নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৯ নভেম্বর, ২০২২

প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্রয়

ঘাটতি নেই তবুও বাড়তি চালের দাম

ছবি : সংগৃহীত

দেশের মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা বাজারসহ কোথাও চালের ঘাটতি নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, দুর্ভিক্ষ হওয়ারও কোনো আশঙ্কা নেই এরপরও বিভিন্ন অজুহাতে বাড়ছে চালের দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটের খবরে হঠাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল ক্রয়, করপোরেট কোম্পানিগুলোর বাজার থেকে চাল ক্রয় এবং উৎপাদন খরচ বেশি এই তিন অজুহাতে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

শনিবার (১৯ নভেম্বর) রাজধানীর কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৬ টাকা। নাজিরশাইল চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল ৬০ থেকে ৬৪ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকা ও হাইব্রিড মোটা ৫০ টাকা।

এক সপ্তাহ আগেও খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬৫ থেকে ৭২ টাকা, নাজিরশাইল চাল ৬৫ থেকে ৭৮ টাকা, মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল ৫২ থেকে ৫৬ টাকা, মোটা চাল স্বর্ণা ৪৬ টাকা এবং হাইব্রিড ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। পাইকারি বাজারে চিকন চাল প্রতি কেজি মিনিকেট মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। ৫০ কেজির বস্তা ৩৪০০ থেকে ৩৫৫০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে মানভেদে বিক্রি হয়েছিল ৬২ থেকে ৬৯ টাকা আর বস্তা ৩০০০ থেকে ৩৪০০ টাকা। নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৭৫ টাকা আর ৫০ কেজির বস্তা ৩২৫০ থেকে ৩৭৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছিল ৬০ থেকে ৭২ টাকা, বস্তা ৩০০০ থেকে ৩১০০ টাকা। মাঝারি মানের প্রতি কেজি বিআর ২৮ নম্বর প্রতি কেজি চাল ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা আর বস্তা ২৭৫০ থেকে ২৮৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫৫ থেকে ৫৫ টাকা, বস্তা ২৭০০ থেকে ২৭৫০ টাকা। মোটা চাল প্রতি কেজি স্বর্ণা মানভেদে ৫০ থেকে ৫২ টাকা আর বস্তা ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা, বস্তা ২৩৫০ থেকে ২৪০০ টাকা। হাইব্রিড ধানের চাল বা সবচেয়ে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪৬ টাকা আর বস্তা ২৩০০ টাকা, যা আগে ছিল ৪১ টাকা কেজি, বস্তা ২০৫০ টাকায় বিক্রি হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বাজারে বর্তমানে যেসব চাল সরবরাহ রয়েছে, তা বোরো মৌসুমের। বোরোর শেষ পর্যায় ও আমনও উঠতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে বাজারে নতুন চাল আসছে। তারপরও দাম বাড়ছে হুজুগে। আগামী বছর সংকট হতে পারে সেই খবরে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল কিনছে। আমনে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ধানের দাম বেশি। এছাড়া করপোরেট কোম্পানিগুলো বাজার থেকে চাল কিনে নিচ্ছে এবং সরকারও এ বছর ধান ও চালের দাম বেশি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা মানা হচ্ছে না কোথাও। কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুদ করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা পরে বেশি দামে মিলমালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। এজন্য মৌসুমি ব্যবসায়ী কমানো, করপোরেট কোম্পানিগুলোর সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা, সংকটের খবর নিয়ে সবাইকে আরো সচেতন করতে প্রচার বাড়ানো এবং সরকারের মনিটরিং বাড়ানোর পরামর্শ ব্যবসায়ীদের।

বাবুবাজার চালের আড়তে চাল কিনতে এসেছেন কামরুল হাসান। তিনি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষ ভাই, ৫ জনের সংসার। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে সংসার চালানো অনেক কষ্ট। সামনে সংকট হবে শোনা যাচ্ছে, তাই দাম আরো বাড়ার আগেই তিন বস্তা কিনেছি। এতে আমার চার-পাঁচ মাস চলে যাবে। কী করব, কোনো উপায় নেই! দাম বেড়ে গেলে তো সরকার আর ফ্রিতে চাল দেবে না বা বেতন বাড়াবে না।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন ইমন সারোয়ার। তিনি বলেন, চালের দাম দিন দিন বাড়ছে। দেখার কেউ নেই। আমরা যারা সীমিত আয়ের মানুষ তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সরকার শুধু বলে সংকট নেই। আবার চাল আমদানির অনুমোদনও দেয়। আসলে মূল বিষয়টি সবাইকে পরিষ্কার করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করলে চালের বাজারও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। একই সঙ্গে সরকারকে আরো নজরদারি বাড়াতে হবে।

পুরান ঢাকার বাবুবাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মেসার্স রশিদ রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদ জানান, বাজারে চালের কোনো সংকট নেই। বিক্রিও অনেক বেড়েছে। এরপরও সব ধরনের চালের দাম পাইকারিতে কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোকামে দাম বাড়ায় তারাও বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

সরকার এ বছর ধানের দাম বাড়িয়েছে ফলে সাধারণ কৃষক তো বেশি দামে ধান বিক্রি করছে। যদিও তাদেরও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এছাড়া বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো বেশি চাল কিনে নিচ্ছে। তারপর তারা আরো বেশি দামে প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়ে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বছর সংকট হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে মানুষ হুজুগে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। এজন্য করপোরেট কোম্পানিগুলোকে সরাসরি কৃষকদের থেকে ধান নিতে হবে, সরকারের মনিটরিং বাড়াতে হবে।

বাবুবাজারের হাজী রাইস এজেন্সির মালিক জিয়াউল হক বলেন, গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে আগামী বছর সংকট হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সবাইকে সতর্ক হতে বলেছেন। এরপর থেকেই হঠাৎ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাল কেনার প্রবণতা বেড়ে গেছে। হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় দাম একটু বেড়েছে। মোটা ও চিকন সব ধরনের চালের দাম ৫০ কেজির বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম একটু বেশি বেড়েছে। বর্তমানে চালের ব্যবসা করে কোনো লাভ নেই! এজন্য ৩০০ চালের ঘর থেকে এখন মাত্র ১১৫টা ঘর রয়েছে। কুষ্টিয়ার মিলগেট থেকে এক ট্রাকে ২৬০ বস্তা চাল আনতে খরচ পড়ে ১৭ হাজার টাকা। এর সঙ্গে লেবার খরচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বস্তায় খরচ হয় ৭৫ টাকা। এখন আমরা ৩৪০০ টাকায় চালের বস্তা কিনে এর সঙ্গে ৭৫ টাকা যোগ করে বিক্রি করছি ৩৫০০ টাকা। তাহলে বস্তায় লাভ হচ্ছে ২৫ টাকা। আর কেজিতে হচ্ছে ৫০ পয়সা। এত কম লাভে বিক্রি করার পরও শুনতে হয় পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।

বাদামতলী ঘাটের চাল বিক্রেতা ও শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক মো. কাউসার বলেন, আমদানির অনুমোদন দিলেও ডলার-সংকটে আমদানি হচ্ছে না। দেশের কিছু জেলায় আগাম জাতীয় আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। আমন ধানের দাম বেশি ফলে চালেরও দাম বেশি। আগামী বছর বিশ্বে এবং দেশে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা থেকে অনেকেই বেশি পরিমাণে চাল কিনে রাখছেন বলে জানা গেছে। মানুষের মধ্যে যে ভয় কাজ করছে, সেটা দূর করতে প্রচার বাড়াতে হবে, নতুন ধান যখন ওঠে তখন কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী বা অসাধু ব্যবসায়ী দেখা যায়, তাদের কমাতে হবে এবং সরকারের আরো নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারা বছরে মোট চালের চাহিদা ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে মোট চাল আমদানি হয় ১০ লাখ ৬৭ হাজার টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮৮ টন এবং ধান ১১ হাজার ৬৩২ টন।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, মাঝারি মানের ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং সরু চালে দশমিক ৬৯ শতাংশ।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্রয়,বাড়তি চালের দাম
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close