এম এ মাসুদ, সংবাদকর্মী

  ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

জীবের প্রতি কিশোরীর অন্যরকম ভালোবাসা

পেটের বন্দোবস্তে এক চিলতে জমিতে লাগিয়েছি ধান। যদিও অর্থনীতিতে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে কৃষি সম্পৃক্ত নানা বিষয় পড়া সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে মাঠে গিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়নি তেমন। বলা যেতে পারে এবারই হাতেখড়ি। গিন্নির দাবি, নিজে থেকে কাজ তদারকি না করলে সেচযন্ত্রের মালিক নাকি জমিতে ঠিকভাবে পানি দিবে না, পাওয়ার টিলার ওয়ালা নাকি ভালো চাষ করবে না, ঠিকঠাক কাজ করবে না নাকি শ্রমিকও! অবশ্য প্রমাণও মিলেছে তার কথার। হাল চাষ, সেচ চারা রোপণের সময় তদারকি না করায় ঠকিয়েছে সকলেই। তাই পরিচর্যার সময় সেই ঝুঁকি আর নিতে চাইনি বলেই মাঠে যাওয়া।

মাথায় আঘাতের মারাত্মক ক্ষত নিয়ে লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে এবং গাছ বাগানের পাশে রোপণকৃত জমিতে কঙ্কাল হয়ে শুয়ে আছে একটি কুকুর। আহারের খোঁজে যাওয়াটাই মনে হয় অপরাধ হয়েছিল তার। কোনো নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ হয়তো শক্ত কোনো লাঠি কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় করেছে আঘাত। পচন ধরেছে সেই ক্ষতে। দেখেই গা যেন রি রি করে। ধারণা ছিল জীবিত নেই। একটুখানি কাছে যেতেই পাল্টে গেল সেই ধারণা। জীবিত কিন্তু হারিয়ে ফেলেছে চলার শক্তি। কাজের সুবিধার্তে লাঠির সাহায্যে আস্তে করে সরিয়ে রাখলাম কুকুরটিকে শুকনো স্থানে।

বিকেল হতে তখনো খানিকটা বাকি। বাড়ি থেকে ফিরছি আবার সেই মাঠে। মাঠে পৌঁছতেই চোখে পড়লো পাত্রে খাবার নিয়ে সেই কুকুরের পাশে বসে রয়েছে সদ্য মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুনো এক কিশোরী। থমকে দাঁড়ালাম খানিক্ষণ। নিজেকে একটু আড়াল করার চেষ্টা করলাম কিশোরীর দৃষ্টি থেকে। পরম মমতায় অসুস্থ কুকুরটির মাথায় ডান হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। মমতা পেয়ে কুকুরটিও হালকা স্বরে করছে বিলাপ। কুকুরটি যেন করুণ সুরে আল্লাহকেই ডাকছে! আর হয়তো তার কষ্টের কথাগুলো বলার চেষ্টা করছে কিশোরীকে। মাথা নিচু করে কাঁদছে কিশোরীও। কাছে যেতেই ওড়না দিয়ে মিছেমিছি আড়াল করার চেষ্টা করছে দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই অশ্রু। অসহায় জীবের প্রতি কিশোরীর এমন মমত্ববোধ দেখে মনে পড়লো-স্বামী বিবেকানন্দেরসখার প্রতি কবিতার শেষ লাইনটির কথা, 'জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর' যা মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্য বই- পড়েছিলাম।

মনে পড়লো- জীবের প্রতি দয়া করার হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত সেই হাদীসটিও।

রাসূলু্ল্লাহ (.) বলেন- 'একদা একটি কুকুর প্রচণ্ড গরমের দিনে একটি কুয়ার পাড়ে পিপাসায় কাতর হয়ে জিহবা বের করে হাঁপাচ্ছিল এবং কুয়ার চারদিকে ঘুরছিল। অবস্থা দেখে বনী ইসরাইলের একজন স্ব-ঘোষিত বেশ্যা মহিলা নিজের ওড়না দ্বারা মোজা বেঁধে কুয়ায় নামিয়ে পানি উত্তোলন করে কুকুরটিকে পান করাল। এর ফলে তার সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেয়া হল।' অপর এক বর্ণনায় হাদীসের শেষাংশে রয়েছে- সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন-হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে পানি পান করালেও কি সাওয়াব পাব? নবী (.) উত্তরে বললেন - প্রতিটি জীবকে পানি পান করালেই সাওয়াব পাওয়া যাবে। (সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর-২৫৫২, ৩৩২১, সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর-৫৯৯৭, ৫৯৯৮)

নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছিল তখন। নিজের যা করা উচিত ছিল তা করতে পারিনি বলে। অথচ মেয়েটি তা পেরেছে।

ফোন কাছে না থাকায় কিশোরীর জীবের প্রতি মমত্ববোধের এমন আবেগঘন মুহূর্তটি ক্যামেরা বন্দি করতে পারিনি সত্য, কিন্তু যা দেখেছি তা মনে থাকবে হয়তো দীর্ঘকাল।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ভালোবাসা,জীব,কুকুর
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close