নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৯ নভেম্বর, ২০২০

গ্রাম আদালতকে আরো বেশি কার্যকর করতে হবে : স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

গ্রাম আদালতকে আরো বেশি কার্যকর করতে সেই সংক্রান্ত আইনকে যুগোপযোগী করে প্রণয়ন করতে হবে। গ্রামীণ মানুষের ছোট-খাটো বিরোধের কারণে যাতে উচ্চ বিচারের দরজায় না যেতে হয় সেই দিকে মানুষকে সচেতন করতে হবে। তাছাড়া গ্রাম আদালত কার্যকর রাখতে পারলে আদালতের ওপর চাপ কমে যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, সে জন্যই সরকার গ্রাম আদালতকে যুগোপযোগী, জনবান্ধব ও অধিকতর কার্যকরী করার লক্ষ্যে ‘গ্রাম আদালত আইন-২০০৬’ সংশধোনের উদ্যোগ নিয়েছে। 

এ সম্পর্কিত আইনি কাঠামো সংস্কার এবং সংশোধনীর ক্ষেত্রসমূহ চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে রোববার ঢাকার একটি হোটেলে জাতীয় পর্যায়ের একটি পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএনডিপির সহায়তায় স্থানীয় সরকার বিভাগ এই পরামর্শ সভার আয়োজন করে।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। শহর ও গ্রাম উভয় স্থানের মানুষের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। গ্রামে অন্য অনেক সুবিধার সাথে অবশ্যই গ্রামীণ মানুষের বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। গ্রাম আদালত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি দারুণ বিষয়। কারণ অনেক মানুষ ভুল বোঝাবুঝির কারণে আদালতের দ্বারস্থ হন, ফলে সেখানেও চাপ বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত ৩৭ লাখ মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও মামলা হচ্ছে। আমি মনে করি আমরা গ্রাম আদালতকে কার্যকর করতে পারলে আদালতের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। এর ফলে মানুষই সুবিধা পাবে, তাদের সময়- অর্থ সবই বেঁচে যাবে।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত আইন জারির পর ২০১৩ সালে প্রথম সংশোধনী এবং ২০১৬ সালে বিধিমালা জারি করা হয়। কিন্তু নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে গ্রাম আদালত যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থায় মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় দোষীকে অপরাধী বলা হয়, কিন্তু গ্রাম আদালতে তাকে বলা হয় প্রতিবাদী। গ্রাম আদালতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- এমনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাতে বিবাদমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সহাবস্থান, সহমর্মিতা, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ও সমঝোতা সৃষ্টি হয়, যাতে ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে পুনরায় বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং পুনর্মিলন ঘটে।

সভায় শিখন, সুপারিশ, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রতিফলন এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা ইত্যাদির আলোকে গ্রাম আদালতের আইনি কাঠামো সংশোধনীর প্রস্তাবনা বিষয়ে বক্তাদের প্রদত্ত সুচিন্তিত অভিমত গ্রামপর্যায়ে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে। জেলা পর্যায়ের আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গ্রাম আদালত সক্রিয় করার কার্যক্রম পরিচালনায় একদশক জুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারের পাশে থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইউএনডিপি বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ জানান মন্ত্রী।

সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, গ্রাম আদালতের মতো ইমিউক্যাবল সলিউশনের দিকে যদি আমরা যেতে পারি তাহলে সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত এই মামলাগুলো সহজে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। পেনাল কোডের অনেক ধারা আপসযোগ্য কারণ, যিনি এই পেনাল কোড প্রচলন করেছেন তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর বাঙালিদের মনমানসিকতা, সামাজিক বৈশিষ্ট্য এবং অপরাধের ধরন দেখে পেনাল কোডটি চালু করেছেন। দেশের মানুষের বড় একটি ট্রেন্ড হচ্ছে মিথ্যা মামলা দিয়ে আরেকজনকে ফাঁসিয়ে দেয়া। সে জন্য পেনাল কোডে কিছু ধারা আপসযোগ্য করা হয়েছে, যাতে দুই পক্ষ যদি মিলে যায় বিচারক যেন সেটি আপস করে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে আমরা শহরের সুবিধা দিতে পারি এবং গ্রামের মধ্যে যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারি। আমরা যাতে পুলিশ-র‌্যাবের ওপর নির্ভরশীল না হই, আদালতের ওপর নির্ভরশীল না হই। নিজেদের সমস্যা যেন নিজেরা সমাধান করতে পারি। সেটা করতে পারলে গ্রামেগঞ্জে শান্তি বিরাজ করবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোাপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত রেনসে তিরিঙ্ক ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মরণ কুমার চক্রবর্তী, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী, প্রকল্প এলাকা থেকে আগত জেলা প্রশাসকবৃন্দ এবং বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের সিনিয়র প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরদার এম আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের আইন সংশােধন বিষয়ক পরামর্শক মো. তাজুল ইসলাম তার মূল নিবন্ধে বলেন, আইনটি সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রাম আদালতের আর্থিক এখতিয়ার বৃদ্ধি, অন্যান্য আইনের সাথে সামঞ্জস্য ও সুস্পষ্টতা আনয়ন, গ্রাম আদালত পরিচালন প্রক্রিয়া সহজতর করা, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রাম আদালতে নারীর অভিগম্যতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নতুন বিষয়বস্তুগত এখতিয়ার যুক্ত করে বিরোধের পরিসর বৃদ্ধি করা।

পিডিএসও/এসএম শামীম

গ্রাম আদালত,বেশি কার্যকর
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close