নতুন আশায় বুক বাঁধছেন আরব আমিরাত প্রবাসীরা

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৫৬ | আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২০, ১৬:৪৭

নওশের আলম সুমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত

বিশ্বে চলছে মহামারি করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে করোনায় আক্রান্তের হিড়িক, সাথে মৃত্যুর মিছিল। চারদিকে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। কেউ চিন্তা করছে নিজেকে নিয়ে, কেউবা আবার দুঃচিন্তায় পরিবার-পরিজনের জন্য।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একদিকে পরিবার পরিজনের খরচ মেটানো, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় চাকুরী হারিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন দেশে। টানা কয়েকমাস লকডাউন থাকায় স্থবির হয়ে যায় সবকিছু। যার প্রভাব এখনো কাটেনি।

এদিকে লকডাউন তুলে নিয়েছে আরব আমিরাত সরকার। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুমতি দিয়েছে দেশটি। জানা যায়, দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক মানুষ। এরমধ্যে ১২৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। যাদের সবাইকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে দাফন করা হয়েছে।

করোনা শুরু হওয়ার পর বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় আরব আমিরাত সরকার। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যথাযথ আইন প্রয়োগ। দেশটিতে বসবাসরত সবাইকে করোনাভাইরাস টেস্টের আওতায় আনা, যা সম্পুর্ণ বিনামুল্যে করা হয়।

করোনাভাইরাস পজিটিভ হলে, নির্ধারিত সরকারি হাসপাতালে সম্পুর্ণ বিনামুল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। নিয়মিত মনিটরিং সেলের মাধ্যমে সবকিছু তদারকি করা ইত্যাদি। বলা চলে, এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বে যে কয়টি দেশ সফল তার মদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত উল্লেখযোগ্য।

আরব আমিরাতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানায়, চায়নার চিনু ফার্মার (সিনোভ্যাক) নামের করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রায় ছয় সপ্তাহধরে কয়েকহাজার সেচ্ছাসেবীর মাঝে মানব ট্রায়াল চালায় আরব আমিরাতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও রয়েছেন। ভালো ফলাফল পাওয়ায় ইতিমধ্যে ভ্যাকসিনটি ফ্রন্ট লাইনের কর্মিদের শরীরে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই। ছয় সপ্তাহ মানব ট্রায়াল শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অনুমোদন দেন। শীগ্রই সাধারণ জনগণের জন্য তা উন্মুক্ত হবে বলেও জানান তিনি।

আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি চট্রগ্রামের মো. সেলিম বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস আসার পর আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। সারাদিন দোকান খুলে বসে থাকি, কাস্টমারের দেখা পাইনা। দোকানের বেচা বিক্রি কম তাই বেতন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে দোকানের মালিক। এই মহামারির মধ্যে এখনো সুস্থ আছি সেজন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি। আরব আমিরাত সরকার খুব ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে সেজন্য তাদেরকেও ধন্যবাদ। আসাকরি সবকিছু আবার আগেরমত হবে, ইনশাআল্লাহ।

যশোরের মো. ইউনুস বলেন, লকডাউনের কারণে ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিলাম এখন সেটা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি। করোনা আমাদেরকে অনেককিছু শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের উচিৎ এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। ইতিমধ্যে আরব আমিরাত সরকারের নেয়া পদক্ষেপ গুলো অনেক উপকারে আসছে প্রবাসীদের। আমরা সবকিছু ভুলে নতুন করে আশায় বুক বাঁধতে চাই। 

তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা বিদেশের চেয়ে দেশে বেশি অবহেলিত। প্রবাসীদের যাবতীয় সমস্যা দূরীকরণের জন্য সরাসরি সরকার প্রধান হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

এদিকে করোনার আগে ছুটি কাটাতে গিয়ে দেশে আটকা পড়ে বিপাকে আছেন কয়েক হাজার আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি। ফিরতি টিকিট নিয়ে গেলেও আইনকানুনের বাধ্যবাধকতায় পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতায়। করোনার সার্টিফিকেট, বিমানের শিডিউল, এবং আমিরাতের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে সহজে ফিরতে পারছেন না তারা।

কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তাদের দেশকে সর্বোচ্ছ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন পরিবর্তন করে থাকেন। তাই ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে তারপর আমিরাতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সরজমিনে দেখা যায়, সবকিছু আগেরমত স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ/মাদ্রাসাসহ সবকিছু আস্তে আস্তে খুলে দিচ্ছে দেশটি। মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক থাকলেও জীবিকার তাগিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজে যোগ দিচ্ছেন সবাই। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশিদের জন্য আভ্যন্তরীণ ট্রান্সফার সুবিধা বন্ধ ছিলো। কিন্তু ইতিমধ্যে তা চালু করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশি উপকৃত হবেন বলে আসা করছেন তারা।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখেরও বেশি বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে নারী কর্মী এক লাখ ২৩ হাজার ৯৮৫ জন।

২০১২ সালের ১২ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে হঠাৎ করে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে বাংলাদেশিরা নতুন ভিসা ইস্যু ও অভ্যন্তরীণ ট্রান্সফার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রম বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। রেমিট্যান্স প্রেরণকারীর শীর্ষেও দেশটি।

পিডিএসও/এসএম শামীম