নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৩০ মে, ২০২২

সব জিনিসের চড়া দাম

কমেছে প্রকৃত আয়, মিলছে না চিকিৎসা

জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে

মাছে-ভাতে বাঙালি। তবে এই দুটি পণ্যের দাম এখন চড়া। এর সঙ্গে রান্নাবান্নার আনুষঙ্গিক নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি থামার লক্ষণ নেই। আবার ভোজ্য তেলও ভোগাচ্ছে ভোক্তাকে। ফলে বাড়ছে খরচের বাড়তি চাপ। এই চাপের মধ্যে পেছাচ্ছে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা। গবেষণা বলছে, চিকিৎসার ৬৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ব্যয় মেটাতে হয় বাংলাদেশিদের। কিন্তু মানুষ এই অর্থ ব্যয় করতে পারছে না।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান-২০২২ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২৪ শতাংশ মানুষের পারিবারিক আয়ের ১০ শতাংশ চলে যায় চিকিৎসা খরচ মেটাতে। আর ৮ শতাংশের বেশি মানুষ পারিবারিক আয়ের ২৫ শতাংশের বেশি খরচ করে চিকিৎসার পেছনে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মমতা বেগম ও কুতুব উদ্দিনের মতো অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসা না করিয়ে রোগ পুষে রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

এক সপ্তাহ ডায়ালাইসিস করতে না পারলে শরীরে পানি জমে যায় রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার বাসিন্দা মমতা বেগমের (৫৩)। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হলেও ছয় বছর ধরে সপ্তাহে দুদিন নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতেন তিনি। কিন্তু এখন দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ মিটিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন মমতা বেগমের স্কুলশিক্ষক স্বামী। তাই কখনো সপ্তাহে এক দিন ডায়ালাইসিস করছে আবার কখনো এক-দুই সপ্তাহ ডায়ালাইসিস বন্ধ রাখতে হচ্ছে। মমতা বেগম বলেন, টানা কয়েক সপ্তাহ ডায়ালাইসিস করাতে না পারলে চলাফেরা করতে পারি না। তখন ধারদেনা করে আবার ডায়ালাইসিস করাই। এভাবে আর কত দিন চলবে জানি না। শুধু মমতা বেগম নয়, অর্ধ লাখের বেশি বেতন পাওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী কুতুব উদ্দিন সংসার খরচ মিটিয়ে স্ত্রী ও মায়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এরই মধ্যে ঢাকায় ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে মেসে উঠেছেন।

কুতুব উদ্দিন বলেন, টাকা জোগাড় করতে পারিনি, তাই আমার মা ও স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারছি না। এভাবে রোগ পুষে রাখা বা দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যকর করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা বাড়ানো ও স্বাস্থ্য বিমা চালু করার ওপর জোর দেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের (আইএইচই) অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ জানান, সাধারণত দ্রব্যমূল্য বাড়লে মানুষ শুরুতে কম প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বাদ দিয়ে তারপর খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যয় কমায়। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিলে খাবারের ব্যয় কমাচ্ছে। এতে করে পুষ্টি ঘাটতি হচ্ছে। আবার খাবারের ব্যয় না কমালে রোগ পুষে রাখছে, দেরিতে চিকিৎসা নিচ্ছে। উপজেলা-জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে যে সেবা পাওয়া যায় তা কার্যকর করতে হবে, তাহলে মানুষের খরচ কম হবে। এ ছাড়া ক্যানসার, কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি যেসব রোগের চিকিৎসা খরচ বেশি সেসব রোগের জন্য স্বাস্থ্য বিমার ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির টাকার (বয়স্ক বা বিধবা ভাতা) পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে।

বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী বলেন, বাজেটে ওষুধে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাবদ ব্যয় বাড়ানো গেলে নাগরিকদের ওপর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য মো. আবদুল আজিজ বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসার জন্য কেউ আলাদা করে কোনো অর্থ রাখে না। তাই অসুস্থ হলে জমি, গরু বিক্রি করে দরিদ্র হয়ে যায়। এখন দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে ট্রায়াল বেসিসে কয়েকটি এলাকায় স্বাস্থ্য বিমা চালু আছে। এটি সারা দেশে শুরুর বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আয়,চিকিৎসা,দাম বৃদ্ধি
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close