সিনহার সহকর্মী শিপ্রাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড়

প্রকাশ | ১৫ আগস্ট ২০২০, ১৭:১৫

অনলাইন ডেস্ক

কক্সবাজারের মেরিনড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহার সহযোগী স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিপ্রা দেবনাথের সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও ও ছবি নিয়ে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। শিপ্রার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে বিভাজিত হয়ে নানাবিধ মন্তব্য ভাসছে ইন্টারনেটে।

জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডিডব্লিউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিপ্রা দেবনাথ যেভাবে হত্যার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

শিপ্রা মেজর (অব) সিনহা হত্যার বিচার না চেয়ে ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার চাইলে- তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই। যদি এ বিষয়ে কোনো কিছু বলারই না থাকে তবে তিনি কেন লাইভে এই বিষয়ে কথা বলতে গেলেন, এমন প্রশ্নেরও অবতারণা ঘটেছে। এছাড়া 'মেজর (অব) সিনহা কীভাবে তার কাছ থেকে ক্যামেরা চালানো শিখেছেন' সেসবের বর্ণনাও এমন পরিস্থিতে সমীচীন হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল তার ফেসবুক পেইজে একটি স্ট্যাটাসে বলেন, 'মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডের পর শিপ্রা দেবনাথের একটি ভিডিও দেখে হতভম্ব হয়ে গেছি। মনে হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার হত্যার বিচার না, শিপ্রার আসল চিন্তা ইউটিউব চ্যানেলের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। মেয়েটি সেখানে যেভাবে বলল সিনহা ‘মারা গেছে’ মনে হলো যেন তাকে কেউ হত্যা করেনি, পাহাড়-টাহার থেকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে মৃত্যুটি ঘটেছে! 

তার সাথে সিনহার যতো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকুক না কেন, পাবলিকলি সে যেভাবে সিনহা, সিনহা বলে তাকে উল্লেখ করেছে তা অত্যন্ত অরুচিকর লেগেছে আমার কাছে। আর এত ঘনিষ্ঠ যদি হয় তাদের সম্পর্ক, তাহলে তার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর শিপ্রার আচার-আচরণ তো সন্দেহজনক বলতে হবে!  

পুরো ভিডিওটা দেখে আমি এমন বিরক্ত হয়েছি যে তা বলার মতো না। কি দুর্ভাগ্য, মেজর সিনহা এমন একটা আজব সহকর্মী রেখে গেছেন তার সম্পর্কে বলার জন্য।'

সাবেক সেনা কর্মকর্তা শহীদ খান ফেসবুকে লিখেন, ‘ঘটনার দিন তিনি কেন সিনহার সাথে যাননি? তাকে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল? কেন তিনি মিডিয়াতে সিনহা হত্যার বিচার চাইছেন না, বরং নিজেকে তারকা হতে প্রচার করছেন কেন? সিনহা ছাড়া শিপ্রা কী এবং সে আসলে কে?’

ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর লিখেন, ‘তোমাদেরকে সেলেব্রিটি বানানোর জন্য আমরা রাজপথে নামিনি, বরগুনায় আমার ভাই-বোনেরা প্রদীপ, লিয়াকতদের উত্তরসূরীদের লাঠিপেটা খায়নি, একজন এসআই চড় খায়নি। নেমেছিলাম সত্য উদঘাটনে। আমাদের মতো প্রতিবাদী মানুষগুলো রাজপথে না নামলে তোমাদেরকে মামলার আসামি হয়েই কারাগারে থাকা লাগতো মাস, বছর, অধিকন্তু হয়রানি।

ভেবেছিলাম তোমরা মুক্ত হলে আমরা সত্য উদঘাটনে যে সংগ্রামে নেমেছি সেটি সহজ হবে। কিন্তু তোমাদের ভূমিকা শুধু আমাকে, আমাদেরকে নয়, পুরো জাতিকেই হতাশ করছে।

তোমাদের পাশে পুরো জাতি ছিল, তোমরা বুঝলে না! তোমরা চাইলে জাতির কাছে সৎ-সাহসী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন বীর হিসেবে নিজেদেরকে তুলে ধরে সম্মানিত হতে পারতে। কিন্তু মনে হচ্ছে ওদের ভয়ে তোমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছো! যা আমাদেরকে সাময়িক পীড়া দিলেও পরবর্তীতে তোমাদের জন্যই বিপদের কারণ হবে।

কারণ ওরা হয়তো এখন ওদের প্রয়োজনে তোমাদেরকে সত্য না বলার জন্য চাপ দিচ্ছে, পাশে থাকবে বলছে, প্রলোভন দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজন শেষে ওরাই তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে। তাই সময় থাকতে তোমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। কারণ, পরবর্তীতে বিপদে পড়লে কাউকে পাশে নাও পেতে পারো।'

এদিকে শিপ্রার এমন বক্তব্য দেয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিপ্রার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি ফেসবুকে আপলোড করা হয়। এসব ছবির ক্যাপশন ও কমেন্ট সেকশনে তাকে প্রকাশের অযোগ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এসব পোস্টের কোন কোনটিতে শিপ্রার পোশাক নিয়ে ঋণাত্বক মন্তব্য করা হয়েছে, কোথাও বা তার ধূমপানের ছবি আপলোড করে চলেছে সমালোচনা।  

আহমেদ ইশতিয়াক নামের একজন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে  শিপ্রার প্রতি একটি জনগোষ্ঠীর এমন আচরণের প্রতিবাদ করে লিখেন, 

' শিপ্রাকে নিয়ে চরম নোংরামি চলছে।

কেন?
- সে সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে?
কেন?
- সে খোলামেলা কাপড় পড়েছে বলে?
কেন?
- সে মেজর সিনহাকে বন্ধু বলেছে বলে?
কেন
- সে মেজর সিনহার স্বপ্ন ও তার নিজের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেছে বলে?

দুদিন আগে এই শিপ্রার জন্য মানুষ পারলে জেলের তালা ভেঙে নিয়ে আসতো, পারলে এই শিপ্রাকে পুজো করতো আর তাসের ঘরের মতো এখন সব ভেঙে গেল? 

বাঙালির চরিত্র ও মন জীবনেও বোঝা সম্ভব না। আচ্ছা শিপ্রা সিগারেট খাচ্ছে? আপনার বাপের টাকায় খাচ্ছে? নাকি চুরির টাকায় খাচ্ছে? আপনার সমস্যা কিসের? ও সিগারেট খাবে না মদ খাবে আপনার সমস্যা কিসের?
শিপ্রা মদ খাবে কারন বাংলাদেশে মদ নিষিদ্ধ না। বার থেকে মদ কেনা যায়। ও সিগারেট খাবে না মদ খাবে সেটা  ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারন এদেশে স্বাধীন দেশ, কে কি করবে না করবে তা তার  ব্যক্তিগত বিষয়।

আচ্ছা আপনার বন্ধুকে আপনি কি নাম ধরে ডাকেন নাকি স্যার ডাকেন? শিপ্রা মেজর রাশেদ সিনহার নাম ধরে ডেকেছে এতে আপত্তির কি আছে? ভয়াবহ বিকারগ্রস্ত ও মানসিক সমস্যা ছাড়া তো এমনভাবে কালপ্রিট বানানো কারো পক্ষে সম্ভব না।

শিপ্রা কি বলেছে? আগে পুরোটা শুনুন তারপর মন্তব্য করুন। শিপ্রা তার স্বপ্নের কথা বলেছে। তাতে আপনার সমস্যা কি? আপনি হতাশ বলে ও হতাশায় ডুবে মরবে? ও কি একবারও বলেছে মেজর সিনহা হত্যার বিচার চায়না? তবে আপনি ওর ব্যক্তিগত জীবনাচার সামনে এনে, প্রকাশ্যে ওর স্বাধীনতায় উগ্রবাদ ছড়িয়ে কি ফায়দা লুটতে চান বলুন তো? এসব ছবি সামনে এনে কি বোঝাতে চাইছেন?

শিপ্রার ব্যক্তিগত বিষয় সামনে এসে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন কেন?  যেন শিপ্রা নিজেই মেজর সিনহার খুনী। আপনারা আসলে কি চান বলুন তো? আসলে দশ মিনিট ভেবে বলুন কি চান আপনারা? মেজর সিনহার বিচার সত্যিই চান তো নাকি মেজর সিনহার বিচারকে পুঁজি করে উগ্রবাদ ছড়ানো?

বাঙালির সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল ফোকাসে  না থেকে ব্যক্তিগত বিষয় কে সামনে এনে ইস্যু তৈরি করা। যদি মেজর সিনহার বিচার চান তবে খুনী, দুস্কৃতিকারীর বিরুদ্ধে, বন্ধুদের বিরুদ্ধে নয়।'

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ বাহারছড়া চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় হত্যা ও মাদক আইনে এবং রামু থানায় মাদক আইনে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় নিহত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের সঙ্গে থাকা শাহেদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা রানী দেব নাথকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ৬ আগস্ট বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ ৭ আসামি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।