আবু ইসহাকের জোঁক ও বর্তমান গ্রাম্য মহাজন

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৫০

এম এ মাসুদ

মহাজন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ থেকে। যার অর্থ মহৎ ব্যক্তি, বণিক, বড় ব্যাপারী। কিন্তু অর্থনীতিতে 'মহাজন' শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ ঋণদাতা। আর একজন মহাজন যখন কৃষককে সুদে ঋণ দেন, তখন তাকে বলা হয় 'গ্রাম্য মহাজন।' এই গ্রাম্য মহাজনরা কৃষি ঋণের অ-প্রাতিষ্ঠানিক উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি উৎস  হিসেবে বিবেচিত হয়। কম ঝুঁকি, স্বল্প মূলধন ও পরিশ্রমেই বেশি লাভ হওয়ায় স্বর্ণকার, সাহা, বণিকদের পাশাপাশি শিক্ষক, মৌলভী, এমনকি সাধারণ মানুুষের মাঝেও কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন গ্রাম্য মহাজনীকে আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে।  

শুধু কৃষকই নন, এখন গ্রাম্য মহাজনদের নিকট সুদে ঋণ নিচ্ছেন মুটে, মজুর, চাকুরীজীবীসহ অনেকেই। 

অতীতে মহাজনরা ঋণ দিতেন সুদের বিনিময়ে, আর ঋণের জামানত হিসেবে রেখে দিতেন স্বর্ণালংকার, পিতল বা কাঁসার বাসন। কিন্তু বর্তমানে গ্রাম্য মহাজনরা ঋণের জামানত হিসেবে রেখে দিচ্ছেন চাকুরীজীবীদের নিকট থেকে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক বই ও স্ট্যাম্প এবং সাধারণ কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাছ ব্যবসায়ী  বা শ্রমজীবিদের নিকট থেকে নিচ্ছেন যাদের ব্যাংক হিসেব আছে তাদের স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক বই ও ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর। আর যাদের চেক নেই তাদের নেয়া হয় ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর। এগুলো দিতে হয় যে কোন পরিমান টাকা নেয়ার ক্ষেত্রেই।

এসব গ্রাম্য মহাজন অভাবের মাত্রাভেদে নিয়ে থাকেন বিভিন্ন ধরণের সুদের হার। যদি তারা বুঝতে বা জানতে পারেন যে, অভাবের মাত্রা একটু বেশি তবে ওই ঋণ গ্রহণকারীর নিকট চাওয়া হয় সুদের হার বেশি। বাধ্য হয়ে অভাব মোচন করতে গিয়ে বাড়তি সুদেই নিতে হয় তাদেরকে ঋণ। এটি বিশেষত শ্রমজীবিদের বেলায় বেশী হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শ্রমজীবিদের সুদের হার দিতে হয় শতকরা ১০ - ১৫ টাকা। 

আবার, বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়মিত ব্যবসা করেন এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের (সবজি, মাছ) নিকট নেয়া হয় মাসিক হিসেবে শতকরা ১০-১৬ টাকা হারে।

এদিকে, চেক আছে এমন চাকুরীজীবীদের ক্ষেত্রে মাসিক সুদের হার শতকরা ৪-৬ টাকা। 
মাস শেষ হতে না হতেই গ্রাম্য মহাজনদেরকে দেখা যায় ক্ষুদে ব্যবসায়ী বা শ্রমজীবী বা কৃষকদেরকে সুদের জন্য সংকেত দিতে । 
চাকুরীজীবীদের মাসিক বেতন ব্যাংকে জমা হওয়া মাত্রই দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে দেখা মিলবে চেকের বান্ডিলসহ গ্রাম্য এসব মহাজনদেরকে। 

আমাদের দেশ কৃষি প্রধান হওয়ায় কৃষিতে রয়েছে মৌসুমি বেকারত্ব, ছদ্ম বেকারত্ব, প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব। কৃষিতে এধরনের বেকারত্ব থাকায় কৃষি শ্রমিকদের অধিকাংশ সময়ই অলস সময় কাটাতে হয় বলে আয়ও কমে যায়। ক্ষুদে ব্যবসায় অনেক সময় দেখা দেয় মন্দা ভাব। আবার, কৃষিতেও দেখা দেয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমনঃ বন্যা, খরা, শীলাবৃষ্টি বা জলোচ্ছ্বাস,  হয় ফসলহানি। তাছাড়া ফসলের ন্যায্য দাম না পেলেও তারা হন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। ফলে দেখা যায়-  কৃষক, শ্রমিক, জেলে, ক্ষুদে ব্যবসায়ী যারা একসময় নিয়মিতভাবে গ্রাম্য মহাজনদের  সুদের টাকা পরিশোধ করতেন, আয় কমে যাওয়ায় তারা তা পারছেন না। আবার ধরি, কেউ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন, তিনি যদি আসল ২০ বা ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে চান, তবে তা গ্রাম্য মহাজনরা নেন না। চান ঋণের পুরো টাকাই। 

এভাবে গ্রাম্য মহাজনদের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে তখন তারা নিচ্ছেন অন্য আরেক মহাজনের নিকট ঋণ। ওই ঋণ নিয়ে দিচ্ছেন আগের ঋণের সুদ। আগে পাওনাদার ছিল একজন এখন দাঁড়াল দু'জনে। এভাবে পাওনাদারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।  এক সময় তারা ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েন। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বৃদ্ধির ফলে  এক সময় খেটে খাওয়া এসব মানুষ লাখ থেকে কয়েক টাকার ঋণের জালে আটকা পড়েন। সুদসহ ঋণের টাকা দিতে বিলম্ব হলে গ্রাম্য মহাজনদের ভয়ে তারা হাট-বাজার পর্যন্ত যেতে পারেন না। যদিও যান তবে দেখা হলে হতে হয় তাদের অপমান আর অপদস্থ। গ্রাম্য মহাজনদের অনেকেই প্রভাবশালী হওয়ায় ঋণগ্রস্থ কৃষক অপমানিত হওয়ার ভয়ে যাদের জমিজমা আছে তারা জমি বিক্রি বা বন্ধক রেখে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। যাদের কোন উপায় নেই, তারা শেষ সম্বল বাসস্থানের জায়গা বিক্রির মাধ্যমে সুদ-আসল পরিশোধ করেন। থাকার জায়গাটুকু হারিয়ে অবশেষে স্ত্রী, সন্তানসহ চলে যান এলাকা ছেড়ে। যারা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন তাদেরকে পালিয়ে যেতে হয় রাতের আঁধারে। ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে আসার দুঃসাহসও তাদের হয়তোবা থাকেনা। এতেই গ্রাম্য মহাজনরা ক্ষান্ত থাকেন না। তারা তাদের পিতা-মাতাকে না জানিয়ে ঋণ দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের উপর ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করতেও দ্বিধা করেন না। 

শুধু তাই নয়, গ্রাম্য মহাজনরা তাদের কাছে রক্ষিত স্বাক্ষর করা ফাঁকা ব্যাংক চেকে নিজের ইচ্ছে মত টাকার অংক বসিয়ে আদালতে ঠুকে দেন চেক ডিজঅনার মামলাও যা আমরা কম-বেশি সকলেই জানি।  

ফলস্বরূপ, প্রান্তিক কৃষক হয়ে পড়েন ভূমিহীন, ভিটেমাটি ওয়ালা হন গৃহহীন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা হারিয়ে হন বেকার আর শ্রমজীবীরা হন এলাকা ছাড়া। হয়ে পড়ছেন তারা দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র। যারা একসময় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করতেন, তারাই এখন 'দারিদ্রের দুষ্ট চক্র' থেকে আর বেড়িয়ে আসতে পারছেন না। 

অথচ এসব প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সুফল ভোগ করছেন গ্রাম্য মহাজনরা। তারা হচ্ছেন পুঁজিপতি,  কিনছেন জমি, দামী গাড়ি, করছেন বাড়ি। 

এই গ্রাম্য মহাজনদের সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় 'সূর্য দীঘল বাড়ি' খ্যাত লেখক আবু ইসহাকের  'জোঁক' গল্পের সাথে। ওই গল্পের ওসমান হয়েছেন বর্তমান সময়ে মহাজনদের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণকারীরা আর ওয়াজেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ইউসুফের প্রতিনিধিত্ব করছেন যেন এই গ্রাম্য মহাজনরা।  

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দারিদ্র হার এক যুগের ব্যবধানে ১৮.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০০৫ সালে দারিদ্রতার হার ছিল ৪০ শতাংশ, ২০১৮ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১.৮ শতাংশে। দেশে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্রতার হার ৯.৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য সরকার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ  প্রদানসহ নানাবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। 

এ প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্রতার হার ৯.৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে চাইলে গ্রাম্য মহাজনদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তাহলেই ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত হবে দেশ, কমবে অর্থনৈতিক বৈষম্য।