উজ্জ্বল নাথ, হাটহাজারী(চট্টগ্রাম)

  ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৫:৩৭

মুক্তিযুদ্ধে লড়াকু যোদ্ধা নুরুল আলম

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ভাষণে দেশে শোষণ-বঞ্চনার কথা শুনে এ দেশের মুক্তিপাগল দামাল ছেলেরা দেশের স্বাধীনতার জন্য পাগল হয়ে উঠে। বিশেষ করে তার ভাষণের একপর্যায়ে ”এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। বঙ্গবন্ধুর এ আহবানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য সারাদেশের ছাত্র-যুবক উদগ্রীব হয়ে উঠে। এরমধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ কালোরাতে ঢাকায় নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যার কারণে দেশের মুক্তিপাগল জনগণ প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। 

ঐতিহাসিক ভাষণ ও ঢাকায় গণহত্যার পর সারাদেশের মত হাটহাজারীর মুক্তিপাগল ছাত্রযুব জনতা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ প্রস্তুতিতে তৎকালীণ ছাত্র বর্তমান বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হাটহাজারী কমান্ড এর কমান্ডার মোহাম্মদ নুরুল আলম (৭২) মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করেন। তিনি তখন রোসাংগিরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি হাটহাজারী উপজেলার ২নং ধলই ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের লাল মোহাম্মদ তালুকদার বাড়ির মরহুম আবদুল হাকিম এর পুত্র। সেসময় উত্তর হাটহাজারীর ১নং ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের বংশাল এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য ছাত্র-যুব দেশের আপামর মুক্তিকামী জনতা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠককেরা দল বেঁধে ফটিকছড়ি, কাজিরহাট, নারায়নহাট, দাতমারা ও রামগড় হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতের অংশে এদেশ থেকে গমণকারী বিশেষ করে সাহসী ছাত্র-যুবকদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হত। 

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ১৯৭১ সালের ১ মে ও রামগড় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গমণ করেন। সেখান থেকে বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এমপি তাদেরকে  আসাম রাজ্যের লাইলাপুর সহস্র গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এ ক্যাম্পে গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে পুণরায় ১৫ জনের একটি দলকে লিডারশিপ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এভাবে তাদের প্রশিক্ষণের সময় ১৫ জনের গ্রুপ  করে ৭৫টি গ্রুপকে লিডারশীপ ট্রেনিং দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের মে ও জুন প্রায় ২ মাস প্রশিক্ষণ শেষে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও তৎকালীণ সন্ধীপ থানার প্রায় ৩শ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জুলাই মাসে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ভারতে প্রশিক্ষণ চলাকালীণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর কে কোম্পানির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থান ছিল তার যুদ্ধ এলাকা।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হাটহাজারীর জনপদ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাটহাজারী থানার সাথে লাগোয়া চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৪ ঘণ্টা এ জনপদে চলাচল করতেন। কারণ হাটহাজারীর উপর দিয়ে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও সীতাকুণ্ড যোগাযোগ করার সুবিধাজনক সংযোগ স্থল ছিল। যার ফলে চট্টগ্রাম সেনা নিবাস থেকে নর ঘাতক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী উল্লেখিত স্থানে বিচরণের বিশেষ সুবিধা ছিল। এ সময় কাটিরহাটের পশ্চিম দিকে পাহাড়ী টিলা ভূমি সংলগ্ন উদালিয়া আবদুল হাদির খামার ছিল মুক্তিযুদ্ধাদের গোপন আস্তানা। কারণ বর্তমানের ধলই-বাড়বকুণ্ড সড়ক ছিল তৎ সময়ে দুর্গম ও চলাচল অযোগ্য। পায়ে হেঁটে যাতায়ত ছাড়া পাক বাহিনীর গাড়ি চলাচলের কোন অবস্থা এ রাস্তায় ছিল না। তাই নিরাপদ জায়গা হিসাবে মুক্তিযুদ্ধারা সেই খামারটা বেছে নিয়েছিল। 

হাটাহজারীতে যেহেতু সেনানিবাস অবস্থিত সেহেতু তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকারদের সমন্বয়ে ক্যাম্প স্থাপন করেন। বিশেষ করে হাটহাজারীতে উদালিয়া চা বাগান, নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ, কাটিরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও হাটহাজারী অদুদিয়া সুন্নিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, ভানজইন, মদুনাঘাট প্রভৃতি স্থানে তাদের ক্যাম্প ছিল। এসব ক্যাম্প থেকে তাদের দোসর শান্তি কমিটির নেতৃত্বে রাজাকার আলবদর বাহিনী গঠন পূর্বক পল্লী জনবসতী এলাকায় রাজাকারের সহযোগিতায় নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নিরহ স্বাধীনতাগামী অগনিত নারী ও যুবতীকে নির্যাতনের মাধ্যমে নির্ম ভাবে হত্যা করা হত।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে হাটহাজারী থানার অদুদিয়া মাদ্রাসা ছিল নরপিশাচ পাকিস্তার দখলদার বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত নির্যাতনের শক্তিশালি ঘাঁটি। তাদের দোসর শান্তি কমিটির সহযোগিতায় উত্তর চট্টলার থানা সমূহ বিশেষ করে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতো। এসব থানার কোনও কোনও এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের শেল্টার ছিল এবং শেল্টার মাস্টারদের তথ্য সংগ্রহ করার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর পদলেহি শান্তিকমিটির সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধাদের অবস্থান বা শেল্টার মাস্টারদের নাম ঠিকনা সংগ্রহ করে অদুদিয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত মূল ক্যাম্পে সরবরাহ করত। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানি বাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘৃণ্য রাজাকারদের প্রত্যেক সহযোগীতায় জনবসতীপূর্ণ পল্লী এলাকায় প্রবেশ করে অগ্নিসংযোগ নারী ধর্ষণ লুটপাটসহ স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালি নারী পুরুষদের হত্যা করত এবং অনেকেই ধরে এনে অদুদিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালত। এমনকি মাথা নেড়া করে দিয়ে নারী পুরুষ উভয়কে বিবস্ত্র করে এক সাথে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো হত। অনেকেই নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যু নিশ্চিত করে মাদ্রাসার দক্ষিণ পশ্চিম পাশে মাটি চাপা দেওয়া হত।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অদুদিয়া মাদ্রাসা হানাদার ক্যাম্পটি স্থানীয় জনগণের কাছে কসাই খানা নামে পরিচিত ছিল। ক্যাম্প থেকে প্রতিরাতে শোনা যেত বাঁচার আকুতি এবং নির্যাতিত মানুষের করুণ আর্তনাদের গগন বিদারি আওয়াজ। পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযুদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ফতেয়াবাদের পশ্চিম ছরারকুল। সম্ভবত জুলাই আগষ্ট মাসে ক্যাপ্টেন সুলতান মাহমুদ এর নেতৃত্বে মদুনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধারা হামলা করে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ করে দিয়ে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ৯ ডিসেম্বর নাজিরহাট পুরানো বাসস্টেশন ও  ১৩ ডিসেম্বর কাটিরহাটে মুুক্তিযুদ্ধাদের সাথে পাকবাহিনী গেরিলা যুদ্ধে টিকতে না পেরে পিছু হটে যায়।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিকামী জনতা নিধণের লক্ষ্যে সে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সংগঠিত ভিন্ন মানবতা বিরোধী অপরাধ সর্ম্পকে নতুন প্রজন্মেকে জানানোর লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত স্থান সমূহে স্মৃতিশৌধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণপূর্বক বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান সরকারের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি বিজরিত বদভূমি সমূহ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ ও স্মৃতিশৌধ করার কাজ করে যাচ্ছেন। তৎমধ্যে কাটিরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে স্মৃতি শৌধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ৩৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে। অদুদিয়া মাদ্রাসায় স্মৃতিশৌধ নির্মাণাধীন। তাছাড়া মদুনাঘাট এলাকায় ও স্মৃতি শৌধ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে হাটহাজারীতে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় চট্টগ্রামের সর্বপ্রথম ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। 

 

------
মুক্তিযুদ্ধ,লড়াকু যোদ্ধা,নুরুল আলম
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়