শাহরিয়ার হাসান রাকিব

  ০৭ মে, ২০২১

স্মার্টফোনের অপব্যবহার রুখতে হবে

আমাদের নিত্যব্যবহার্য পণ্য হিসেবে স্মার্টফোনের জুড়ি নেই। সকালে ঘুম হতে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করি। ১৯৯৪ সালে আইবিএম এবং মিৎসুবিশি ইলেকট্রিক করপোরেশন যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছিল বিশ্বের প্রথম স্মার্টফোন। তারা ফোনটির নাম দেয় সিমন। বর্তমানে পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার পরিমাণ হচ্ছে ৭৯০ কোটি, এরমধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৮০ কোটি। বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৮.৩৭ শতাংশ একটি স্মার্টফোনের মালিক। উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ ভাগ, বাংলাদেশের ব্যবহারকারী প্রায় ২৪ এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫। ক্রমশ স্মার্টফোনের গ্রাহক বাড়ছে।

স্মার্টফোন নিঃসন্দেহে অতিপ্রয়োজনীয় একটি বস্তু; কিন্তু এর ভুল ব্যবহার অথবা অতিরিক্ত ব্যবহার ডেকে আনতে পারে মানবজাতির জন্য বড় বিপদ। এই একবিংশ শতাব্দীতে কোলের শিশু বাচ্চাটি থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষটি পর্যন্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। স্মার্টফোনের সময় কাটানোর হার বাড়তে বাড়তে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। স্মার্টফোনে অত্যধিক নির্ভরশীলতা মানুষকে টেনে নিচ্ছে আসক্তির দিকে। খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে জরুরি কাজ শিকেয় তুলে স্মার্টফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকছেন। অনেকে গড়ে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোনে ব্যয় করেন এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবার হাতে মোবাইল ফোন ছড়িয়ে পড়ায় এখন কেউই কোথাও পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে না। নতুন ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে। ফোন আছে বলে আমরা সারাক্ষণ ফোন করছি। কিন্তু যখনই কাউকে ফোনে পাচ্ছি না, তখন নতুন করে দুশ্চিন্তা শুরু হচ্ছে।

যৌথ ফ্যামিলি ভেঙে ছোট ছোট ফ্যামিলি তৈরি হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পিতা-মাতাসহ সমগ্র পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন-চারজন। পরিবারের বাচ্চাকে মা-বাবা ভালোভাবে সময় দিতে পারছে না। হাতে স্মার্টফোন ধরিয়ে দিয়ে মা গৃহস্থালি কাজ করেন। এতে করে বাচ্চাটির স্মার্টফোন নির্ভরশীলতা ছোট থেকে গড়ে ওঠে।

কৈশোরে পদার্পণ করা ছেলেমেয়ে এবং যুবক-যুবতীরা ব্যস্ত হয়েছেন স্মার্টফোনের বিভিন্ন সাইটে যেমন ফেসবুকিং, গেমিং, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি। ইউটিউবে অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করা। পাবজি নামে অনলাইন গেমটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এ রকম অনেক গেমই হঠাৎ হঠাৎ জনপ্রিয়তা পেয়ে থাকে, কিন্তু এই গেমটি একটু ব্যতিক্রমী। ছোট থেকে বড় সবাইকেই দেখা যাচ্ছে এই গেমটি খেলতে। এই গেমটির ধারণা আসে কিমজি ফুকাসাকু পরিচালিত ব্যাটেল রয়্যাল নামক জাপানি একটি চলচ্চিত্র থেকে, যেটা প্রচারিত হয় ২০০০ সালে। এর কাহিনি বেশ আলাদা। এখানে নবম এবং ১০ম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের একটি অজানা দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয় কিছু খাবার, পানি এবং অস্ত্রসহ। আর তাদের গলায় একটি ব্যান্ড বেঁধে দেওয়া হয়, কেউ যদি পালানোর চেষ্টা করে, তাহলে সেই ব্যান্ড ফেটে সে মরে যাবে। আর দ্বীপটি থেকে সে-ই ফিরে যেতে পারবে, যে কি না সবাইকে হত্যা করে একা ওই দ্বীপে বেঁচে থাকতে পারবে। এই গেমটি পুরো বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা, এটা মানুষকে করে তুলছে আসক্ত, আর সবাইকে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করছে। কিন্তু অন্যদিকে পাবজিকেই নিজের লক্ষ্য করছে অনেকে, তারা হতে চায় প্রফেশনাল স্ট্রিমার এবং গেমার। সবকিছুর মতোই যদি ভিডিও গেমস সীমার মধ্যে থেকে খেলা যায়, তাহলে তার ফল ভালো আসবে কিন্তু সীমার বাইরে গেলেই বিপদ, অন্তত ছোট শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তো অবশ্যই।

স্মার্টফোনের ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে। এরমধ্যে কিছু গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হলো আমাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সব সময় ঠিক জায়গায় আছে কি না, তা নিয়ে মন সব সময় সতর্ক থাকে। স্মার্টফোন হারানোর ভয় থেকে মনের মধ্যে জন্ম নেয় এক সমস্যা। গবেষকরা মুঠোফোন ও সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর ভয় জাতি অসুখের নাম দিয়েছেন নেমোফোবিয়া। যার পুরো নাম নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণরা এ রোগের শিকার। স্মার্টফোন থেকে বের হয় ঈষৎ নীল রঙের আলোর বিকিরণ। আমেরিকান ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের নীল আলো রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরমাণু বিস্ফোরণ যেমন তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়, এক্স-রে কক্ষ যেমন তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়, সূর্যরশ্মি যেমন তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়, ঠিক অনুরূপ তেজস্ক্রিয়তা স্মার্টফোনেরও রয়েছে রঞ্জনরশ্মি এবং গামারশ্মি। রঞ্জনরশ্মি রক্তের অনুচক্রিকা ভেঙে দেয় আর গামারশ্মি সরাসরি আঘাত হানে শরীরের নানাবিধ নরম কোষকলায়। দীর্ঘমেয়াদি পরিণামে জ্বলুনি-পুড়নি তোলে। পরিণামে ক্যানসারসহ নানাবিধ বংশগত ত্রুটিবিচ্যুতি সৃষ্টি হয় এবং তা যুগের পর যুগ চলতে থাকে। স্মার্টফোনে সব সময় কিলবিল করছে ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া বিচরণ করছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন ও কভারের সদর-অন্দর সর্বত্র। টয়লেট সিট আর স্মার্টফোনের ওপর তুলনামূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে সম্প্রতি এক নতুন তথ্য জানিয়েছে অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। তারা পর্যবেক্ষণ করে জানান, জঘন্য টয়লেট সিটে ২২০ থেকে ২৫০টির মতো ব্যাকটেরিয়া থাকা। অথচ স্মার্টফোনে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাটা হয় ১৪৭৯ থেকে ১৫০০-এর মতো। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, একটা টয়লেট সিটের উপরিভাগে যে পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া থাকে, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে স্মার্টফোনে। অথচ টয়লেট নিয়মিত পরিষ্কার করলেও স্মার্টফোন পরিষ্কার করা হয় না। আর টয়লেট সিট যতই পরিষ্কার থাকুক নিশ্চয়ই সেখানে কেউ মুখ ঘষে না। কিন্তু স্মার্টফোন সঠিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার ছাড়াই সারা দিন কথা বলতে মুখ লাগাতে বাধ্য হয় মানুষ। গবেষকরা জানান, স্মার্টফোন থেকে হাইফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্ক ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। গবেষকদের দাবি, স্মার্টফোন থেকে নির্গত ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে স্মার্টফোন ছাড়া মোটেও চলা সম্ভব নয়। আমাদের উচিত স্মার্টফোনের ভালো দিকগুলোর সঙ্গে নিজেদের অভ্যস্ত করা। স্মার্টফোনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ওয়েব সার্চ, যেকোনো জিনিসের সম্পর্কে খুব সহজে জানতে পারি। স্মার্টফোনে ক্যামেরা থাকার কারণে আলাদা করে ক্যামেরা ক্লিনার প্রয়োজন পড়ে না। ছাত্রছাত্রীদের জন্য খুবই উপযোগী বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে বাড়িতে বসে পড়াশোনা করার সুযোগ থাকে। স্মার্টফোনে এখন বিভিন্ন উপযোগী অ্যাপ যেমন অনলাইন শপিং, টিকিট বুকিং, হোটেল বুকিং, ফটো এডিটর, ফটোশপ এ রকম হাজারো অ্যাপ আছে; যা ঘরে বসে সব রকম কাজ করতে সাহায্য করে। জিপিএসের মাধ্যমে যেকোনো অঞ্চল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, এই অ্যাপটি পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া স্মার্টফোনের সাহায্যে বিপদে সহজে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তারকে খবর দেওয়া যায়। স্মার্টফোন আসক্তি দূর করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এনভেলপ, অ্যাক্টিভিটি বাবল, স্ক্রিন স্টপওয়াচ।

করোনা মহামারিকালীন মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটাতে এবং বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে স্মার্টফোন যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। দেখা যাচ্ছে, মানবসভ্যতার বিকাশে স্মার্টফোনের উপকারের পাল্লা অপকারের পালা থেকে ভারী, তবে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
স্মার্টফোনের অপব্যবহার,মুক্তমত,গবেষণা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close