অর্থ পাচার রোধে আরও কঠোরতা দরকার

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫১

সম্পাদকীয়

অর্থ পাচার একটি অপরাধ। তবে তা কোন পর্যায়ের অপরাধ, সম্ভবত আজও আমাদের চেতনাকে তা স্পর্শ করতে পারেনি। পারলে দেশের উন্নয়নচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন চোখে পড়ত। সেই পরিবর্তন আটকে দিয়েছে চলমান অর্থ পাচার। এ যাবৎ তেমন কোনো অর্থ পাচারকারীর শাস্তি হয়েছে, দৃষ্টান্ত নেই। পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট সবার চোখের সামনেই কর্মটি হচ্ছে। আলোচনায় এলে বলতে শোনা যায়, তাদের আড়ালে রেখেই পাচার সম্পন্ন হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চপর্য়ায়ের বিশ্বাস, কারো না কারো সহায়তা ছাড়া অর্থ পাচার সম্ভব নয়। কিন্তু এসব সহযোগীকে কখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। আমরা না পেরেছি অর্থ পাচারকারীকে শাস্তি দিতে, না পেরেছি সহযোগীদের শনাক্ত করতে। সম্ভবত সে কারণেই শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে হাইকোর্টকে বলতে হয়েছে, দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে, সমগ্র জাতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে, এটা হতে পারে না। অবশ্যই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

বিচারপতি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচারে জড়িত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে) বিদেশে পালিয়ে থাকা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছে আদালত। তিনি কোন দেশ আছেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুদক কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। স্বঃপ্রণোদিত হয়ে দেওয়া এই আদেশপ্রাপ্তির ১০ দিনের মধ্যে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতি মামলার তথ্যসহ এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে দুদক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এই মন্তব্য ও নির্দেশনাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কেননা, বিভিন্ন সরকারের আমলে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ পাচারে জড়িত অভিযোগে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কোনো সুরাহা হয়নি। তবে দেশের বাইরে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে প্রায় ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। ২০১৫ সালে পাচার হয়েছে আরো ৫৯০ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গত ১১ বছরে মোট পাচার হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি ডলার। বর্তমান বাজারদরে যার মূল্যমান ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

মাত্র ১১ বছরে যে অর্থ পাচার হয়েছে, তা দিয়ে বাংলাদেশের দুই দফা জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা সম্ভব। এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা মনে করি, সরকার এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাচার বন্ধের পথ খুঁজে বের করবে এবং পুরো বিষয়টিকে জিরো টলারেন্সের আওতায় আনবে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, পাচারকারীরা শুধু দেশ ও জাতির শত্রু নয়। এরা রাষ্ট্রবিরোধীর সমতুল্য। তাই পাচার দমনে চাই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা দেশবাসীর সম্মিলিত প্রত্যাশা।

পিডিএসও/হেলাল