এম মাসুদ

  ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

টেকসই উন্নয়নে চাই নিরাপদ খাদ্য

প্রাণ-উচ্ছ্বল, সুখি জীবন-যাপন ও কাজে শক্তি বা মনোনিবেশ করার জন্য চাই সুস্বাস্থ্য। । শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে আর মন ভালো থাকল সকল কাজে মনও বসে। চিন্তাশীলতা, বিচারবোধ, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদির সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন শারীরিক সামর্থ্য। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে চাই সুস্থ্য ও সবল জনগোষ্ঠী।

জীবনে শুধু কাজের আনন্দই নয়, সম্পদ ভোগের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ তৃপ্তি উপভোগ করেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারীরা। তাই ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবন ও জাতীয় জীবনে কল্যাণ আনয়নে সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য।

আর সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ খাদ্য জরুরি। নিরাপদ খাদ্য বলতে ওই খাদ্য বুঝায় যা উৎপাদন স্তর থেকে শুরু করে ভোক্তার নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত মান অটুট থাকে এবং যা মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না।  হযরত আলী(রাঃ) বলেছেন, 'স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় সম্পদ আর অল্পে তুষ্টির চেয়ে বড় সুখ নেই।'

কিন্তু জীবনে সুখের জন্য স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বিবিধ কারণে অনেকের স্বাস্থ্য ভালো থাকে না। দেখা দেয় বিভিন্ন রোগব্যাধি। জ্যেষ্ঠরা বলছেন দশক তিনেক আগেও মানুষের রোগব্যাধি তেমন একটা ছিল না।  থানা বা উপজেলা পর্যায়ে ছিল সীমিত সংখ্যক ওষুধের ফার্মেসি। ক্রেতাও ছিল খুব কম। বর্তমানে কয়েকগুণ বেড়েছে ফার্মেসির সংখ্যা। জেলা, উপজেলা তো বটেই প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট দোকানেও মিলছে ওষুধ। আগে যেখানে ওষুধের দোকান বা ফার্মেসিগুলো ক্রেতা শুন্যতায় ভুগতো এখন সেখানে লেগে আছে ভিড়। কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'খাদ্যে ভেজাল।' 

হলুদ ও মরিচের গুঁড়া, লবণ, সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, দুধ, ঘি, মধু, মিষ্টি, গুড় এমনকী চাল, ডালেও ভেজাল। ভেজাল শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ফলমুলেও। বাজার গেলে চিন্তায় পড়ছেন ভোক্তারা। চিন্তার কারণ হলো নিজের বাড়ির পাকা আম, জাম, কাঁঠাল, কলা যেখানে ২-৪ দিন পর পচে যায় সেখানে বাজার থেকে ওই একই ফলমুল কিনে রেখে দিলে তাতে ধরছে না পচন। কারণ বিষাক্ত রাসায়নিক কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে এসব ফল। দীর্ঘদিন তাজা আর পচন ঠেকিয়ে রাখতে ফরমালিন মেশানো হয় আঙুর, আপেল, নাশপাতি, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলে। বুন্দিয়া, মিষ্টি, জিলাপিতে মেশানো হয় বিষাক্ত রঙ। ভেজাল শিশুখাদ্য দুধে। ভেজাল গাভীর দুধ, সেখানেও মেশানো হয় পানি। ভেজালে পিছিয়ে নেই বেকারী খাদ্য। ভেজাল রয়েছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য বলছে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সারাদেশ থেকে শতাধিক প্রকার পণ্যের ১০৫৮টি নমুনা সংগ্রহ করে। এসব পণ্যের নমুনা পরীক্ষায় ঘিতে ভেজাল ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, গুড়ে ৪০ দশমিক ৭৫, মধুতে ৩৩ দশমিক ৩৩, মিষ্টিতে ২৮ দশমিক ৫৭, হলুদ গুড়ায় ২৭ দশমিক ৯৩, লবণে ১৭দশমিক ৩৩, শিশুখাদ্যে ১৬ দশমিক ৬৭, মরিচের গুড়ায় ১৪ দশমিক ৬৩, ধনিয়া গুড়ায় ৩ দশমিক ৪৫, সরিষার তেলে ১ দশমিক ০৩, চালে ৮ দশমিক ৩৩, ডালে ৫ শতাংশ এবং আটায় ভেজাল রয়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পরীক্ষায় মিলেছে টেক্সটাইল কেমিকেল, রঙ ও ইউরিয়ার অস্তিত্ব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য খেয়ে রক্তচাপ, লিভার, কিডনি, হৃদরোগ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে মানুষ, বাড়ছে অকাল মৃত্যুর হার। বিবেক থাকলেও মুনাফাখোর অসাধু ব্যবসায়ীরা নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে অজ্ঞানতা থেকে নয় বরং সচেতনভাবে খাদ্যদ্রব্যে মেশাচ্ছে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান। অর্থের নেশা বন্দি করেছে তাদের বিবেককে। অথচ রাষ্ট্রের মঙ্গল সাধনের জন্য নাগরিককে বিবেকবান হতে হয়। ন্যায়- অন্যায়, ভাল- মন্দ বিবেকের ওপর নির্ভরশীল।  দেশপ্রেমও জাগ্রত হয় সেই বিবেকবোধ থেকেই। যা খাদ্যে ভেজালকারীদের মধ্যে অনুপস্থিত ।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে মানুষের জীবন নয় বরং অর্থই যেন  মূখ্য।

আশার কথা হলো থেমে নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খাদ্যে ভেজাল রোধে চলছে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান হচ্ছে জেল, জরিমানা। কিন্তু তারপরও কমছে না ভেজাল। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

পরিত্রাণের উপায় হলো পরিবারে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, ভোক্তাদের সচেতন করতে টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় প্রচার চালাতে হবে কোন কোন পণ্যে ভেজাল, ভেজাল খাদ্যে সৃষ্ট ক্ষতির প্রভাব সম্পর্কে, খাদ্যে ভেজাল করলে তার শাস্তির ধরণ বা আইন। এ ছাড়া অপরাধের সঙে জড়িতদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা, ভেজাল বিরোধী অভিযান আরো জোরদার করা, প্রত্যেক উপজেলায় পরীক্ষাগার স্থাপন করা, পণ্যের মোড়কে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে কোম্পানির লাইসেন্স নম্বর, ট্রেডমার্ক, পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ। সর্বোপরি বিবেককে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীদের বন্ধ করতে হবে খাদ্যে ভেজাল দেয়া। আমাদের মনে রাখতে হবে নিজের ও নিজের স্ত্রী,সন্তানের জীবন যেমন আমাদের নিকট মূল্যবান, তেমনি অপরের জীবনও সমান মূল্যবান। 

যাই হোক, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন আমাদের প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্যের। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে গেলে জীবন ধ্বংসকারী খাদ্যে ভেজাল দেয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তবেই রোগমুক্ত থেকে কর্মক্ষম হয়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম। অর্জিত হবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট। সেটাই সবার প্রত্যাশা। 

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
টেকসই উন্নয়ন,নিরাপদ খাদ্য
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close