বিশেষ প্রতিবেদক

  ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তরুণ প্রজন্মের ভোটে নির্ধারণ হবে ফল

দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন ভোটাররা। নানা বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ভোটের ফল নির্ধারণে এবার মূল ভূমিকায় থাকবেন দেশের প্রায় ৫ কোটি তরুণ ভোটার। ‘জেন-জি’খ্যাত এ প্রজন্ম ভোটের লড়াইয়ে থাকা প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

আজ ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারে ‘তরুণ শক্তি’। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যানুযায়ী, এবার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা এখন ৪ কোটি ৯০ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬১ জন। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি ভোটার সংখ্যা ২ কোটি ১২ লাখ ৪২ হাজার ৫৩১ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৯০২ জন, নারী ভোটার ৯৪ লাখ ৯০ হাজার ২২১ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪০৮ জন। অন্যদিকে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটার রয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ১ হাজার ৩০ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ৪১ লাখ ১ হাজার ৯০ জন, নারী ভোটার ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬২ জন এবং হিজড়া ভোটার ৫৬৭ জন।

তরুণদের পাশাপাশি মধ্যবয়সি ও জ্যেষ্ঠ ভোটারদের সংখ্যাও কম নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সি ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯৩ লাখের বেশি। বয়সভিত্তিক ভোটারের মধ্যে ৩৪-৩৭ বছর বয়সি ভোটার ১ কোটি ২৩ লাখ ৬ হাজার ৭৫৫ জন, ৩৮-৪১ বছর বয়সি ভোটার ১ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৪৫০ জন, ৪২-৪৫ বছর বয়সি ভোটার ১ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২ জন, ৪৬-৪৯ বছর বয়সি ভোটার ৯২ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৩ জন, ৫০-৫৩ বছর বয়সি ভোটার ৮০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০ জন, ৫৪-৫৭ বছর বয়সি ভোটার ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ২৮ জন, ৫৮-৬০ বছর বয়সি ভোটার ৫১ লাখ ৮১ হাজার ১০৩ জন, ৬০ বছরের বেশি ভোটার ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন।

নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার তরুণ ভোটাররা ‘বেশি সচেতন’, তাই নির্বাচনে ভোট পড়ার হার বেশি হতে পারে। নির্বাচন বিশ্লেষক আবদুল আলীম বলেন, জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভালো একটা প্রভাব পড়বে। এদের অনেকেই প্রথমবার ভোটার, জীবনে কখনো ভোট দিতে পারেনি। কাজেই তারা কিন্তু এই সব কিছু বিবেচনা করেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।

কাজেই তাদের এই ভোটটা এবার খুব গুরুত্বপূর্ণ, তারা যেদিকে ভোট দেবে সেই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যাবে।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়স গ্রুপের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ হিসাব করলে ৪ কোটির বেশি। তাদের ভালো একটা অংশ যদি ভোট দেয়, তাহলে তাদের ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকে একটা ভালো প্রভাব ফেলবে।’ তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্যের। আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় নির্বাচনে তার প্রভাব না পড়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এটা হলফ করে বা একদম নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, ডাকসু নির্বাচনে যারা জিতছে, তারাই জাতীয় নির্বাচনে জিতবে। এ ধরনের কথা কিন্তু বলার কোনো সুযোগ নেই। তবে তরুণদের ভোট যে জাতীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে নির্ধারক হয়ে উঠবে, এ ব্যাপারে তার কোনো ‘সন্দেহ নেই’।

এদিকে তরুণ ভোটারদের বাইরে আরো একটি বড় ফ্যাক্টর নারী ভোটাররা। নারী ভোটাররাই এবার ‘বড় জায়গায়’ রয়েছে, তবে প্রথমবার ভোটার হওয়া তরুণরাও এক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন। তিনি বলেন, নারী এবং বিভিন্ন বয়সি ভোটারদের মধ্যে একটা তো ‘বড় জায়গায়’ থাকবে নিঃসন্দেহে নারী ভোটাররা। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের মতো ভোটার- যারা নারী। এছাড়া তরুণরা প্রথমবার যারা ভোটার হয়েছেন তারাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা কোন কোন বিষয় ভাববেন, এমন প্রশ্নে এই নারী অধ্যাপক বলেন, নারীদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত, আমার মনে হয় যে, তাদের স্বাধীনতার জায়গাটুকু ও তাদের কর্মদক্ষতা এবং তাদের উপরে যে ধরনের নারীবিদ্বেষ নারীর বিপরীতে অবস্থানকারী দলগুলো করেছে, তাদের প্রত্যাখ্যান করা। তো সেগুলো যদি নারীরা করতে পারেন, তাদের (সেসব দল) ক্ষেত্রে তারা অবশ্যই একটা বড় ভূমিকা পালন করবেন এই ভোটে। তাদের ভোট একটা বড় ব্যবধান তৈরি করবে।

তরুণ ভোটারদের বিষয়ে তিনি বলেন, আর যারা নতুন ভোটার, তাদের ক্ষেত্রে আমি মনে করি যে, তারা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং সব কিছুকে গুরুত্ব দেয়, সেদিক থেকেও কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী যারা ছিল, সেই শক্তিকে তারা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনতে পারে। তবে নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে চব্বিশের আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে। কারণ যেহেতু এটা তাদের ইমিডিয়েট পাস্ট একটা আন্দোলন এবং যেটির সঙ্গে তারা হয়তো অনেকেই যুক্ত ছিলেন। সুতরাং তাদের একটা গৌরবের জায়গা হয়তো সেটি। তো সেটাকে হয়তো ওরা বিবেচনায় আনবেন।

জোবাইদা নাসরীন আরো বলেন, এখানে এটাও বলা প্রয়োজন, যারা ভোট দিতে যাবেন না আওয়ামী ভোটারের বাইরেও নানা চাপের কারণে কিংবা সংখ্যালঘুরা যারা, তারা তো অত্যন্ত চাপ ও অস্বস্তি, নিরাপত্তাহীনতায় আছেন, তারাও কিন্তু এই নির্বাচনে একটা বড় ভূমিকা রাখবেন।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়