reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২২ এপ্রিল, ২০২৪

দেশের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ যত ঈদগাহ

মুঘল ঈদগাহ, ধানমন্ডি

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় সাতমসজিদ রোডে প্রাচীন এ ঈদগাহ মুঘলদের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি এখন ধানমন্ডি ঈদগাহ হিসেবেও পরিচিত। ধানমন্ডির পুরোনো ১৫ এবং নতুন ৮/এ সড়কে এটির অবস্থান। মুঘল ঈদগাহ প্রায় চার শ বছর আগে তৎকালীন বাংলার সুবাদার শাহ্ সুজার আমলে তার দেওয়ান মীর আবুল কাসিম কর্তৃক নির্মিত। তখন শুধু মুঘলরাই এই ঈদগাহে যেতেন। এই তথ্যটি ঈদগাহের কেন্দ্রীয় মেহরাবের শিলালিপিতে উল্লেখ করা আছে। ঐতিহাসিকদের মতে, উনিশ শতকের শেষের দিকে শহরের অন্য মুসলিমরা এখানে ঈদের নামাজে অংশ নিতে শুরু করেন, তখন সেখানে মেলাও হতো। সরকারি ওয়েবসাইটে বিখ্যাত স্থপতি আবু সৈয়দ এম আহমেদকে উদ্ধৃত করা লেখা হয়েছে যে ‘মুঘল আমলে নির্মিত এই ঈদগাহের মতো স্থাপত্যকলার নিদর্শন আর একটিও নেই। এই ঈদগাহটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান’।

১৯৮১ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করছে।

শোলাকিয়া ময়দান

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় প্রায় দুশো বছর ধরে ঈদের নামাজের বিরাট জমায়েত হয়ে আসছে। শুধু এর বিশাল মাঠই নয় বরং ঈদের নামাজের সময় জনসমাগম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিশাল এলাকায়ও। ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম ঈদের জামাতের তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হজরত খান বাহাদুর জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে এই ঈদগাহের সূচনা করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, শোলাকিয়ার সাহেববাড়ির সুফি সৈয়দ আহম্মদ ১৮২৮ সালে তার নিজ জমিতে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, কথিত আছে ১৮২৮ সালে প্রথম জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন বলেন এ মাঠের নামকরণ করা হয়েছিল ‘সোয়া লাখি মাঠ’। সেখান থেকেই কালক্রমে এটি পরিচিত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া মাঠ। ঈদগাহ কর্তৃপক্ষের হিসাবে শুধু মাঠের ভেতরেই প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজে অংশ নিতে পারে। আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে অসংখ্য মানুষ গিয়ে সেখানে ঈদের নামাজে অংশ নেন। এমনকি রাজধানী ঢাকা থেকে বিশেষ ট্রেনেও অনেকে সেখানে যান ঈদের নামাজে অংশ নিতে।

গোর-এ শহীদ বড় ময়দান

শোলাকিয়ার মতো প্রাচীন না হলেও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা দিনাজপুরের এ ঈদগাহ মাঠটি আলোচনায় আছে কয়েক বছর ধরে। কারণ এ ঈদগাহকে কেউ কেউ এখন এ উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ ময়দান বলে উল্লেখ করে থাকেন। প্রায় ২২ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ ঈদগাহের মিনার বেশ দৃষ্টিনন্দন। ৫৩ গম্বুজের এই মাঠে একসঙ্গে ১০ লাখ মুসল্লি নামাজে অংশ নিতে পারবে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে। মুঘল রীতি অনুসরণ করে তৈরি হলেও এটি খুব বেশি পুরোনো নয়। গোর-এ শহীদ ময়দানের পশ্চিম দিকের প্রায় অর্ধেক জায়গা জুড়ে এই ঈদগাহের মিনার। যদিও দেশবিভাগের পর থেকেই এ মাঠে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হতো। কিন্তু সেটিকে ঈদগাহ হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। পরে নতুন করে ২০১৫ সালে ঈদগাহ মিম্বার নির্মাণের মাধ্যমে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদগাহ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। তবে এ মাঠটির নামকরণ গোর-এ শহীদ বড় ময়দান হয়েছে মূলত ইসলাম প্রচারক শাহ আমির উদ্দিন ঘুরী (রহ.)-এর নামে। তিনি দিনাজপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন এবং এখানেই তার মাজার আছে।

শাহ মখদুম ঈদগাহ ময়দান

হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিক বলেছেন, শাহ মখদুম ঈদগাহ ময়দান গড়ে উঠেছে রাজশাহীতে শাহ মখদুমের দরগাহকে কেন্দ্র করেই। ইসলাম প্রচারে বাগদাদ থেকে আসা তুরকান শাহের মাজারকে কেন্দ্র করে দরগাহ এলাকা গড়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুর পর শাহ মখদুমসহ আরো কয়েকজন এ অঞ্চলে এসে ইসলাম প্রচার করেছেন। শাহ মখদুম এই দরগাহতেই মসজিদ তৈরি করেন ও পরে সেখানেই তার কবর হয়। মি. সিদ্দিক বলেন, ১৬৩৪ সালে এখান থেকেই দরগাহ ও ঈদগাহের ভিত্তি তৈরি হয়। পরে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজশাহী নগরীর কেন্দ্রস্থল পদ্মার তীর ঘেঁষে রাজশাহীর বর্তমান হজরত শাহ মখদুম (রহ.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে ঈদগাহের ভূমি উঁচু ও সমতল করা হয়। এরপর আধুনিক স্থাপত্যের পাঁচ ফুট উঁচু বেষ্টনী প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালে ঈদগাহ মাঠের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ করা হয় এবং মাঠে প্রবেশের জন্য আছে ছোট-বড় অন্তত ছয়টি প্রবেশপথ।

শাহি ঈদগাহ সিলেট

দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের সিলেটের মুঘল ফৌজদার ফরহাদ খাঁ এই ঈদগাহ নির্মাণে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মুঘল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এ ঈদগাহের অবস্থান সিলেট নগরের মধ্যবর্তী এলাকায়। ঐতিহাসিক এই ঈদগাহটি ১৭০০ সালের প্রথম দিকে নির্মিত হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে, গাছপালাঘেরা ঈদগাহটি সপ্তদশ শতাব্দীতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খাঁ নির্মাণ করেন। প্রাচীন এই নিদর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা। ১৭৭২ সালে ইংরেজবিরোধী ভারত-বাংলা জাতীয়তাবাদী প্রথম আন্দোলন এখান থেকেই শুরু হয়। একটি টিলার ওপর ঈদগাহটির মূল অংশ আর বিশাল মাঠের চারদিকে আছে সীমান্ত প্রাচীর। ঈদগাহ ময়দান থেকে মূল অংশে যেতে হলে অতিক্রম করতে হয় বাইশটি সিঁড়ির ধাপ। প্রতি বছর এই ঈদগাহে সেখানকার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদগাহে ঢোকার জন্য আছে তিনটি ফটক। পূর্বদিকে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পুকুরে মুসল্লিদের জন্য অজুর ব্যবস্থা। মুঘল স্থাপত্য রীতিতে হলেও পরে এর কিছুটা পরিবর্তনও হয়েছে। যোগ হয়েছে প্রায় দুশো ফুটের সুউচ্চ মিনার এবং তিন দিকে তিনটি বিশাল তোরণ।

জাতীয় ঈদগাহ

জাতীয় ঈদগাহ বিশেষ গুরুত্ব বহন করলেও এটিকে পুরোনো কোনো স্থাপনা বলা যাবে না। মূলত সচিবালয়ের কাছে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে প্রায় তিন যুগ আগে একটি ঝোপজঙ্গল ঘেরা পুকুরকে ভরাট করে যে ঈদগাহ মাঠের সূচনা হয়েছিল কালক্রমে সেটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় ঈদগাহ। তবে ঠিক এই ঈদগাহে না হলেও এর সঙ্গেই যে হাইকোর্ট মাজার তার পাশে সামিয়ানা টাঙিয়ে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হতো স্বাধীনতার পর থেকেই। পরে জনসমাগম বাড়তে থাকায় পাশের পুকুর ভরাট করে মাঠ তৈরি করে সেখানে ঈদগাহ কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকার এটিকে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা করে। সাধারণত রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকরা এই ঈদগাহ মাঠেই ঈদের নামাজে অংশ নিয়ে থাকে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close