অনলাইন ডেস্ক

  ২৩ মে, ২০২২

পাম অয়েল কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি ডলার আয়ের পেছনের গল্প!

সুপারমার্কেট থেকে কিছু কিনেছেন? তাহলে এমন সম্ভাবনা খুবই বেশি যে তার মধ্যে কিছুটা পাম অয়েল আছে। কোথা থেকে এই পাম তেল এসেছে - খোঁজ নিয়ে দেখুন। দেখবেন এই তেল এসেছে হয়তো ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত থেকে। সেখানকারই কোনও একটি কোম্পানি হয়তো এই পাম তেল বিক্রি করেছে জনসন অ্যান্ড জনসন, কেলোগস বা মোন্ডেলেজের মতো বিশ্বের নামজাদা প্রতিষ্ঠানের কাছে।

বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কোম্পানিগুলো ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোকে কোটি কোটি ডলারের আয় থেকে বঞ্চিত করছে। তাদেরই একজন মাত ইয়াদি। শিকার করতে বেরিয়েছিলেন মাত। নদীর পার ধরে চলেছেন তিনি। হাতে বর্শা, আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এ দিন কিছুই পেলেন না তিনি। প্রায়ই এমন হয়।

মাতের কথায়, আগে এখানে প্রচুর শূকর, হরিণ আর সজারু পাওয়া যেতো। এখন এখানে কোনও জীবিত প্রাণীই দেখা যায় না।

তিনি হচ্ছেন ওরাং রিম্বা উপজাতির লোক। ইন্দোনেশিয়ায় যেসব যাযাবর জনগোষ্ঠীগুলো এখনও টিকে আছে, তাদের একটি ওরাং রিম্বা। তারা সুমাত্রা দ্বীপের এই জঙ্গলে বাস করছেন বহু প্রজন্ম ধরে। তাদের পেশা রাবার চাষ, ফল কুড়ানো এবং শিকার। তাদের বাড়ি যে প্রত্যন্ত এলাকায় তার নাম টোবিং টিঙ্গি । ১৯৯০-এর দশকে এখানে আসে একটি পাম অয়েল কোম্পানি। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখানে প্রাচুর্য আর উন্নয়ন নিয়ে আসবে। তারা এই জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের জমির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ওরাং রিম্বার লোকেরা বলছেন, কোম্পানি বলেছিল যে এখানে পাম তেলবীজের গাছ লাগানো হবে এবং এর বিনিময়ে তারা অর্ধেকের বেশি জমি ফেরত পাবে। বলা হয়, এই পাম তেলবীজ হচ্ছে এক বিস্ময়কর ফসল- বিশ্বজুড়ে যার চাহিদা বাড়ছে। এতে ওরাং রিম্বার লোকদের সব দিক থেকেই লাভ হবে। কারণ তারা পামগাছ থেকে যে তেলবীজ উৎপাদন করবে তা কোম্পানিই কিনে নেবে।

পরের ২৫ বছর ধরে এই পাম তেল গাছ তরতর করে বেড়েছে। তার উজ্জ্বল কমলা রঙের ফলে বিপুল সম্ভার গেছে কোম্পানির কারখানায়। তা থেকে উৎপাদিত হয়েছে কোটি কোটি ডলার দামের পাম অয়েল নামের খাবার তেল। এই তেলের মালিক সেলিম গ্রুপের কাছ থেকে তা কিনে নিয়েছে ক্যাডবেরি চকলেট, পপ টার্ট বা ক্রাঞ্চি নাট ক্লাস্টার্স প্রস্তুতকারক বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু মাত ইয়াদির উপজাতিকে যা দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার কিছুই তারা পাননি। তার পরিবার এখন একটি পাম ক্ষেতের ভেতরেই একটি কুঁড়েঘরে বাস করে। এমন ঘটনা সেখানে অসংখ্য।

ইন্দোনেশিয়ায় ২০০৭ সালে একটি আইন করা হয়, যার ফলে যেকোনও নতুন আবাদ তৈরি করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তার এক পঞ্চমাংশ দেয়া বাধ্যতামূলকতা রয়েছে। যেসব জায়গায় এই ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করেছে, সেখানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীগুলো দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ৫ হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা করে এমন এক শিল্পে অংশীদার হতে পেরেছে তারা। কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠতে থাকে যে, বেশিরভাগ কোম্পানিই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। অবশ্য এ সমস্যা ঠিক কতটা ব্যাপক, তা জানা যায় না। এ নিয়ে দু’বছর বিবিসি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠান দি গেকো প্রজেক্ট এবং পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবসাইট মোঙ্গাবে মিলে ঠিক কী হচ্ছে- তা বের করার উদ্যোগ নেয়।

সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই তদন্তে জানা যায় যে শুধুমাত্র বোর্নিওর মধ্য কালিমান্টান প্রদেশেই কোম্পানিগুলো ১ লাখ হেক্টরেরও বেশি প্লাজমা (স্থানীয়দের ক্ষেতের এক পঞ্চমাংশ) দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।

বিবিসি বলছে, আমরা মুনাফার আনুমানিক হিসেবগুলো পরীক্ষা করে অনুমান করি যে, এর ফলে জনগোষ্ঠীগুলো প্রতিবছর কম করে হলেও ৯ কোটি ডলার থেকে বঞ্চিত হয়েছে ।

সরকারি আইন কার্যকর না হওয়া এবং অধিকার বঞ্চিত ইন্দোনেশিয়ার এসব জনগোষ্ঠী এখন প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু ফল হচ্ছে উল্টো। এমন ঘটনায় সাতজনকে ভাঙচুরের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয় হয়। ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ এ ব্যাপারে আমাদের সাথে কথা বলতে অস্বীকার করে।

বিক্ষোভের পর পার্লামেন্টের একটি কমিশন সেলিম গ্রুপকে ওরাং রিম্বার পূর্বপুরুষের ভুমি ফিরিয়ে দেবার আহ্বান জানায়। কিন্তু পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও তাদের অপেক্ষার পালা শেষ হয়নি। সেলিম গ্রুপ এবং তাদের যে সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি এই আবাদক্ষেত্রটি নিয়ন্ত্রণ করে, তারা বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিতেও রাজি হয়নি।

সরকার এ ক্ষেত্রে মূলত মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৪ শতাংশ ক্ষেত্রে এই মধ্যস্থতার ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে।

বড় কোম্পানিগুলো কী বলছে বেশিরভাগ বড় ভোগ্যপণ্য উৎপাদক কোম্পানিই তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে ‘শোষণ’ উচ্ছেদ করার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বিবিসি বলছে, আমরা কোলগেট-পামঅলিভ এবং রেকিটসহ ১৩টি বড় ফার্মকে চিহ্নিত করেছি, যারা এমন সব উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পামঅয়েল কিনেছে, যারা গত ৬ বছর ধরে প্লাজমা নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে বঞ্চনা করে আসছে। আমাদের তদন্তের জবাবে ফার্ম দুটি জানিয়েছে - তাদের সরবরাহকারীদের আইন মেনে চলতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি যে অনেকের সাথেই এমন কোম্পানির সরবরাহ ব্যবস্থার যোগাযোগ আছে, যাদেরকে এমনকি ইন্দোনেশিয়ার সরকারী কর্মকর্তারাও প্লাজমা সংক্রান্ত আইনকানুন মেনে চলতে ব্যর্থতার জন্য চিহ্নিত করেছেন।

জনসন অ্যান্ড জনসন বলেছে যে, তারা এসব অভিযোগ খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়ে থাকে এবং তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কেলোগ'স বলছে, তারা এসব অভিযোগ তদন্ত করবে এবং তাদের সরবরাহকারীদের সাথে সমন্বয় করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে।

ক্যাডবেরির মালিক মোন্ডেলেজ বলেছে, তারা এ ব্যাপারে ভবিষ্যতে কী করা যায় তা ঠিক করতে বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করেছে । রেকিট বলেছে, এই তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলোর ব্যাপারে আরো তদন্ত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।

কোলগেট-পামঅলিভ বলেছে, তাদের সরবরাহকারীরা যথেষ্ট প্লাজমা দিচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য তারা একটি প্রক্রিয়া বের করবে।

সোমবার (২৩ মে) থেকে ইন্দোনেশিয়ার ভোজ্য তেল রপ্তানির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। দেশটি থেকে সারা বিশ্বে পাম অয়েলের চালান নিয়ে জাহাজগুলোর যাত্রা আবার শুরু হবে। ইন্দোনেশিয়ায় ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত মাসে এর রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ ধনীরা সারা পৃথিবীতে পাম অয়েলের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো ব্যাপক মুনাফা করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় শীর্ষ ধনীদের তালিকার অনেকেই পাম অয়েলের ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন। গোল্ডেন এ্যাগ্রি-রিসোর্সেসের কর্ণধার উইডজাজা পরিবার ফর্বস-কৃত ইন্দোনেশিয়ার ধনীদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে। সেলিম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এ্যান্থনি সেলিম আছেন তৃতীয় স্থানে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close