২ আসনেই যাত্রী, তবু বাড়তি ভাড়া

*নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই *হেলপার-যাত্রীর বচসা *মালিকরাও প্রত্যাহার চান বর্ধিত ভাড়া

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ০৮:৪৩ | আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ১২:৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যে রাজধানীর অধিকাংশ গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই চলাচল করছে। পাশের সিট ফাঁকা রেখে যাত্রী বসানোর কথা থাকলেও সে নিয়ম মানছেন না চালক-হেলপার। পরিস্থিতি ঠিক আগের মতোই। অথচ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া ঠিকই আদায় করা হচ্ছে। করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকলেও সরকার অফিস-আদালত পুরো মাত্রায় খুলে দিয়েছে। বন্ধ থাকা দোকান-বিপণিবিতান, ব্যবসাবাণিজ্য চালু হয়েছে। ফলে মানুষকে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে। গণপরিবহনও ক্রমেই নৈরাজ্যকর সেই পুরোনো চেহারাই ফিরছে! এই অবস্থায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা অল্প আয়ের কর্মজীবী-শ্রমজীবী মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনতর পরিস্থিতিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা নিজ বিবেচনা থেকে বর্ধিত ভাড়া কমাবেন বলে প্রত্যাশা করছেন যাত্রীরা। এ নিয়ে হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি দেখা যাচ্ছে প্রায়ই। যাত্রী পাশের সিট ফাঁকা রাখার ব্যাপারে সচেতন হলেও উপায় নেই। এসবের তোয়াক্কাই করেন না হেলপাররা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন রুটের পরিবহনে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

সরেজমিন দেখা যায়, বিহঙ্গ পরিবহন, বাহন পরিবহন, সাভার পরিবহন, শিকড় পরিবহন, বিআরটিসি, ওয়েলকাম পরিবহন, নিউভিশন পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনে শারীরিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। পাশের সিট ফাঁকা রাখা হচ্ছে না। কোনো কোনো পরিবহনে এক সিট ফাঁকা রাখা হলেও আবার যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

এছাড়া যাত্রীদের একটা অংশকে মাস্ক ছাড়াই চলাচল করতে দেখা যায়। একইসঙ্গে কিছু বাসের ড্রাইভার এবং হেলপারদেরও মাস্ক ছাড়া দেখা যায়।

বিহঙ্গ পরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ায় যাত্রীদের সঙ্গে হেলপারের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতেও দেখা যায়। বিহঙ্গ পরিবহনের হেলপারের কাছে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা না বলেই চলে যান। নিউভিশন পরিবহনের হেলপারের মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে তিনি পকেটে মাস্ক রয়েছে বলে জানান।

ওয়েলকাম পরিবহনে মতিঝিলের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রী কামাল হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বাসের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় এবং স্বাস্থ্যবিধি যেন মেনে চলা হয়, সে কারণে সরকার অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছে। কিন্তু বাসের মধ্যে এগুলোর কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। এগুলো দেখার জন্য কোনো লোকও নেই। তাই পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করলেও আমাদের করার কিছু নেই।

বাসে চলাচলকারী অধিকাংশ যাত্রী বলছেন, অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ ভাড়া দিয়ে তাদের যাতায়াতে কষ্ট হলেও শারীরিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য এটা দিতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু যদি বাসের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখার হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা না হয়, বাসের মধ্যে নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে করা না হয়, তাহলে কেন শুধু শুধু অতিরিক্ত এ ভাড়া নেওয়া হবে।

বাসযাত্রীদের দাবি, বাসের মধ্যে সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি এবং নিয়মকানুন মেনে চলার ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় তদারকির ব্যবস্থা করা হোক। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করা হোক।

জনস্বার্থে গণপরিবহনের ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করে আগের ভাড়া বহালের দাবি জানিয়েছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ প্রচেষ্টার এক ভিন্নতর প্রেক্ষাপটে সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালানোর শর্তে ৬০ শতাংশ পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করেছিল। ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সাধারণ মানুষের অতীব প্রয়োজনীয় চলাচল ব্যবস্থা সচল রাখা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আর্থিক দূরবস্থা বিবেচনা করে এটি করা হচ্ছে। যদিও শুরু থেকেই অনেক গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধির নিয়মগুলো মানেনি। এরই ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি এখন দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। যেসব শর্ত অনুসরণ করে বর্ধিত ভাড়া আদায়ের কথা বলা হয়েছিল- তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। গাদাগাদি করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের বর্ধিত ৬০ শতাংশের বেশি ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে অনেক রুটে, বহু পরিবহনে। ফলে করোনা সংকটে কর্মহীন হয়ে পড়া ও আয়-রোজগার কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

এদিকে মালিকরাও বাসের বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার চান বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বর্ধিত ভাড়া অবশ্যই প্রত্যাহার করা হবে। এখনই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করে নেবো। যেহেতু সরকার ৫০ শতাংশ আসনে যাত্রী নেওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে, সরকার সেটা তুলে দিলেই আমরাও করোনাকালীন বাড়ানো বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করে নেবো।

খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, আসন পূর্ণ করে যাত্রী নিয়েও বর্ধিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এটা সত্য। অফিস টাইমে রাজধানীর কিছু গণপরিবহন ও আন্তঃজেলা বাস এ কাজ করছে। আমরা প্রশাসন ও বিআরটিএ-এর সঙ্গে আলাপ করেছি, এসব গণপরিবহন ও বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। আমরা মালিকদের সঙ্গেও সভা করেছি। তাদের সচেতন করছি। যাতে কেউ ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী না নেয়।

পিডিএসও/হেলাল