মাস্ক না পরলে ক্ষতি বাড়বেই

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২০, ১১:৩৫

ডা. লেলিন চৌধুরী

আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, শীতে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ বাড়বে বিশ্বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ ডাক্তার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ার করে দিয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এই আশঙ্কার কথা বলেছেন।

ইউরোপে এরই মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা প্রথম ঢেউ-ই মোকাবিলা করতে পারিনি। রেখাচিত্রে দেশের করোনা সংক্রমণের হার সমান্তরাল ছিল। শীতের শুরুতে এই হার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতেও মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মানার উদাসীনতা চূড়ান্ত পর্যায়ে।

আমরা আশা করছিলাম, করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এজন্য রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রচার অভিযান চালানো হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। এখন কিছু অভিযান চলছে, আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু জরিমানা এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাদের কিছুক্ষণ আটকে রাখতে হবে। তিনি যেন বুঝতে পারেন, মাস্ক না পরলে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে নিজের ক্ষতি, একইভাবে অন্যেরও ক্ষতি।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মাস্ক না পরলে জরিমানা ২ হাজার রুপি ঘোষণা করেছে এরই মধ্যে। সে তুলনায় দেশে জরিমানার পরিমাণ অনেক কম। অপরদিকে, করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের আয় আরো কমে গেছে। সেক্ষেত্রে তিনি চাল-রুটি কিনবেন, না কি মাস্ক কিনবেন? তাদের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেই এই উদ্যোগ নিতে হবে, তাতে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠন, গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানকে বলা উচিত মাস্ক ও সুরক্ষাসামাগ্রী তৈরি করে বিতরণ করতে। আমরা আইলা, সিডরের সময় এ সহযোগিতা দেখেছি। দুর্যোগে মানুষের অংশগ্রহণ দেখেছি।

‘আউট অব সাইড, আউট অব মাইন্ড’ একটা ব্যাপার আছে। আগে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) করোনার বুলেটিন প্রচার করা হতো। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসত। এই সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কাজ সারা হচ্ছে। চোখের সামনে থেকে বুলেটিন সরে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে উদাসীনতা শুরু হয়েছে। আমরা চাইছি, আইইডিসিআরের ওই নিয়মিত ব্রিফিং আবার শুরু হোক।

একটি কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আমরা যে সংক্রমণ শনাক্ত করতে পারছি, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। কিন্তু মানুষ পরীক্ষা করাতে চায় না। এর কারণ ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতা। অনেক ঘোরাঘুরির পর দীর্ঘ লাইন দিয়ে নমুনা দিতে হয়, ফল আসে কয়েক দিন পর। পরীক্ষা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিসে’ নিয়ে আসতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নমুনা পরীক্ষার ফল দেওয়া গেলে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে। শুরুতে কম ল্যাবে বেশি পরীক্ষা করা হতো। সরকারের সংস্থাই বলছে, এখন দেশের ১১৭টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। অথচ নমুন পরীক্ষা হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক কম। তাহলে ২৪ ঘণ্টায় কেন ফল প্রকাশ করা যাবে না? এ ছাড়া তৃণমূলে র‌্যাপিড টেস্টের ব্যবস্থা করা উচিত। র‌্যাপিড টেস্ট ১০০ ভাগ সঠিক নাও হতে পারে, তার পরও এর দ্বারা মানুষের মধ্যে সংক্রমণের একটা স্ক্যানিং হবে।

সরকারিভাবে করোনার বিষয়ে দেওয়া তথ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে বিস্তর প্রশ্ন আছে। এটা স্বচ্ছ হতে হবে। দেশে যে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা সরকারি হাসপাতালের হিসাবে। এর বাইরে যে বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হচ্ছে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ ও যুক্ত হচ্ছে না। তাছাড়া দেশে করোনা প্রতিরোধে আমাদের কী সামর্থ্য আছে, তাও স্বচ্ছ নয়। শুরুতে মাত্র ২ হাজার টেস্ট কিট নিয়েই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিল, আমরা শতভাগ প্রস্তুত। অথচ কার্যক্ষেত্রে তা শূন্যভাগ।

ভ্যাকসিনের মূল্য নিয়েও ধূম্রজাল আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ভ্যাকসিনের পেটেন্ট নিয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড (এসআইআই)। ওই ভ্যাকসিন বাংলাদেশের বাজারে শুধু বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসই সরবরাহ করতে পারবে। বিল গেটস ফাউন্ডেশন ও গ্যাভির ডোনেশন করায় ভারতে এর মূল্য রাখা হচ্ছে ৩ ডলার। অথচ বাংলাদেশে এটা কিনতে হবে ৫ ডলারে। কেন? মানুষ বুঝে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাড়তি মূল্য দিতে হবে।

করোনা মহামারির মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ঘটেছে। জাদিদ অটোমোবাইলস নামে একটি গাড়ির যন্ত্রপাতি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে দ্বিগুণ মূল্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। লুটপাটের অভিযোগ আছে। কেএন-৯৫ নামে নিম্নমানের মাস্ক দেওয়া হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনকে এতে নাক গলাতে হয়েছে, মামলাও করেছে তারা। তাতে কয়েকজনকে ওএসডি করা হয়েছে, কিন্তু শাস্তি দেওয়া হয়নি।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি মানুষের উদাসীনতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এখন মাস্ক না পরলে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ক্ষতি কেবল বাড়বেই।

ডা. লেলিন চৌধুরী : গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; চেয়ারম্যান, হেল্থ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

পিডিএসও/ জিজাক