ইহসানুল কবীর আনিন

  ১৮ নভেম্বর, ২০২১

পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের ছোঁয়া

‘এমন যদি হতো, আমি পাখির মতো! উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ। পালাই বহুদূরে, ক্লান্ত ভবঘুরে! ফিরব ঘরে কোথায় এমন ঘর।’

গানের কথার সাথে সাথে যেন মন উড়তে চায়! অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন তথা ভার্চুয়াল পৃথিবীর সাথে করোনাকালীন সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কাজের পরিসর।

ধরাবাধা এই কাজের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আনন্দের জোয়ারে কে না চায় গা ভাসাতে। সব নিয়মের বাঁধ ভেঙে হারিয়ে যেতে চায় দূরের কোনাে অপরিচিত জায়গায়। আবিষ্কার করতে চায় জীবনের ভিন্ন অর্থ। মেটাতে চায় মনের খােরাক। পরশ পেতে চায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের।

আমরা ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদের ১২ জন শিক্ষার্থী চললাম জীবনের এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়-ঝর্ণা। যেহেতু পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় যাব, সেখানে যাতে কোনো সমস্যা না হয় তার সকল ব্যবস্থা আমরা শেষ করলাম।

সন্ধ্যা ৭টায় গাবতলি বাস টার্মিনালের উদ্দেশ্যে বের হলাম। কারণ, রাত ৯টায় বান্দরবানের বাস। টার্মিনালের পৌঁছানোর পরে হালকা খাবার খেয়ে রওনা দিলাম। বাসে একই গন্তব্যের আরও দুইটা গ্রুপ ছিল। বাসে উঠে ছবি তোলা, হৈ-হুল্লোড় আর সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সকলে। সারারাত গাড়ি ছুটে চলেছে। আমি সামনের সিটে বসে। ছোট বেলার গাড়ি রেসিং গেমের কথা মনে পড়ছিল। সামনের সিটে বসায় গাড়ি রেসিংয়ের বাস্তব অনুভূতি পেয়েছি।

ঘুম ঘুম চোখে সবাই ভোর ৫টায় বান্দরবান শহরে নামি। ফ্রেশ হয়ে পাশের হোটেলে সকালের নাস্তা করি। এরপর সবাই চাঁদের গাড়িতে রোয়াংছড়ি উপজেলায় পুলিশের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে গাইড নিয়ে দেবতাখুমের উদ্দেশ্য রওনা করি। চাঁদের গাড়িতে করে যখন আমরা পাহাড়ে উঠছিলাম, মনে হচ্ছিল—যেন মাটি থেকে চাঁদের উদ্দেশ্য যাচ্ছি। সবাই খুব রোমাঞ্চ ও মনোরম দৃশ্য অনুভব করতে করতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই।

পার্বত্য অঞ্চলের ভেতরে আমরা ট্র্যাকিং করতে থাকি। পাহাড় থেকে আসা ঝর্ণার পানির ভেতরে দিয়ে হেঁটে চলার রোমাঞ্চ ও ভয় বলে বোঝানোর নয়। দেবতাখুমের জন্য আমরা দুইটা নৌকা ভাড়া করি। সেখানে স্রষ্টার অপরুপ মহিমা দেখে বিস্মিত হয়ে যাই। ৫-৬ ঘণ্টা পর ফিরে নীলবান্দা ঝর্ণাতে যাই। অত্যন্ত সুন্দর ঝর্ণা। সেখানে সবাই গোসল করি। পুনরায় চাঁদের গাড়ি করে রওনা হই পরের গন্তব্য থানচির উদ্দেশ্যে।

বৃষ্টিতে কিছু সময় ব্যাহত হয়। থানচি পৌছাতে রাত হয়ে যায়। রাতে সকলে একটা রিসোর্টে অবস্থান করি। পরদিন সকালে বিজিবির সহযোগিতায় দুটো নৌকায় খরস্রোতা নদী পার হয়ে রেমাক্রী পৌঁছাই। সেখান থেকে গাইড নিয়ে অন্য নৌকায় নাফাখুমের উদ্দেশে রওনা করি। নাফাখুম যেতে কিছু রাস্তা হেঁটে পার হতে হয়। সেটা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর ও পিচ্ছিল!

আধা ঘণ্টা হাটার পর আমিয়াখুম পৌঁছাই। এত সুন্দর প্রকৃতি, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে আলাদা রকমের শান্তি অনুভূত হয়। সেখানে দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর ফিরে আসি। এ সময় আমাদের সাথে অন্য দুটো গ্রুপ যুক্ত হয়। তাদের একজন পড়ে গিয়ে কোমড়ে প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অন্য গ্রুপের একজনের হাত ভেঙে যায়।

সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বড় কোনো ক্ষতি ছাড়া আমরা রেমাক্রীতে ফিরে আসি। সেখানে পাহাড়ি কলা, পেয়ারা, শসা এবং সাথে নেয়া খাবার দিয়ে হালকা নাস্তা করি। রেমাক্রী থেকে ফেরার পথে কয়েকটা ছোট ঝর্ণায় যাই। রাতে আমাদের আগের হোটেলে অবস্থান করি।

পরদিন সকালে নীলগিরিতে যাই। সেখানে সকালে কুয়াশার বৃষ্টি, প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর লীলাখেলা বলে প্রকাশ করা সম্ভব না! সেখান থেকে চিম্বুক পাহাড়ে কিছু সময় অবস্থান করি। বৃষ্টির পরে চিম্বুকের ওপরে তুলার মতো মেঘ ও নীল আকাশের চঞ্চলতা দেখে অবাক হয়ে যাই। ফেরার পথে পাহাড়ি পেয়ারা, তেঁতুল খেতে খেতে বান্দরবান শহরে পৌঁছাই। মাঝে শৈলপ্রপাতে কিছু সময় অবস্থান করি।

বান্দরবানে লাঞ্চ শেষে ফেরার টিকিট সংগ্রহ করি। বিকালে মেঘালয় ও নীলাচলের উদ্দেশে রওনা হই। মেঘালয় মনমতো না হলেও নীলাচল সবার খুব পছন্দ হয়। মেঘালয়ের ঝুলন্ত ব্রিজটা অসাধারণ ছিল। নীলাচলে পাহাড়ের ওপরে যেন স্বপ্নের রাজ্য। নীলাচল থেকে সন্ধ্যার পরে বান্দরবান শহরে ফিরে আসি। এরপর সবাই বান্দরবান শহর ঘুরি আর কিছু কেনাকাটা করি। রাতের খাবার খেয়ে বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
গণ বিশ্ববিদ্যালয়,ভ্রমণ,পাহাড়
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close