সম্মেলন চান নেতাকর্মীরা

জয়-লেখকেও গতি পাচ্ছে না ছাত্রলীগ

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৪২ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:১৪

জিয়াউদ্দিন রাজু

ছাত্রলীগের দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছর পার করেছে জয়-লেখক। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করা হয় আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে। এই এক বছরে তারা সংগঠকে কতটুকু দিতে পেরেছে, তা জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে সবার মনে। তবে শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য জয়-লেখককে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা দৃশ্যমান তেমন কিছু করতে পারেনি বলে দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় অন্য নেতারা।

তিন মাস পর ‘ভারমুক্ত’ হয়ে নতুন দায়িত্ব পেয়ে তাদের প্রধান টার্গেট সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর কমিটি গঠন, কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া, অপরাধীদের বহিষ্কার, ঢাবির হল কমিটিসহ সংগঠনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জয়-লেখক। কিন্তু এক বছর পরও কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। যদিও সভাপতি-সাধারণ সাম্পাদক বলছেন, তারা সংগঠনকে কতুটুকু দিতে পেরেছেন তা বোঝা যাবে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। যদিও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপশি মহামারি করোনা ও বন্যার মধ্যেও ছাত্রলীগ মাঠে থেকে কাজ করেছে।

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড

শোভন-রাব্বানীর কমিটিতে থাকাকালীন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অর্ধশতাধিক বিতর্কিত নেতা স্থান পান। যাদের মধ্যে গুরুতর অভিযোগে ১৯ জনকে পদচ্যুত করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন শোভন-রাব্বানী। জট না খুলতেই বিদায় নিতে হয় তাদের। তবে জয়-লেখক নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা জানিয়েছিলেন অতিদ্রুত বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের স্থান দেওয়া হবে। কিন্তু এক বছর অতিবাহিত হলেও তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। ফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন পদবঞ্চিতরা। তারা জানান, যোগ্যদের স্থান দিয়ে ছাত্রলীগকে কলঙ্কমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জয়-লেখক। বছর পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতির হদিস মিলেনি।

এ ছাড়া গত এক বছরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো সাধারণ সভা হয়নি। শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দায়সাড়া কার্যক্রম চলছিল। এ ছাড়াও জয়-লেখকের ১ বছর দায়িত্ব পালনকালেও বাকি কেন্দ্রীয় নেতারা সাংগঠনিক দায়িত্ব পাননি।

এ ব্যাপারে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছাত্রলীগের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা নিয়ে তারা কাজ শেষ করবেন।

ছাত্রলীগের ইউনিট

জানা গেছে, ছাত্রলীগের ১১১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১০৮টি কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। শোভন-রাব্বানী থাকাকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে। আর জয়-লেখক কোনো প্রকার সম্মেলন ছাড়াই প্রেস রিলিজের মাধ্যমে নড়াইল, চাঁদপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটি ঘোষণা করেন। আর শোভন-রাব্বনীর রেখে যাওয়া কিছু কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে দেন। এর মধ্যে শোভন-রাব্বানীর দেওয়া দুটি কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়, বিভিন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নানা কারণে বহিষ্কার হওয়ার পর সেখানে ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে সংগঠন।

অভিযোগের তালিকা

সংগঠনের দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার কারণে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে বহু নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযোগ আসার কারণে দুটি জেলা, দুটি উপজেলা, তিনটি থানা ও একটি পৌর কমিটির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নতুন কমিটি প্রদান না করে দুটি জেলা, চারটি উপজেলা, একটি কলেজ ও একটি পলিটেকনিক কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে এই কমিটি। প্রায় দৈনিক দেশের নানা প্রান্তে থেকে আসছে নানা অভিযোগ।

নতুন সম্মেলন চান কেন্দ্রীয় নেতারা

২০১৮ সালের ৩১ জুলাই কমিটি গঠিত হয় ছাত্রলীগের। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর অতিক্রম করেছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সম্মেলনের দাবি তুলেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বেশির ভাগ নেতারাই। তাদের দাবি, বর্তমান ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নেই। ভাগ্যগুণে নেতা হওয়ায় তারা কীভাবে কী করতে হয় জানেন না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আমরা নানান চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছাত্রলীগের দায়িত্ব পেয়েছি। শুরু থেকে আমরা সবকিছু গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। এ বছর বিভিন্ন কমিটি করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা প্রদানের পরিকল্পনা নিলেও করোনার কারণে করা সম্ভব হয়নি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেব।

১ বছরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সংগঠনকে কী দিতে পেরেছি, না পেরেছি, তা বলা যাবে আমরা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর। তবে আমরা চেষ্টা করেছি ছাত্রলীগের সোনালি গৌরব ফিরিয়ে আনতে। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য কাজও করে যাচ্ছে ছাত্রলীগ।

পরিকল্পনার বিষয়ে জয় বলেন, বছরের পর বছর ধরে যেসব কমিটি হয় না, সেগুলোকে সম্মেলনের মাধ্যমে আবার গতি ফিরিয়ে আনাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা এসব বিষয়ে কাজ শুরু করব।

এদিকে ছাত্রলীগের এসব বিষয়ে সংগঠনের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা তাদের অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ছাত্রলীগের অভিভাবক আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ পরিচালিত হয়। বর্তমান ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস যাবত মহামারি করোনা ছিল। এর ফলে তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে বর্তমান কমিটির শীর্ষ দুজনই ভালো করতেছে। উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মহামারি করোনার মধ্যে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার নেতৃত্বে ত্রাণ বিতরণ, করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন, কৃষকের ধান কাটাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা অগ্রাধিকার ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সেখানে নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকলে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। তবে জয়-লেখককে সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক এ নেতা।

পিডিএসও/হেলাল