‘পাকিস্তানি মিলিটারিরা বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়’ (ভিডিও)

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২০, ১৬:০৯

মো. দুলাল মিয়া, নাঙ্গলকোট(কুমিল্লা)

১৯৫৫ সালের ৭ মার্চ আঠারো বছর বয়সে আর্মিতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করি। ১৯৭০ সালে পেনশনে আসি। পরে এলাকায় এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে কয়েক বার নির্বাচনীয় দায়িত্ব পালন করি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালো রাত। মনে পড়ে আজও সেই রাতের কথা। একটু থামেন তিনি। দম নেন। প্রতিদিনের সংবাদ এর কুমিল্লার নাঙ্গলকোট প্রতিনিধি মো. দুলাল মিয়ার কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন অকুতোভয় এই মুক্তিযোদ্ধা। 

উপজেলার রায়কোট উত্তর ইউপির পিপড্ডা গ্রামের মৃত. আলীম উদ্দিনের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্তু মিয়া। 

যুদ্ধ শুরু। বলতে থাকেন মন্তু মিয়া, ২৬ মার্চ সকাল বেলায় চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়ার বাজার গিয়ে ক্যাপ্টেন মাহাবুবের সাথে দেখা করি। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চৌদ্দগ্রাম ছাতিয়ানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে দু'দিন থাকার পর, শুক্রবার দিন চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত হয়ে ভারতের রাধানগর চলে যাই। পরের শুক্রবারে সেখান থেকে ভারতের কাঁঠালিয়া গিয়ে কর্ণেল আকবরের নেতৃত্বে ফোর বেঙ্গল রেজিমেন্টে ৭০ জনের একটি গ্রুপ মেলাঘর ক্যাম্পে যাই। মেলাঘর ক্যাম্পে কয়েক মাস থাকি। সেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিই। 

মন্তু মিয়া জানালেন, মেলাঘর ক্যাম্প থেকে উম্পিনগর ট্রেনিং সেন্টারে আলপা, বেবো, ডালডা ও ইকো এ চারটি কোম্পানির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের স্তরে স্তরে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ওখানে তিনি আলপা কোম্পানির দায়িত্ব পান। তিনি সহ ওই আলপা কোম্পানিতে ৬ জন ট্রেইনার ছিলেন। তাদের প্রশিক্ষণ কাজ ছিলো পোল কালবাট, ব্রিজ সহ বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত হামলা কীভাবে করতে হয়। এ চারটি কোম্পানিতে ৬ জন করে মোট ২৪ জন প্রশিক্ষক ছিলেন। ওখানে মুক্তিযোদ্ধাদের এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশ পাঠাতেন। সেখানে এক মাস থাকার পর চলে আসেন ভারতের আগরতলা মুক্তিযোদ্ধাদের হেড কোয়ার্টারে। ওখানে তিনি অস্ত্রাগারের দায়িত্ব পান। যা ভারত, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অস্ত্রগুলো তার দায়িত্বে ছিল এবং অস্ত্র বণ্টন করতেন তিনি। পরে ওই অস্ত্রগুলো বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চল ওয়ান সেক্টর চট্টগ্রাম মেজর জিয়া, টু সেক্টর কুমিল্লা সুবেদার মেজর ইদ্রিছ ও থ্রি সেক্টর সিলেট আব্দুল মতিনের কাছে পাঠাতেন। 

কান্না জড়িত কন্ঠে মন্তু মিয়া আরও বলেন, আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী আমার বাড়িতে আগুন দিয়ে ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। আমার পরিবারের লোকজন কোনওমতে পালিয়ে জীবন বাঁচায়। এদিকে আগুনের খবর পেয়ে আগরতলা থেকে মেলাঘর ক্যাম্পে চলে আসি। সেখানে কনের্ল শওকতের সাথে দেখা করে বাড়িতে আগুন দেয়ার বিষয়ে তাকে বলি। তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেন এবং দেশে না যাওয়ার জন্য বলেন।

পরে তিনি দেশের মানুষের কথা ভেবে আর বাড়িতে যাননি। আবার তিনি মেঘালয় ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেন। এর ফাঁকে মন্তু মিয়ার স্ত্রী ৪ ছেলে ২ মেয়েকে নিয়ে ভারতের উজিরপুর শরনার্থী মুক্তিযোদ্ধা ফ্যামিলি ক্যাম্পে চলে আসেন। 

তিনি আরও বলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেঘালয় ক্যাম্প থেকে সুবেদার রজ্জব আলী, কনের্ল হায়দার ও ভারতের কনের্ল বেগসহ ৩ শত ৩০ জনের নিয়ে ভারতের সীমান্ত মতিনগর হয়ে রাত ১টার সময় কুমিল্লার বুড়িচং যুদ্ধ করি। সকাল ৭টার দিকে আমরা বিজয় লাভ করে দাউদকান্দি যাই। আমরা আসার কথা শুনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা ওখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে নরসিংদী বাবুর হাটে যাই। রাতে দোকানদাররা রাতের খাবার দেয়। খাবার শেষ করলে খবর আসে নৌ ঘাট দিয়ে পাকিস্তানি নৌ বাহিনীর সদস্যরা জাহাজ নিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ওখানে গিয়ে তাদের আক্রমণ করি। ওপর থেকে যুদ্ধ বিমান দিয়ে আক্রমণ করি। এক পর্যায়ে তাো পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আমরা এখানে জয় লাভ করি। এ বাবুর হাটে এক রাত এক দিন থাকার পর নারায়ণগঞ্জ আড়াই হাজার যাই। সেখানে নেতৃত্ব দেন কনের্ল হায়দার। খবর পাই ওখান দিয়ে পাঞ্জাবিদের দুটি বাস যাচ্ছে। দ্রুত ওই দুটি বাসে হামলা চালালে পাক হানাদার বাহিনীরা পালিয়ে যায়। পরে ওখান থেকে আবার আড়াই হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাত্রি যাপন করে মনোহরদী যাই। ওখানে একদিন থাকার পর চলে আসি ঢাকার রমনা । পরে ৩ শত ৩০ জনের এ টিমকে আরও ১৪ টি গ্রুপে ২৩ জন করে ভাগ করা হয়। এই ১৪টি গ্রুপ ঢাকার ১৪টি থানা দখল করি।

তিনি সুত্রাপুর থানার দায়িত্ব পান। সেখানে ২৩ দিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে কর্ণেল হায়দারের ডাকে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে একত্রিত হই, আবারও দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়। আমি মীরপুর মাজার গেইটের দায়িত্ব পাই। ২ সপ্তাহ দায়িত্ব পালনকালে দেশ স্বাধীন হয়। পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু দেশে এসে ঘোষণা দেয়, যারা চাকরি করতে চান করতে পারবেন। তখন আমি ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসি, ভারতে গিয়ে পরিবারকে বাড়িতে নিয়ে আসি। 

বর্তমানে মন্তু মিয়ার বয়স ৮৪ বছর। চলাফেরা করতে পারেন না, কানে কম শুনেন। ৬ ছেলে ২ মেয়ে রয়েছে তার। বড় ছেলে জাফর আহাম্মদ সৌদি আরবে থাকেন, ইফতেখার আহাম্মদ এমএ পাশ করে বাড়িতে, তোফায়েল আহাম্মদ পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে চাকরি করেন। হায়াতুন নবী কুয়েত প্রবাসী, মহিন উদ্দিন ইটালী প্রবাসী, আলা উদ্দিন বাড়িতে, বড় মেয়ে নাছিমা বেগম ও ছোট মেয়ে হাছিনা আক্তার বিবাহিত। অনেক নাতী-নাতীন রয়েছে মন্তু মিয়ার।

ভিডিওতে দেখুন :