আবু সোহান

  ০৭ মে, ২০২১

আসন্ন চ্যালেঞ্জ ব্যবসা বনাম চাকরি

ব্যবসায় শব্দের উৎপত্তি ইংরেজি ‘Business’ শব্দ থেকে। ‘Business’ শব্দের পারিভাষিক প্রতিশব্দ হলো ব্যবসায়। আক্ষরিক অর্থে ‘Business’ শব্দের অর্থ হলো ‘ব্যস্ত থাকা’। Business শব্দের মূল শব্দ নরংরমহবং (business, Busyness) এরপর busines, bisyness এবং পরবর্তীতে Business বানানে রূপান্তরিত হয়। বৈধ উপায়ে মানুষের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করাকে ব্যবসায় বলে। ব্যবসায়ের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা অর্জন করা। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ বা মানুষের ক্ষতি করে এমন কাজের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করলে সেটা ব্যবসায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না । তদ্রুপ, মনের সুখে কারোর উপকার করলেও সেটা ব্যবসা নয়। কারণ এখানে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য মুখ্য না। ব্যবসায় হতে হলে কাজের বৈধতা এবং মুনাফা অর্জন এই দুটি বিষয় অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় ‘ব্যবসায় এক ধরনের সামাজিক কর্মকান্ড (বিজ্ঞান) যেখানে নির্দিষ্ট সৃষ্টিশীল ও উৎপাদনীয় লক্ষ্য সামনে রেখে বৈধভাবে সম্পদ উপার্জন বা লাভের উদ্দেশ্যে লোকজনকে সংগঠিত করা হয় এবং তাদের উৎপাদনীয় কর্মকান্ড রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।’

ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের ধারাকে ৩ ভাগে বিভক্ত করা হয় ১. প্রাচীন যুগ ২. মধ্যযুগ ৩. আধুনিক যুগ। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবসায়ের প্রাচীন যুগের সূচনা ঘটে। এ যুগের মানুষ বনের পশুপাখি শিকার, ফলমূল সংগ্রহ এবং মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। কৃষিকাজের সঙ্গে সঙ্গে বিনিময় প্রথারও প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে ব্যবসায়ের উৎপাদন এবং বিতরণ পদ্ধতির উন্নতি করা হয়। বার্টার সিস্টেম বা বিনিময় প্রথা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এ সময় কৃষক, জেলে এবং অন্যান্য পেশার লোক তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। ব্যবসায়ের আধুনিক যুগ শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু হয় এবং এখনো অব্যাহত। ব্যবসায়ের আধুনিক যুগে প্রচলন হয় বিভিন্ন ধরনের শিল্প সরঞ্জাম ও মেশিন। আধুনিক যুগে মানুষ অনুভব করে যে, তাদের জন্য বিনিময় প্রথার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ফলে অর্থ বিতরণ, অর্থ হস্তান্তর করার জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থ বাজারের প্রচলন করে। এরই ধারাবাহিকতায় অর্থ উপার্জনের সব থেকে উপযোগী ক্ষেত্র হিসেবে মানুষ ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বাছাই করে। যার ফলে পৃথিবীর সর্বত্র ব্যবসা শব্দটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতার স্বচ্ছ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যবসা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্যবসা করতে হলে মূলধন প্রয়োজন, কিন্তু তার থেকে বেশি প্রয়োজন প্রবল আত্মবিশ্বাস এবং ঝুঁকি নেওয়ার মনমানসিকতা। ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা যেকোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান। আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাকে ঝুঁকি বলে এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত সবকিছু না ঘটার সম্ভাবনাকে অনিশ্চিয়তা বলে। একজন সফল উদ্যোক্তা এসব প্রতিকূল পরিবেশকে পিছনে ফেলে জয় ছিনিয়ে আনেন। বিশ্বের নামিদামি যত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান তার অধিকাংশই আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি মাইক্রোসফট, আলিবাবা ডটকম, অ্যামাজন, অ্যাপেল ও ইউনিলিভার। এ রকম হাজারো প্রতিষ্ঠান আধুনিক যুগের ব্যবসাকে আরো আধুনিক করেছে। ম্যালকম গ্যাডওয়েলের ‘আউটলায়ার্স’ বইটা পড়লে বোঝা যায় যে, বিশ্ববিখ্যাত কোনো কিছুই এক দিনে গড়ে উঠেনি। একটি সফলতার পেছনে পাহাড় সমান ব্যর্থতা লুকিয়ে থাকে। দৃঢ়তা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই আত্মবিশ্বাস । যে যত আত্মবিশ্বাসী, সে ততই অগ্রসরমান।

আমাদের দেশীয় অসংখ্য ছোট-বড় মানসম্মত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে বৃহদায়তন কোম্পানি পর্যন্ত বিস্তৃত। যেমন মৃৎশিল্প, মৎস্যশিল্প, পাটশিল্প, রাসায়নিক শিশু, পোশাক ও বস্ত্রশিল্প ইত্যাদি। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পর বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরিকৃত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। ফলস্বরূপ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধশীল হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও অনেক বড় একটা ভূমিকা পালন করে। করোনার মহামারির কারণে অর্থনৈতিকভাবে অনেক দেশ বিপর্যস্ত। বাংলাদেশও এই তালিকা থেকে পিছিয়ে নেই। করোনার কঠিন পরিস্থিতিতে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। সদ্য পাসকৃত ডিগ্রিধারী যুবক-যুবতীরাও বেকারত্বের মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন। দিন দিন সরকারি এবং বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান সীমিত ও সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ। কাজের মধ্যে ছিল ৬ কোটি ৮ লাখ। করোনার আগে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ছিল। ২০২০ সালের এপ্রিল-জুলাই সময়ে বেকারত্ব আরো ১০ গুণ বেড়েছে। শতাংশের হিসাবে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

আইএলওর তথ্য মতে, তরুণদের মধ্যে ২৫ শতাংশ বেকার। চলমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায় তা হলো, কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমহ্রাসমান। ভবিষ্যতে তা আরো ক্রমবর্ধমান। কিন্তু নিজেই নিজের আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করে নেওয়ার সুযোগ অসীম। আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করার উপযুক্ত ক্ষেত্র হলো ব্যবসা। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে বেকার যুবক-যুবতীরাও জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেন। বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের তাগিদে মানুষ যা কিছু করে তার সবই কর্মসংস্থানের অন্তর্ভুক্ত। এই তালিকায় ব্যবসার থেকে চাকরি প্রথম সারির কর্মসংস্থান।

চাকরি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে চাকর থেকে। চাকর তুর্কি শব্দ, এর মানে হলো ‘দাসত্ব’। ইংরেজ শাসনামলে আক্ষরিক অর্থেই আমরা দাস ছিলাম। তখন তারা শাসনকার্যের সুবিধার্থে আমাদের দেশীয় লোক নিয়োগ দিত। আমরা নিম্ন শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেতাম। সেখান থেকেই চাকরি কথাটার উৎপত্তি। চাকরি কথাটার উৎপত্তি বিদঘুটে হলেও এটার বিশালতা অনেক। সিকিউরড জীবন অতিবাহিত করার জন্য চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা আমাদের কারোর অজানা না। আমাদের সমাজব্যবস্থাও ব্যবসায়ীদের থেকে চাকরিজীবী মানুষের বেশি কদর করে। আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদার ভয়ে একদল ব্যবসায়ী হওয়া থেকে বিরত থাকে। উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনুৎসাহ বোধ করে। এ কারণে প্রত্যেক শিক্ষিত বেকারের একমাত্র লক্ষ্য চাকরি। প্রতিনিয়ত চাকরির বাজার কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। পরিশ্রম, মেধা ও ভাগ্য একযোগে কাজ না করলে ভালো চাকরি সোনার হরিণের মতো মরীচিকা। এমতাবস্থায় আমাদের বিকল্প পথ অবলম্বন করতে হবে। কালো মেঘের ন্যায় জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার আগে সতর্ক হতে হবে। দেশের সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসায়ী হওয়ার তাগিদ দেন বারবার। তিনি ফ্রিল্যান্সিং করার কথাও বলেছেন। ফ্রিল্যান্সার হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। ফ্রিল্যান্সার হতে বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। শক্তিশালী ইন্টারনেট কানেকশন এবং একটি কম্পিউটারই যথেষ্ট। আউটসোর্সিং করে অনেকে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মেয়াদি গ্রাফিকস ডিজাইনের কোর্স শিক্ষা দিচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি প্ল্যাটফরম, যেখানে কাজ পেতে কোনো টাকা বা ঘুষ দিতে হয় না। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করার জন্য দেশে বিভিন্ন সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। অনেকে সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে বেকারত্ব থেকে মুক্ত হতে পারছেন। বর্তমানে আমাদের দেশে চাকরির জন্য নতুন কোনো খাত তৈরি হচ্ছে না, হলেও সেটা খুবই নগণ্য। ভবিষ্যতে এই ভয়াবহতা আরো বিশাল হতে চলেছে। আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিকল্প আর কিছু দেখছি না। এই পরিস্থিতিতে চীনা নাগরিক আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ‘জ্যাক মা’-এর একটি বিখ্যাত উক্তি না লিখে পারলাম না। জ্যাক মা বলেছেন, ‘আপনি যদি একটি বানরের সামনে একটি ১০০ ডলারের নোট এবং একটি কলা ফেলে দেন, তাহলে বানরটি কলাটিকেই বেছে নেবে, কারণ বানর জানে না যে, ডলার দিয়ে আরো অনেক বেশি কলা কেনা যায়। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের যুবসমাজের সামনে যদি চাকরি আর ব্যবসাকে বেছে নিতে বলা হয়, তারা চাকরিকে বেছে নেয়, কারণ তারা এটা বুঝতে পারে না যে, ব্যবসার মাধ্যমে আরো অনেক চাকরি দেওয়া যায়।’ এর পরও যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে, ব্যবসা নাকি চাকরি করব? তাদের উদ্দেশে বলব, আপনার যেটা ভালো মনে হয় আপনি সেটা করুন। ব্যবসা অথবা চাকরি দুটাই নির্ভর করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর। আপনার মন যেটা বলবে, আপনি সেটাই করবেন। বেকারত্বের অবসান ঘটাতে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বেকারত্বের প্রতিবন্ধকতা দূর করা অতীব জরুরি। আসন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমেও বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব। কারিগর শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনত্বের ছোঁয়ায় আধুনিক করতে হবে। ফলস্বরূপ প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী এক একটা বিষয়ে দক্ষ হতে পারবেন এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও উদ্যোগী হয়ে দেশ ও জাতির সম্মান বৃদ্ধি করতে পারবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
চাকরি,চ্যালেঞ্জ,ব্যবসা,মুক্তমত,আউটসোর্সিং
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close