রায়হান আহমেদ তপাদার

  ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আধিপত্য বিস্তারে অর্থনৈতিক ক্ষমতা

কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী শক্তিগুলোর পুনর্বিন্যাসের একটা অস্পষ্ট ছবি লক্ষ করা যাচ্ছিল। সেটা এখন আগের থেকে অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। আর এটা আমাদের পৃথিবীতে নতুন শক্তিকেন্দ্র তৈরির মেরূকরণের দিকে ইঙ্গিত করছে। সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে অনেক কিছু ঘটেছে, যা প্রাথমিকভাবে বহুমাত্রিক বিশ্বের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছিল। বিশ্ব প্রশাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংস্কারের মাধ্যমে যাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল চিন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার। আর উন্নয়নশীল দেশ এবং বৃদ্ধি হতে থাকা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করে দেওয়ার কথা ছিল। তবে বেশ কিছু কারণ সম্মিলিতভাবে বিশ্বকে অন্যদিকে পরিচালনা করতে শুরু করেছে। সেই-সংক্রান্ত এমন কিছু কারণের কয়েকটি নিয়ে নিচে আলোচনা করা হয়েছে। ২০২০ সালের পর চীন তার গুটিয়ে রাখা ডানা চার দিকে বিস্তার করতে শুরু করবে—এই বিশ্লেষণ মার্কিন চিন্তক প্রতিষ্ঠানগুলো দশককাল আগে থেকে করে আসছে। আগামী কয়েক বছর বিশ্ব অবয়ব কী রূপ নেবে, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল যে তিনটি বৃহদাকার গবেষণা প্রতিবেদনের সংকলন প্রকাশ করেছে, তাতে চীনের ওপর যত বিশ্লেষণ রয়েছে, ততটা অন্য কোনো দেশের ওপর ছিল না। আর এসব বিশ্লেষণের মূল মনোযোগ হলো, চীনের অর্থনীতি কীভাবে বিকশিত হচ্ছে, সে বিষয়ে। কোন সময় কীভাবে চীন আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে তার বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।

এদিকে আদর্শবাদিতার চেয়েও শক্তিমত্তা অর্জন মূল লক্ষ্য হয়ে উঠে চীনা অর্থনীতির। দেং-এর নেতৃত্ব চীনকে অর্থনৈতিকভাবে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। বিনিয়োগ আর বাণিজ্যের পথ ধরে পুঁজিতান্ত্রিক প্রথম বিশ্ব থেকে আফ্রো-এশিয়ার তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোয় পর্যন্ত চীনা অর্থনৈতিক প্রভাবের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং নেতৃত্বে আসার পর চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্যকে ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রমও শুরু করেন। আর এটিই হলো, নতুন স্নায়ুযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত তৈরির পটভূমি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করা। এই চ্যালেঞ্জটি করা হয়েছে একদিকে ব্রেটন উডব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব-অর্থনীতির অংশীদারত্ব অনুপাতে নীতিনির্ধারণে অংশ দাবির মাধ্যমে। একসময় এ অনুপাতেই সদস্য দেশগুলোর মালিকানা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ও পরিবর্তন এলেও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা বা মালিকানায় সেভাবে পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে বিশ্ব-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক এসব প্রতিষ্ঠানে পাশ্চাত্যের আধিপত্য থেকে যায়। চীন, রাশিয়া ও উদীয়মান অর্থনীতির আরো কিছু দেশ এ ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে চায়। একই সঙ্গে বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করার ভাবনাও তাদের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ আমেরিকান ডলার দিয়ে পরিচালিত হতো।

সোভিয়েত আমলে বার্টার বা পণ্য বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিকল্প বাণিজ্য চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি তখন সর্বজনীনতা পায়নি। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি অভিন্ন মুদ্রা ‘ইউরো’ চালু করার পর কিছুটা চাপে পড়ে মার্কিন ডলার। কিন্তু ব্রিটেন তার পাউন্ডকে ধরে রাখা এবং সবশেষ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার পর ইউরো আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে বেশ খানিকটা গুরুত্ব হারায়। এখন সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তৈরি করেছে চীন। বিকল্প বৈশ্বিক বাণিজ্য বিনিময় মুদ্রা তৈরির ব্যাপারে চীন আগে থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। পুতিনের হাতে রাশিয়ার নেতৃত্ব আসার পরে ইউক্রেনে আক্রমণাত্মক কৌশল নিলে তৎকালীন আমেরিকার ওবামা প্রশাসন রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এরপর বিকল্প মুদ্রা তৈরি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রচেষ্টায় চীন-রাশিয়া কৌশলগত সমঝোতা হয়, যার সঙ্গে যোগ দেয় অবরোধের শিকার হওয়া ইরানের মতো বেশ কটি দেশ। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নসম্মত হওয়ার কোনো সংকেত এখনো পর্যন্ত সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিকল্প প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ব্রিকস ব্যাংক (প্রতিষ্ঠাতা সদস্য : চীন রাশিয়া ভারত ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা) পরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ হিসেবে কাজ শুরু করে। আর সেই সঙ্গে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করার পর সত্যিকারের চ্যালেঞ্জে পড়ে যায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।

ইকুয়েডরের বিদ্যমান ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা সমর্থন করার জন্য এর ডিজাইন করার সময়, মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেম গ্রহণ না করে বৈদ্যুতিন অর্থের একটি নতুন রূপ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিছু বিশ্লেষক সন্দেহ করেন যে, এর আসল লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি। বাণিজ্যচুক্তি এবং করপোরেট ঋণে মার্কিন ডলারকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হলো ব্রাসেলসভিত্তিক সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (এসডব্লিউআইএফটি) সিস্টেমের একটি কার্যকর বিকল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। ২০১৫ সালের অক্টোবরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউয়ান মুদ্রার ক্লিয়ারিং লেনদেনের সুবিধার্থে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ‘চায়না ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)’ চালু করে। এর মাধ্যমে বেইজিং তার মুদ্রাকে আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য উৎসাহিত করে। একইভাবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভিসা এবং মাস্টারকার্ড লেনদেনের জন্য একটি ঘরোয়া ‘সুইট’-এর মতো পেমেন্ট সিস্টেম চালু করে যাতে পাশ্চাত্য আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কার্ডগুলো ব্লক করতে না পারে। ইরান যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার থেকে দূরে সরে গিয়েছিল তখন সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি ছিল। ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন ডলার এড়াতে বার্টার বা পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ প্রদান ইত্যাদি ‘টুলস’ ব্যবহার করে। এমনকি ইউরোপও আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ডলারের বিকল্প খুঁজতে সক্রিয় ছিল।

আর চীনকে প্রতিহত করার আমেরিকান গভীর দৃষ্টিভঙ্গি বা নীতির মূল কারণটি হলো যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের অর্থনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা। আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শক্তি রাষ্ট্রিক বৈশিষ্ট্যগত কারণেই ক্ষয়িষ্ণু। প্রযুক্তিতে একক আধিপত্য হারানোর কারণে আমেরিকার বাণিজ্য এখন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও আইটিনির্ভর হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা ও মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর ফলে নতুন পরিস্থিতিতে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারে মূল লক্ষ্য হবে অর্থনীতি ও মুদ্রার প্রভাব ধরে রাখা। যারাই এ ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো পথে যেতে চাইবে তারা এজন্য আমেরিকার নীতি ও পদক্ষেপের লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। চীন-রাশিয়া ছাড়া স্বাধীন নীতি তৈরিতে সক্রিয় অন্য দেশের সঙ্গেও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ২০২১ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর বলে মনে হয়। অতি সাম্প্রতিক একটি খবর হলো—চীন একটি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মুদ্রা তৈরির জন্য কাজ শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টায় সমর্থন রয়েছে রাশিয়ারও। ডিজিটাল মুদ্রা এবং ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণ রিজার্ভ কার্যকর হলে আমেরিকান ডলার আধিপত্য হারাতে পারে। ২০২১ সালকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের প্রারম্ভিক বছর হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক বিশ্লেষক। নতুন পরিস্থিতিতে এই স্নায়ুযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে প্রধান প্রতিপক্ষ এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকার দেশ রাশিয়া হচ্ছে না। এই ঠান্ডা লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে চীন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে গঠিত হতে যাচ্ছে কৌশলগত জোট।

করোনা-উত্তর এ ধরনের কোনো পুনর্গঠন পরিকল্পনা কোনো দেশ থেকে আসবে কি না আমরা জানি না। আমেরিকা নিজেই যেখানে বিধ্বস্ত, সেখানে এ সম্পর্কে মন্তব্য করা আরো কঠিন। তবে এরই মধ্যে তিনটি বিশ্ব সংস্থায় তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এগুলো হলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও জাতিসংঘ। আগামী দিনে আমেরিকা, চীন ও রাশিয়া নয়া বিশ্বশক্তি হওয়ার চেষ্টা করলেও রাশিয়া এই দৌড়ে পেছনে থাকবে। আমেরিকার প্রভাব ইতোমধ্যেই হ্রাস পেয়েছে। চীনকে সবাই গণনার মধ্যে আনছেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সমীক্ষক একটি তৃতীয় মেরুর উত্থানের জল্পনা-কল্পনা করছেন। এই মেরুতে থাকতে পারে জার্মানি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও কানাডা। সবকিছু পরিষ্কার হবে করোনা অবসানের পর। এই চলতে থাকা পুনর্বিন্যাসের ফলে আমরা খুব শিগগিরই দুটি গোষ্ঠীকে একে অন্যের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নেমে যেতে দেখব। আকর্ষণীয় হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহে যে গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, সেখানে যেসব দেশ রয়েছে, তারা সর্বজনীন নীতি মেনে চলে। যেমন : গণতন্ত্র, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সম্মান ইত্যাদি। কিন্তু চীনকে কেন্দ্র করে যে অন্য গোষ্ঠীটি তৈরি হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে এটা বলা যায় না। এই গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলো রাশিয়া, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইরান। সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য নীতিগুলোকে যারা খুব কমই সম্মান করে। আমরা কি তাহলে গণতন্ত্রের জোট বনাম স্বৈরতন্ত্রের অক্ষের দিকে এগিয়ে চলেছি!

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ক্ষমতা,আধিপত্য,মুক্তমত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close