৬ লেন হবে সব মহাসড়ক

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৪৯ | আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:২৫

মিজান রহমান

উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব মহাসড়ক দুই ও চার লেন থেকে ছয় লেনে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সেসব মহাসড়ক আট লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মহাসড়কগুলো চার থেকে ছয় এমনকি আট লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। এসব নতুন মহাসড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনায় আছে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার বিশেষ ব্যবস্থা। ছোট যানবাহন চলাচলের জন্য নতুন মহাসড়কগুলোতে থাকবে আলাদা লেন। বিশ্বমানের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের এই উদ্যোগ।

দেশের সব মহাসড়কের উন্নয়ন করা হবে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পর্যায়ক্রমে এসব মহাসড়ক দুই থেকে আট লেন পর্যন্ত উন্নীত করা হবে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের মহাসড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নে বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক পরিকল্পনা নিয়েছে। তিনি বলেন, মহাসড়কের সঙ্কীর্ণ অংশগুলো সম্প্রসারিত করার পাশাপাশি সব মহাসড়ক দুই লেন থেকে চার লেন, চার লেন থেকে ছয় লেন এবং ছয় লেন থেকে আট লেনে উন্নীত করা হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে আগামী অর্থবছরে ১৯৮টি প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। এসবের মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের উন্নয়ন প্রকল্প আছে ১৮৯টি। বেশির ভাগ প্রকল্প নতুন সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের। এসবের মধ্যে বড় প্রকল্প আছে ১৭টি।

জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় ঢাকা-সিলেট ছয় লেন মহাসড়কের অবকাঠামো নির্মাণকাজে এখন আর কোনো বাধা নেই। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিছু প্রজেক্ট নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছিলেন। এর মধ্যে আমাদের সাসেক (সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন) প্রজেক্ট, ঢাকা-এলেঙ্গা প্রজেক্টটির (সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্পের আওতায়) ওপেনিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইম্পর্ট্যান্টলি যেটা আলাপ হয়েছে সেটা হলো ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নিয়ে। আসলে দুটি সার্ভিস লেনসহ এটা সিক্স লেন প্রজেক্ট হবে। সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট সিক্স লেন, এটা অলমোস্ট এক্সপ্রেসওয়ে। এটা হবে ২০৯ কিলোমিটার। এতে ফ্লাইওভার থাকবে আটটি, ওভারপাসেস থাকবে ২২টি। রেল ওভারপাস থাকবে পাঁচটি, ব্রিজ থাকবে ৬৯টি। আন্ডারপাস থাকবে ১০টি। ফুটওভার ব্রিজ থাকবে ২৯টি। এই হলো টোটাল প্রপোজড প্রজেক্ট।’ ঢাকা সিলেট ৬ লেন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে জানিয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘ফান্ডিংটা ম্যাক্সিমামই এডিবি করবে।’

সড়ক মহাসড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) জাকির হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সড়ক মহাসড়ক উন্নয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন ঢাকা-সিলেট মহসড়ক, ঢাকা-রংপুর, রংপুর-বাংলাবান্দা, মাওয়া-যশোর-বেনাপোলসহ বেশ কয়েকটি সড়ক মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলমান আছে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ছয় লেনে উন্নত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে খুলনা-বরিশাল আবার বরিশাল থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে ফেনী পর্যন্ত মহাসড়কের পরিকল্পনা আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। এতে আরো উন্নত হবে দেশের যোযোগব্যবস্থা জানা যায়, সরকারি বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে উভয় পাশে একস্তর নিচু দিয়ে আলাদা সার্ভিস লেনসহ জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য চুক্তি সই হয়েছে ২০১৮ সালে। হাতিরঝিল-রামপুরা-বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-শেখের জায়গা-আমুলিয়া-ডেমরা মহাসড়ক (চিটাগাং রোড মোড় এবং তারাব লিংক মহাসড়কসহ) পিপিপির আওতায় চার লেনে উন্নীত করতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গাবতলী-নবীনগর মহাসড়ক আট লেনে উন্নীত করার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার। পাঁচদোনা-ডাঙ্গা-ঘোড়াশাল মহাসড়ক উভয় পাশে একস্তর নিচু দিয়ে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান। জিঞ্জিরা-কেরানীগঞ্জ-নবাবগঞ্জ-দোহার-শ্রীনগর মহাসড়ক উন্নয়ন কাজ চলছে। যাত্রাবাড়ী-ডেমরা (সুলতানা কামাল সেতু) পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে।

তবে যোগাযোগ খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্প নিলেই হবে না। বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অর্থ সংস্থান নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখা জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২ : বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিম করিডোর দিয়ে যোগাযোগ আরো উন্নত করার লক্ষ্যে সরকার ও এডিবির অর্থায়নে ১১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯০ কিলোমিটারের বেশি মহাসড়ক চার লেন করা হচ্ছে। একস্তর নিচু দিয়ে উভয় পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে আলাদা সার্ভিস লেন। এই মহাসড়কটি পরবর্তী সময়ে ভারত ও নেপালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বাংলাবান্ধা সীমান্ত পর্যন্ত এবং ভুটানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বুড়িমারী সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ আছে। ঢাকা-বাংলাবান্ধা অংশ এশিয়ান হাইওয়ে দুই ও সাসেক করিডোর-৯ এবং ঢাকা-বুড়িমারী অংশ সাসেক করিডোর-৪ এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উপআঞ্চলিক যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২১টি সড়ক করিডোর উন্নয়নের উদ্যোগ : বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল নিয়ে সাসেক আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরামের আওতায় ২১টি সড়ক করিডোর উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ক উন্নয়নের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে ওই প্রকল্পের আওতায়। নিরাপদ সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে উভয় পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আশুগঞ্জ নদীবন্দর-সরাইল-ধরখার-আখাউড়া স্থলবন্দর মহাসড়কের উভয় পাশে এক স্তর নিচু দিয়ে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় ৩ হাজার ৫৬৭ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ৫৪ দশমিক ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাবাড়ী-মাওয়া (ইকুরিয়া-বাবুবাজার লিংক রোডসহ) এবং পাঁচ্চর-ভাঙ্গা জাতীয় মহাসড়ক-৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে চারটি মহাসড়কের সমন্বয়ে ৩১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প চলমান।

এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৬টি মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। একই অর্থবছরে সড়ক বিভাগের ১৭টি মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতায় ১৭টি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত প্রকল্প রয়েছে ৬০টি। এগুলোর মধ্যে ৪১টি বাস্তবায়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকটি রয়েছে বাস্তবায়নাধীন।

পিডিএসও/হেলাল