সম্পাদকীয়

  ১৫ আগস্ট, ২০২২

ইতিহাসের কলঙ্কিত এক হত্যাকাণ্ড

আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী একদল ঘাতকের হাতে জাতির জনকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল ইতিহাসের এক বড় কলঙ্ক। দেশের স্থপতি ও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে তার পরিবারের সদস্যসহ এমন ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এখানেই শেষ নয়, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশ ও জাতিকে বিপথগামী করার অপচেষ্টা চালানো হয় পরবর্তীকালে। হত্যাকারীদের বিচার থেকে রেহাই দিয়ে জারি করা হয় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। সেই অধ্যাদেশ বাতিলের পর দেরিতে হলেও বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে থাকা ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবদুল মাজেদকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করে তার দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অন্যরা এখনো পলাতক। এই পলাতক দেশে এনে তাদের শাস্তি কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব।

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে বছরের পর বছর এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ থাকা ছিল আইনের শাসনের পরিপন্থি, যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এর পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য হয়নি বঙ্গবন্ধুর অবদান মুছে ফেলার প্রক্রিয়াও। ইতিহাসে যার স্থান সুনির্দিষ্ট ও স্বীয় মহিমায় সমুজ্জ্বল, তাকে অস্বীকারের মূঢ়তা বিভিন্ন সরকারের আমলে কম দেখানো হয়নি। এতে করে স্বল্পকালীন সুবিধা হাসিল করা গেলেও চূড়ান্ত বিচারে তা সফল হয়নি। বরং মৃত বঙ্গবন্ধু দিনের পর দিন হয়ে উঠেছেন আরো শক্তিশালী। জাতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অবদানই তাকে অজেয় করেছে।

বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনে একটিই ব্রত ছিল- ‘বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা’। শুরু ১৯৪৮ সাল থেকে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে আমরা বাঙালিরা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হব। তাই এ থেকে জনগণের মুক্তির জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের পথ। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৬-এর শাসনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, ৬২-এর ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৩-এর রবীন্দ্রচর্চা আন্দোলন, ৬৪-এর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর ছিল বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। বাংলাদেশ ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন আর স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু ছিল বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার। একাধিকবার ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হয়েছিল তার জন্য। বাঙালির প্রতি তার বিশ্বাস ও আস্থা ছিল আকাশচুম্বী। সে জন্যই হাসিমুখে, নির্ভীকচিত্তে মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সব ধরনের জুলুমণ্ডনির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কাম্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশ ও জাতির সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে তার আপন মহিমায় প্রতিস্থাপন করা হলে জাতি হিসেবে সবাই গৌরবান্বিত হবে। আমৃত্যু একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তার সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের যথাযথ রূপায়ণই হবে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোত্তম উপায়। সেই লক্ষ্যে জাতীয় শোক দিবসের প্রতিজ্ঞা হোক ‘শোককে শক্তিতে পরিণত করে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়া’।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
সম্পাদকীয়,হত্যাকাণ্ড,বঙ্গবন্ধু
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close