ভয় নয়, করোনায় হতে হবে সচেতন

জ্বর হলেই পরীক্ষা নয় : দেবী শেঠি

প্রকাশ | ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশ্বের ১৯৩ দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। তবে এরই মধ্যে ঋতু পরিবর্তনের ফলে এখন অনেকে সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এতে আতঙ্ক তাড়া করোনা। কিন্তু সর্দি-কাশি হলেই করোনা হয়েছে, এমন মনে করা যাবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, সর্দি-কাশি হলেই ভয় পাবেন না। সর্দি-কাশি হলেই আপনার করোনা হয়েছে এমন নয়। ঋতু পরিবর্তনের ফলে এ সময় অনেকেই সর্দি-কাশির সমস্যায় ভুগছেন। এখন করোনার ভয়ে অনেকে জ্বর, সর্দি-কাশি হলেই ছুটছেন চিকিৎসকের কাছে। আবার অনেকে নিজের ইচ্চামতো ওষুধ সেবন করছেন। আর এতেই বাড়ছে বিপদ। তবে কিছু বিষয়ে আপনাকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। আসুন জেনে নিই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়।

জ্বর কি কাঁপুনি দিয়ে আসে : যদি এমন হয় যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। তবে ম্যালেরিয়ার সম্ভাবনা খুঁজে দেখতে শুরু করবেন চিকিৎসকরা। আবার জ্বরটা ছেড়ে বা কমে গিয়ে দুই দিন পর এলেও তা ফিরলে ডেঙ্গুর লক্ষণ রয়েছে কিনা তা দেখেন চিকিৎসকরা। আর জ্বরের সঙ্গে কি শুকনো কাশি হচ্ছে, নাকি কাশির সঙ্গে ঘন কফও আসছে। শুকনো কাশি হলে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনার কথা ভাববেন ডাক্তাররা। তবে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা প্রয়োজন।

চিকিৎসক অরিন্দম বলছেন, কফ সাদা হলে চিকিৎসক বুঝবেন রোগী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। তখন সেই সংক্রমণ থেকে বের করে আনতে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হবে। তাই জ্বর, সর্দি, কাশি হলেই অযথা আতঙ্কিত হবেন না। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরীক্ষার জন্য ছোটাছুটি করে লাভ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

এদিকে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস শরীরে আস্তানা গড়লেও দুই সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি সময় পর গিয়ে সেটি প্রকাশ পায়। এমন পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস নিয়ে জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন উপমহাদেশের বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠি।

করোনাভাইরাসের অন্যতম একটি উপসর্গ হচ্ছে জ্বর। কিন্তু জ্বর হলেই করোনাভাইরাসের পরীক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. দেবী শেঠি। তার মতে, অতিরিক্ত পরীক্ষা ভবিষ্যতে বিপদ বাড়াবে। কেননা চাহিদার তুলনায় করোনা পরীক্ষার কিট অপ্রতুল। এতে অত্যধিক করোনা পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবী শেঠি বলেছেন, এ বার্তাটি শুধু ভারতের জন্য। এখানে সমস্যাটা অন্যরকমের। আমাদের দেশের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। পরীক্ষা কিট রয়েছে দেড় লাখেরও কম।

তিনি বলেন, যদি কারো ফ্লু বা সর্দি থাকে; তাহলে প্রথমে নিজেকে আইসোলেট রেখে লক্ষণ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রথম দিন শুধু ক্লান্তি আসবে। তৃতীয় দিন হালকা জ্বর অনুভব হবে সঙ্গে কাশি ও গলায় সমস্যা। পঞ্চম দিন পর্যন্ত মাথাব্যথা। পেটের সমস্যাও হতে পারে। ষষ্ঠ বা সপ্তম দিনে শরীরে ব্যথা বাড়বে এবং মাথা যন্ত্রণা কমতে থাকবে। তবে ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পেটের সমস্যা থেকে যাবে। এবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম ও নবম দিনে সব লক্ষণই চলে যাবে। তবে সর্দির প্রভাব বাড়তে থাকে। এর অর্থ আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে এবং আপনার করোনা আশঙ্কার প্রয়োজন নেই।

করোনা পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেবী শেঠি বলেন, এমন সময় আপনার করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। কারণ আপনার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। যদি অষ্টম বা নবম দিনে আপনার শরীর আরো খারাপ হয় করোনা হেল্পলাইনে ফোন করে অবশ্যই পরীক্ষা করিয়ে নিন।

শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভারতীয় এই চিকিৎসক বলেন, আমার পরামর্শ হলো জ্বর হলেই করোনার পরীক্ষা নয়। আগে অপেক্ষা করে উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করুন। খারাপ হলে নিজেকে পরীক্ষা করিয়ে নিন। অত্যধিক মাস্ক বিক্রির কারণে নিজের হাসপাতালেও এন নাইনফাইভ মাস্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনি ভয় পেয়েছেন বলেই পরীক্ষা করা উচিত নয়।

আর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারির এই সময়ে আতঙ্কিত হওয়া, ভয় পাওয়া, অবসাদে ভোগা, রেগে যাওয়া, হতাশ হয়ে যাওয়া, এগুলো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ আতঙ্কিত হবে। ভয় পাবে। উদ্বিগ্ন হবে। তাদের আচরণের পরিবর্তন অবশ্যই হবে। তাহলে করোনাভাইরাস নিয়ে এই ভয়, আতঙ্ক, এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কী করবে?

আহমেদ হেলাল বলেন, ‘আমরা যদি আতঙ্কিত হই, আমরা যদি মানসিক চাপে ভুগতে থাকি, আমরা যদি ভয় পাই, উদ্বিগ্ন হই, তাহলে আমাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমতে থাকবে। আতঙ্কিত বা ভয় পেলে আমাদের শরীরের বিভিন্ন ট্রান্সমিটারে একটা তারতম্য ঘটে। এতে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে যিনি আতঙ্কিত হবেন, উদ্বিগ্ন হবেন, যার মধ্যে মানসিক চাপ বেশি থাকবে, তিনি কিন্তু সহজে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের আরেক সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার বলেন, করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। যে জিনিসটা আমরা আসলে জানি না, সেই জিনিসটা আমাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। অনিশ্চয়তা থেকে আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় হয়। ভয়টা আতঙ্কে রূপ নিতে পারে। এই পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবে এড়িয়ে যেতে পারব না। আমরা যদি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হই, উদ্বিগ্ন হই, তাতে আমাদের কোনো লাভ নেই।

 

"