অপু সুলতান

  ১৫ নভেম্বর, ২০২০

পারিজাত ফুল

তিতাসের তীর ঘেষা গ্রাম আসাদ নগর। অনেক দিন পর বেড়াতে যাচ্ছি। এই নদীর নির্মল বাতাস আর শীতল জল আমাকে বারবার এখানে টেনে নিয়ে আসে। অবশ্য শুধু আমি না দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকেই এই গ্রামের মনোরম পরিবেশ আর তিতাসের বাতাসে বুক জুড়াতে আসে।

ব্রিজের শেষ প্রান্তেই আমার গন্তব্যস্থল- বন্ধুর বাড়ি। সেখানে একটা প্রকাণ্ড বট গাছ আছে। আমি রিকশা থেকে নামতেই দেখলাম সেই গাছটার নিচে একজন যুবক দাড়িয়ে আছেন। পকেট থেকে কী যেন বের করে নাকে নিয়ে শুঁকছেন। পরক্ষণেই ভোঁ দৌড়ে একবার বট গাছের নিচে তো আবার ব্রিজের শেষ প্রান্তে। ব্যাপার কী- কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে আমি হা-করে তাকিয়ে রইলাম। বন্ধু হাবীব বলল, ‘কী দেখছিস? ওটা একটা বড্ড পাগল।’ মনে মনে ভাবলাম এতো সুন্দর ছেলেটা পাগল হয় কী করে।

ছেলেটার গায়ে বেগুনি রঙের টি-শার্ট। সেটা ময়লা হলেও নোংরা নয়। পরনে চেকের ট্রাউজার। মাথাভর্তি লম্বা চুল। মুখভর্তি দাড়ি। মনে হয় মাস-দুয়েক শেভ করেননি। গায়ের রং ফর্সা। হঠাৎ দেখে কেউ তাকে পাগল বলতে পারবেননা। বড়জোর একটু অগোছালো বা এলোমেলো বলতে পারেন।

বিষয়টি কাছে গিয়ে ভালো করে বুঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু থামার ফুরসত নেই তার। তিনি পকেট থেকে একটা মালা বের করে প্রতিনিয়ত শুঁকছেন আর দৌড়াচ্ছেন। বটতলা থেকে ব্রিজ পর্যন্ত চক্রাকারে ঘুরেঘুরে উচ্চস্বরে একটি বাক্যই বলছেন, ‘শোন কুহেলী, এটা বেলি নয় স্বর্গের ফুল পারিজাত।’

বুঝতে পারলাম- তার হাতের মালাটা বেলিফুলের এবং কুহেলী বলে সে কাউকে সম্বোধন করছেন। মাথায় কেবলই রহস্য ঝট বাঁধছে আমার। বেলিফুলের মালাকে তিনি পারিজাত বলছেন কেন? বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম। হাবীব বিরক্তির সুরে বলল, 'আর বলিস না এই পাগলা এলাকায় কোন বেলিফুল রাখেনা, ডালসহ ছিঁড়ে এনে মালা বানায়। সেই মালা পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- শুঁকে আর প্রলাপ বকে।'

উদ্ভূত পাগল। আমি আর কথা না বাড়িয়ে বন্ধুর বাড়িতে ঢুকলাম।একটু জিরিয়েই তিতাসের শীতল জলে মনভরে অবগাহন করলাম। তারপর দুপুরের খাবার শেষে লম্বা একটা ভাতঘুম দিলাম।

বিকেল বেলা দুই বন্ধু ঘুরতে বের হয়েছি। তখন অবশ্য ছেলেটাকে দেখতে পেলাম না। আমরা তিতাসের পাড় ধরে হেঁটেছি রাত অবধি। বুকভরে নিয়েছি নিখাদ অক্সিজেনসমৃদ্ধ সতেজ বাতাস। মনে মনে ভাবছি- এই রকম নির্মল বাতাস যদি প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা যেতো, নগরের মানুষও মাঝে মধ্যে অক্সিজেনে ভরপুর  শীতল নিঃশ্বাস নিতে পারতো।

বাড়ি ফেরার সময় ছেলেটাকে ফের দেখলাম- যথারীতি তিনি একই কাজ করছেন। দুই বন্ধু মিলে তার কাছে গেলাম। তিনি দৌড়াচ্ছেন আর আমরা দৌড়ের মতো হাঁটছি। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। তিনি চুপ হয়ে গেলো। কিছু না বলে পকেট থেকে একটা বেলি ফুলের মালা বের করে ফের শুঁকতে থাকলেন। হাবীব বলল, ওর নাম সৌমেন ডি কস্তা। বুঝতে পারলাম তিনি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।

 আরও জানলাম- তার একটা কমন কবিতা আছে, যদি তার মেজাজ ভালো থাকে সেটা সে প্রায়শই উচ্চস্বরে আওড়ায়। হাবীব ফিসফিস করে  বলল, ‘তুই চুপচাপ দাঁড়া- আমি একটা ব্যবস্থা করছি।’ হঠাৎ ছেলেটা আওড়াতে থাকলো-

‘শোন কুহেলী এটা বেলি নয়-

স্বর্গের ফুল পারিজাত

বন্ধ নাসিকায়ও খুলে যায়

লেগে ঘ্রাণের অভিঘাত,

মোহ-মায়ায় জেগে উঠে ভিতর

বাহির- হয় কপোকাত

শোন কুহেলী এটা বেলি নয়-

অপার্থিব ফুল পারিজাত।

কোথায় পেলে এই ফুল তুমি

স্বর্গীয় সুবাস যার

ঈশ্বর নিজ হাতে লাগিয়েছে

মালি রেখেছে পরিচর্যার

পূণ্যবানকে পূণ্যের তরে

দিবেন মোহনীয় উপহার

কোথায় পেলে এই ফুল তুমি

কস্তুরী সুবাস যার।’

আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। পুরো কবিতাটা বলা শেষ হতে না হতেই একদৌড়ে সেখান থেকে চলে গেলেন ছেলেটা।

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এটা কার লেখা? তিনি নিজে লিখেছেন? না অন্য কারো? কবিতায় পারিজাত এবং কস্তুরী শব্দ দুটো আমাকে অন্যরকমভাবে ভাবিয়ে তুললো। পৌরাণিক কাহিনিতে স্বর্গের বর্ণনায় বারবার এসেছে এই পারিজাত ফুল। ইন্দ্রের কাননের প্রধান বৃক্ষটিও হলো পারিজাত। মর্ত্যের রাজা শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের কাছ থেকে জোর-জবরদস্তি করে মর্ত্যের বাগানে এনে লাগান এই পারিজাত ফুল।

কস্তুরী হলো মৃগনাভি। বিশেষ প্রজাতির পুরুষ হরিণের দশ বছর পূর্ণ হলে- এই নাভি গ্রন্থি পূর্ণতা পায়। তখন এই গ্রন্থি থেকে তীব্র সুগন্ধ ছড়ায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হল এই ঘ্রাণ যখন হরিণের নাকে লাগে- তখন সে পাগলের মতো খুঁজতে থাকে ঘ্রাণের উৎস। অথচ আদৌ সে বুঝতে পারেনা তার নিজের দেহ থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে এই মাতাল করা সুঘ্রাণ। কস্তুরী মৃগ শিকারীরা মোটা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে নেয়। তারপরও তীব্র গন্ধে অনেকে জ্ঞান হারায়- এমনকি মৃত্যুও ঘটে।

বেলি আমার প্রিয় ফুল। সামনে পেলেই এর গন্ধ নেই আমি। বিমোহিত হই মনোমুগ্ধকর সুবাসে। কিন্তু এই ফুলের ঘ্রাণ কস্তুরীর মতো এতটা তীব্র নয় যে-  এর ঘ্রাণ শুঁকে কেউ সংজ্ঞা হারাতে পারে অথবা বিকারগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু ছেলেটা বেলিকে স্বর্গের ফুল পারিজাত বলছেন কেন- মনে হয় রহস্য এখানেই কাজ করছে। হতে পারে বেলি থেকে তিনি পারিজাত ফুলের ঘ্রাণ পেয়েছে। হয়তো বিশেষ কেউ তাকে এই ফুল দিয়েছে। বিশেষ কারো দেওয়া সাধারণ জিনিসও অতি অসাধারণ হয় উঠে কখনো কখনো।

হাবীবকে বললাম- সৌমেনের এরকম মানসিক বৈকল্য হওয়ার একটা রহস্য আছে এবং আমি সেটা উন্মোচন করতে চাই। বন্ধু আমার সৌমেনের মায়ের সাথে দেখা করিয়ে দিলো। তিনি আমাকে সব খুলে বললেন। যার সার-সংক্ষেপ দাড়ায়- সৌমেন একটা মেয়েকে ভালোবাসতো। মেয়েটা ছিল রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের। নাম তার কুহেলী। এলাকায় তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি দুটোই ছিল। কুহেলীর পরিবার ঘোর বর্ণপ্রথায় বিশ্বাসী। নিজ গোত্রের বাইরে কোনো সমন্ধ হবে সেটা তারা ভাবতেই পারেননা। আর ভিন্ন ধর্মের সৌমেন- সেটাতো কল্পনাতীত। অবশ্য সৌমেনদের পরিবার থেকে কোন বাঁধা ছিলো না। একমাত্র বাঁধ সাধে কুহেলীর বাবা ও তার পরিবার। সৌমেন-কুহেলী পালিয়ে গেলো ঘোর বর্ষার অন্ধকার রাতে। কুহেলী ধর্মান্তরিত হয়েছিল। বিয়েও হয়েছিল দুজনের। সৌমেনের প্রিয় ফুল বেলি দিয়ে সাজানো হয়েছিল তাদের বাসর। কুহেলী নিজ হাতে বেলি ফুলের মালা বানিয়ে উপহার দিয়েছিল সৌমেনকে। ঠিক সেই রাতেই পুলিশ নিয়ে হাজির হন কুহেলীর বাবা। বাসর হলো না তাদের। কুহেলীদের বাড়ির ত্রিসীমানায় যাবেনা- পুলিশকে এই মুচলেকা দিয়ে এবং ঢের অর্থের বিনিময়ে ছাড়া পান সৌমেন। ঠিক তার একমাস পর- সপরিবারে ভারত চলে যায় কুহেলীরা। এরপর আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি কুহেলীর। সেই বিচ্ছেদের বিষাদ যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এই অবস্থা সৌমেনের। এবার রহস্য কিছুটা ঝট খুলেছে।  কিন্তু বেলির সাথে পারিজাতের কী সম্পর্ক এবার সেটার দিকে নজর দিতে চাই। দেখলাম সৌমেনের মায়ের চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না উনাকে কি বলে সান্ত্বনা দিবো। আমি প্রসঙ্গটা পরিবর্তন করলাম।

-আন্টি সৌমেন কোন ঘরটায় থাকে? তিনি চোখ মুছতে মুছতে তর্জনী উঁচু করে দেখিয়ে বললেন, 'সামনের দক্ষিণ পাশের রুমটায়।'

-আন্টি আমি রুমটার ভিতরে গেলাম।

-না বাবা, সৌমেন দেখলে তোমার অসুবিধা হবে। হাবীবকে বললাম- আমি ঘরে ঢুকছি তুই রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখ- সৌমেন আসে কিনা। ও বাড়িতে ঢুকতে ধরলে তুই আমার নাম ধরে ডাকবি। সৌমেনের মা বলল ও সাধারণত এসময় বাসায় ফেরে না। যাক কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। ঘরটায় ঢুকতেই ডানপাশে একটা অগোছালো খাট। বাম পাশে একটা টেবিলে কিছু ধূলোমাখা বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। খাটের নিচে একটা বড় ট্রাংক। টেবিলের ড্রয়ার খুলতেই দেখলাম- কিছু পুরানো বেলি ফুলের মালা। কিছু টুকিটাকি জিনিস- এগুলো আমার জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এবার দৃষ্টি দিলাম ট্রাংকের দিকে। দেখলাম তালা লাগানো। পাশেই একটা রডের টুকরো ছিল। সেটা দিয়ে কয়েকটা বাড়ি দিতেই তালাটা ভেঙ্গে গেল। দেখলাম- বেশ কয়েকটা ডায়েরি। গিফট পেপারে মোড়ানো কিছু উপহার সামগ্রী। একটা ফুলের মালা- বেলি নাকি অন্য ফুল ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিছু পুরনো চিঠি- কুহেলীকে উদ্দেশ্য করে লেখা। একটা ডায়েরি হাতে নিয়ে কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টাতেই স্পষ্ট হাতের লেখায় সেই কবিতা- স্বর্গের ফুল পারিজাত। আমি পড়তে ধরলাম। একটা তীব্র সুঘ্রাণ নাকে এসে ধাক্কা দিলো। কেমন যেন নেশার মতো কাজ করছে। মনে হয় বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলছি। অসম্ভব ভালো লাগছে। আমি দিকবিদিক সব ভুলে যাচ্ছি। একটা নতুন সাম্পান। লাল-নীল-সবুজ হরেক রঙে রাঙ্গা। তিতাসের ভরা যৌবন। দু’কূল পানিতে টইটুম্বর। নিটোল স্বচ্ছ জল। বলাকার দল উড়ে যাচ্ছে। হংসমিথুন জলকেলি করছে। মাছরাঙা, পানকৌড়ি ডুবে ডুবে মাছ ধরছে। স্রোতের টানে সাম্পান ভেসে চলেছে। চারপাশে বিশাল বিশাল ফুল জলে ভেসে যাচ্ছে। একই প্রজাতির বাহারি রঙের ফুল- আকাশের মতো নীল, মেঘের মতো ধবল, দুধে আলতা মেশানো। কারা যেন ফুলগুলো ছিটিয়ে দিচ্ছে।সাম্পান ভরে যাচ্ছে ফুলে ফুলে। অপার্থিব সুগন্ধ আর মোহনীয় সৌন্দর্য ভরা দৃশ্য। একটা নারী। ময়ূর রঙের শাড়ি। হাতভর্তি রেশমি চুড়ি। একটা লাল টিপ। মায়াভরা দুটি চোখ। দীঘল কালো কেশ।

ইতোমধ্যে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে গেছে। নিজেকে হাসাপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করি। আমি নাকি অচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলাম। সৌমেনকে আসতে দেখে হাবীব আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করে। সাড়া-শব্দ না পেয়ে তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে। আশেপাশের মানুষ জমে যায়। সৌমেন চলে আসায় সবাই আতংকিত হয়ে পড়ে- কী জানি কী করে বসে। প্রথমে রাগে অগ্নিমূর্তি হলেও পরে আমার এই দুরাবস্থা দেখে সৌমেন নাকি বলেছে- 'না জেনে না শুনে- তালা ভেঙে সে এটা ধরতে গেল কেন?'

রায়পুরা, নরসিংদী

পিডিএসও/ জিজাক

পারিজাত ফুল,প্রেম,ভলোবাসা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়