিল, নদী ও খালে পানি কম থাকে তখনি এই দলবদ্ধ বৈদ নামের মাছ ধরার প্রকৃত মৌসুম। জেলার সাতটি উপজেলাতেই রয়েছে পৃথক পৃথক শৌখিন এই মাছ শিকারির দল। বৈদদলের আলোচনার ভিত্তিতে মাছ শিকারের নির্দিষ্ট জলাশয়, তারিখ, সময়, যাত্রার স্থান নির্ধারণ করে গ্রামের হাট-বাজারে ঢোল শহরৎ করে তা জানিয়ে দেওয়া হয়। এই বৈদদলের একজন দলনেতা থাকেন। যার কাছে থাকে মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বড় একটি বাঁশি। যাকে বলা হয় বৈদের শিংগা। যা দিয়ে বিউগলের মতো উচ্চস্বরে শব্দ বের হয় এবং অনেক দূর থেকে তা শোনা যায়। নির্ধারিত স্থানে যথাসময়ে শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হয় বার বার। আর শিংগার আহ্বানে নিজ নিজ পছন্দমতো মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম নিয়ে সমবেত হতে থাকে মৎস্য শিকারিরা। পূর্বনির্ধারিত বিল জলাশয়ে দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকার চলে দিনভর। এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই, যে কেউ এতে সামিল হতে পারে। সে কারণে একটি বৈদের দল যখন কোনো বিল বা নদীতে একযোগে সারিবদ্ধভাবে মাছ শিকারে নামে তখন একটি বৈদের দলে মাছ শিকারির সংখ্যা কমপক্ষে ৫০০ থেকে দাঁড়ায় ১ হাজার বা তারও বেশি হয়ে যায়। বৈদে সাধারণত মাছ ধরার সরঞ্জামের মধ্যে পলো, হ্যাংগার জালি, পলো জালি, হ্যাগা, মুঠ জাল, কোঁচা, ক্যাটা, তৌরা জাল, ঝাঁকি জাল ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বৈদে মাছ মারা চলে সকাল থেকে বিকাল অবধি এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে। এতে অনেক মাছ পান আবার অনেকে একটি মাছও পান না। কিন্তু তাতে বৈদ শিকারিদের কোনো দুঃখবোধ নেই। কেননা এখানে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দটাই মুখ্য, মাছ প্রাপ্তিটাই মূল বিষয় না।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থেকে প্রতিনিধি আশিক সরকার জানান, জমি এবং খালের পানিতে থাকা মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছে এলাকার শিশুসহ নানা বয়সি নারী-পুরুষ। কার্তিক মাস আসলেই যেন প্রতিটা গ্রামের লোকেরা মেতে ওঠে এ মাছ ধরার উৎসবে। পুকুর, বিল ও জলাশয়গুলো থেকে পানি কমতে শুরু করায় পানির ওপরে মাছ ভাসছে আর কিলবিল করছে মাছ। গত রোববার মাছ ধরার এমন উৎসবমুখর দৃশ্য দেখা গেছে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার হায়দারপুর, চরটেংরাইলসহ আরো কয়েকটি গ্রামে। সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন নানা বয়সি মানুষ দলবদ্ধভাবে পানি সেচের ইঞ্জিন ব্যবহার করে এক ডোবার পানি অন্য জমিতে স্থানান্তরের পর হাত দিয়ে মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছে তারা। টেংরা, পুঁটি, টাকি, শোল, শিং মাছসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরায় ব্যস্ত এসব লোক। হায়দারপুর গ্রামের বাসিন্দা লেলিন সরকার জানান, গ্রামের সবাইকে নিয়ে মাছ ধরতে এসেছি। তবে আগে পানি নামার এমন সময়টাতে নানা প্রজাতির দেশিও মাছ ধরা পড়ত কিন্তু এখন আর আগের মতো সেসব মাছ দেখা যায় না। তবে যা পাওয়া যায় সেসবের স্বাদও ভিন্ন। তবে চাষের মাছের চাইতে বিল-জলাশয়, খেত, ডোবার তাজা মাছের স্বাদই আলাদা। একই গ্রামের আজিম সরকার জানান, মাছ খাওয়ার চাইতে মাছ ধরার মজাটাই বেশি। গ্রামের সব বয়সি লোক একসঙ্গে মাছ ধরার যে কি মজা তা বলে বুঝাতে পারবো না। হাঁটু পর্যন্ত কাদা মাটিতে নেমে শোল, টাকি, শিং মাছ ধরে খুব মজা পায় লোকজন। কেউ কাদায় হাত দিয়ে, আবার কেউ জাল দিয়ে, আবার কেউ ভিন্ন উপায়ে মাছ ধরছেন।

রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলায় ফেরিওয়ালাকে মাছ বিক্রি করতে দেখেছেন। সে স্মৃতি থেকেই তিনি ‘বালক’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে/তপ্সি মাছের ঝুড়িখানা গামছা দিয়ে ঢেকে’। সেই গামছা দিয়ে ঢেকে এই কার্তিক মাসে গ্রাম বাংলার গ্রামে গ্রামে বিল-ঝিল ও হাওরে তাজা মাছ মারার ধুম পড়ে। এই মাসেই তাজা সুস্বাদু মাছ দিয়ে রান্না করা লাউশাকের পাতলা ঝোলের সুঘ্রাণে মাতোয়ারা হয় গ্রামবাসী।

 

"