reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৪ জুলাই, ২০২২

লাভবার্ড গুরু দেবাশীষ বড়ুয়া

পাখির প্রতি তার খুব মায়া। বনের পাখি, কোথাও অসুস্থ’ হয়ে পড়ে আছে। তিনি নিয়ে আসতেন। চিকিৎসা করে সুস্থ’ করে তুলতেন। তারপর আবার বনে ছেড়ে দিতেন। ছোটবেলা থেকেই পাখির প্রতি তার এমন প্রেম। ১৯৯৯ সাল। খাঁচার পোষাপাখি লাভবার্ডের সঙ্গে তার যাত্রা শুরু। প্রথমে শখ থাকলেও এখন তা আয়ের উৎস। লাভবার্ড গুরু নামে পরিচিত এই পাখিপ্রেমীর নাম দেবাশীষ বড়ুয়া জোসি। জোসির পাখি প্রেমের গল্প জানাচ্ছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

শুরুটা ভালো হয়নি

তখন জোসি ক্লাস ফাউভে পড়েন। তার বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ। এই এলাকায় কিছু লোক এয়ারগান, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করত। জোসি বলেন, ‘স্কুল থেকে ফিরে বনে ঘুরে বেড়াতাম। অসুস্থ’ পাখি খুঁজতাম। কারণগুলোর আঘাতে রক্তাক্ত পাখি পড়ে থাকত। নিজে কোলে তুলে খাওয়াতাম। সেবা-যতেœ সুস্থ হলে বনে ছেড়ে দিতাম। বেশির ভাগ থাকত বুলবুলি, শালিক।’ ঝড়, বৃষ্টি হলেও জোসি ঘরের বাইরে বের হতেন। খুঁজে বেড়াতেন। কোথাও পাখির বাচ্চা পড়ে আছে কি না। অসংখ্য অসুস্থ পাখি তার সেবায় সুস্থ হয়েছে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়েছে। কবুতর, ময়না, শালিক, ঘুঘু, টিয়া এমন অনেক পাখি পালন করেছেন। লাভবার্ড পালনে ধৈর্যটাই আসল। জোসির লাভবার্ড পালনেও তাই দেখা যায়। ছয় বছর শুধু ধৈর্যই ধরেছেন। ১৯৯৯ সালে তিনি লাভবার্ড পালা শুরু করেন। কাঁটাবন থেকে তিন তিনবার লাভবার্ড ক্রয় করেন। পাখি ৮-১০টা করে ডিম দেয়। কিন্তু বাচ্চা আর হয় না। হবেই বা কীভাবে। দুটি পাখিই তো ফিমেইল। ২০০৫ সালে তিনি প্রথম লাইম ফিচার লাভবার্ডের বাচ্চার মুখ দেখেন। জোসি বলছিলেন, শুধুমাত্র ধৈর্য থাকার কারণে আজকে লাভবার্ড সেক্টরে আমি অনেক সফল হয়েছি।

বার্ডস গার্ডেন এভেয়ারি

তার পাখির খামারের নাম বার্ড গার্ডেন এভেয়ারি। এই পক্ষীশালায় মোট ৫০ জোড়া লাভবার্ড আছে। এর মধ্যে ৩০ জোড়া ব্রিডিং পেয়ার (বাচ্চা করার উপযোগী) আছে। উল্লেখযোগ্য প্রজাতিগুলো হলো, ব্লু অপলাইন ফিশার, গ্রিন অপলাইন ফিশার, পেইড ক্লিয়ার হেডেড পার ব্লু, ইয়েলো ফিশার, ইয়েলো ফেস পার বুø, পেইড ব্লু সেবল, কোবাল্ট সেবল, লুটিনো পিচ ফেস, রোসি পিচ ফেস, ডি এফ ইয়েলো হেড পার ব্লু ইত্যাদি। প্রায় ১৬টি প্রজাতির লাভবার্ডের বাচ্চা করতে সফল হয়েছেন। যেগুলো হলো, পেইড ডিএফ ভায়োলেট স্যাবল, পেইড ক্লিয়ার হেডেড পার ব্লু, ডিএফ ভায়োলেট ক্লিয়ার হেডেড পার ব্লু, ডিএফ ইয়োলো ফেস পার ব্লু, ইয়োলো ফিশার, গ্রিন ফিশার, ডিএফ ভায়োলেট ফিশার, ডিএফ ভায়োলেট স্যাবল, পেইড ডিএফ ভায়োলেট পেইড স্যাবল, পেইড ব্লু স্যাবল, হোয়াইট ফিশার, ডিডি ব্লু ফিশার, ডিডি কোবাল্ট ফিশার, কোবাল্ট স্যাবল, লুটিনো পিস ফেস, রোজী পিচ ফেস, এলবিনো অপলাইন ফিশার। জোসি জানান, ২০২১ সালে অনুমানিক প্রায় ৩২০ থেকে ৩৮০ পিস বাচ্চা উৎপাদন করতে পেরেছেন। যদিও ব্রিডিং পেয়ার বেশি হলে এই সংখ্যাও বেশি হয়। প্রতি মাসে তার সব খরচ বাদে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো

মুনাফা থাকে।

সরেজমিন

উত্তরা ১৮ নাম্বার সেক্টরের ৯০১ নাম্বার বাসা। বাসার কাছে আসতেই পাখির কলরব শোনা গেল। ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল। সুন্দর পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো পাখির খাঁচা। নানা প্রজাতির অসংখ্য লাভবার্ড। কেউ উড়াউড়ি করছে। কেউবা বাসা বানাচ্ছে। একজন অপরজনের গা ঘুটে দিচ্ছে। গোসল করে পানি চিটাচ্ছে কেউ কেউ। মনোরম সব দৃশ্য। চোখ ফেরানো মুশকিল। জোসি বলেন, লাভবার্ডের অনেক প্রজাতি। এত বাহারি রং। এমন পোষা পাখি কমই আছে। তবে নিম্নমানের আমদানি করা পাখি, পাখির ডিএনএ ল্যাব না থাকায় খুব সমস্যা হয়। জোসি এইচ আর এম এ এমবিএ, পিজিডি করেছেন। বেশ কিছুদিন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। এখন পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। যখন জোসি ব্যস্ত থাকেন। তখন তার স্ত্রী মৈত্রী বড়ুয়া সব দেখাশোনা করেন। এ জন্য স্ত্রীর প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

লাভবার্ড কেন?

জোসির কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির পোষা পাখি আছে। আপনি লাভবার্ড বেছে নিলেন কেন? লাভবার্ডের এত জনপ্রিয়তার কারণও বা কী? তিনি বলেন, লাভবার্ড দেখতে সুন্দর। পালন করা সহজ। অসুখণ্ডবিসুখ কম। অসুখ হলেও চিকিৎসা করার মতো সময় দেয়। শক্ত প্রজাতির পাখি। খাবার, ওষুধ সব সহজলভ্য। আয়ুকালও বেশি। খাঁচায় প্রায় ১০-১২ বছর বাঁচে। প্রজাতির সংখ্যা বেশি। আমাদের দেশের আবহাওয়া এদের জন্য খুব উপযোগী।

ব্রিডিং প্রক্রিয়া

ছয় থেকে সাত মাস বয়সে লাভবার্ড এডাল্ট হয়। দেড় বছর যখন বয়স হবে। তখন মেইল ফিমেইল পাখিকে এক সঙ্গে রাখতে। মেইল ফিমেইলকে খাইয়ে দিবে। গা খুটে দিবে। এতই বোঝা যাবে পেয়ারের বন্ডিং ঠিক আছে। খেজুর পাতা, খড় খাচায় রাখতে হয়। মেয়ে পাখি পানিতে চুবিয়ে নিয়ে খড় দিয়ে বাসা তৈরি করে। বক্স বা হাড়ি যেকোনো একটা দেওয়া যায় ডিম পারার জন্য। ছেলে মেয়ে পাখি মেটিং (মিলিত) হবে। মেটিংয়ের ১০ দিনের মধ্যে চার থেকে ছয়টি ডিম পেড়ে থাকে। হেলিকপ্টারের ডানার মতো ফিমেইল পাখা মেলে ডিমে তা দেয়। ডিম থেবে বাচ্চা হতে সময় লাগে ২২ থেকে ২৪ দিন। ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বাচ্চা নিজে নিজে খাওয়া শিখে। তখন আলাদা খাচায় রাখতে হয়। জোসি বলেন, শীতকাল পাখি ব্রিডিংয়ে দেওয়ার উত্তম সময়।

শখ থেকে আয় হলে মন্দ কী

শখের বসে স্টুডেন্ট, গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীরা লাভবার্ড অনায়াসে পালন করতে পারেন। লাভবার্ড পালন করে পকেট খরচের টাকা সংগ্রহ করেন। এমন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়। জোসির কাছে এ তথ্য জানা গেল। জোসির দেখাদেখি অসংখ্য মানুষ লাভবার্ড পুষতে। পোষা পাখি লাভবার্ড পালনে সামাজিক সুফলও অনেক। পাখি পালন নেশা থেকে বাঁচায়। গ্যাজেট আসক্তি কমায়। অবসরকে আনন্দময় করে তোলে। নতুনদের জন্য জোসির পরামর্শ হলো, বাচ্চা দিয়ে শুরু করতে হবে। প্রথমে ১০টি বাচ্চা নিলে দুই-তিন পেয়ার পাখি পাওয়া যেতে পারে। অবশ্যই দেশি ভালো ব্রিডার থেকে লাভবার্ড সংগ্রহ করতে হবে।

অন্যের প্রয়োজনে

জোসি যাদের কাছে পাখি বিক্রি করেন। তাদের সব রকম সহযোগিতা প্রদান করেন। আবার চেনা পরিচয় নেই। ফোন বা মোবাইলে ম্যাসেজ দিল। কেউবা পাখি নিয়ে বাসায় এলো। জোসি হাসিমুখে সবাইকে পরামর্শ দেন। হাতেনাতে দেখিয়ে দেন। মাসে গড়ে তার থেকে বিভিন্ন সাহায্য নেওয়া মানুষের সংখ্যা দেড় থেকে দুই শতের মতো হবে বলে জোসি জানান। ফেসবুকে তার পেজ বার্ড গার্ডেন এভিয়ারি পাখি বিক্রির মাধ্যম। এই গ্রপের মেম্বার প্রায় চার হাজার পাখিপ্রেমী। এ ছাড়া চিটাগাং লাভবার্ড রিসার্চ জোন, লাভবার্ড রিসার্র্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের অ্যাডমিন তিনি।

ট্রেনিং স্কুলের স্বপ্ন

বিদেশি পোষা পাখি বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে। একসময় ভাবাও যেত না। জোসির মতো উদ্যমী তরুণরা কেবল উৎপাদন নয়, এখন রপ্তানি করার কথা ভাবছেন। নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জোসি বললেন, ভবিষ্যতে আমি লাভবার্ডের বড় একটা খামার করব। পাশপাশি একটা ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করব। যেন লাভবার্ড বিষয়ে হাতে-কলমে মানুষ প্রাথমিক ধারণা, মিউটেশন, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে জানতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close