নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৬ নভেম্বর, ২০২২

বন্ধ হচ্ছে ‘অনেক স্মৃতির’ মধুমিতা!

ছবি: প্রতিদিনের সংবাদ

ঢাকায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মধুমিতা সিনেমা হলে এখন ঝুলছে তালা, সেই তালা আবার খুলবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রেক্ষাগৃহটির মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বললেন, কবে যেন হলটাই বন্ধ করে দিতে হয়। একদিন হুট করে শুনবেন মধুমিতা বন্ধ হয়ে গেছে। ভালো সিনেমা নেই বলে দর্শক নেই, ফলে হল চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

একসময়ের জনপ্রিয় এই প্রেক্ষাগৃহটি ৫৫ বছরে পা রাখবে আগামী ১ ডিসেম্বরে। হলের সামনে দাঁড়িয়ে হতাশ কণ্ঠে নওশাদ বললেন, ‘এই হলটা নিয়ে কত স্মৃতি আমাদের!

এদিকে, ১৯৩৬ সালে পুরান ঢাকার বংশালে প্রতিষ্ঠিত প্রেক্ষাগৃহটি ৮০ বছরের পথচলায় ইতি টানে ২০১৯ সালে; সাইনবোর্ড পাল্টে মানসী কমপ্লেক্স নামে এখন বিপণী বিতান হয়েছে। সিনেমা হল না থাকলেও সেই রাস্তাটি মানসীর নামেই পরিচিত সবার কাছে।

শুক্রবার (২৫ নভেম্বর) থেকে মধুমিতায় সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ; তাই ফুটবল বিশ্বকাপের শেষের দিককার খেলাগুলো দেখানোর ইচ্ছা নওশাদের। তিনি জানিয়েছেন, খেলা দেখানোর অনুমতির জন্য টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

শুধু মানসী আর মধুমিতা নয়; শাবিস্তান, সিনেমা প্যালেস (রূপমহল), লায়ন, মুন, মল্লিকা, গুলিস্তান, রাজমনির মতো সিনেমা হল বিলুপ্ত হলেও সেই নামগুলো এখনও রয়ে গেছে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি জানিয়েছে, ১৯৯৮ সালে ১২ শ’ ৩৫টির মতো সিনেমা হল ছিল দেশে। দুই যুগের ব্যবধানে হলের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ১২০টিতে নেমেছে। করোনাভাইরাসের ধাক্কা সামলে এখন চালু আছে ৬০টির মতো হল।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালের ১ ডিসেম্বর ‘মধুমিতা’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলে প্রায় তিন বিঘার উপরে নিজস্ব ভবনে গড়ে ওঠা এই হলটি পুরোপুরি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। ১ হাজার ২২১ জন দর্শক একসঙ্গে বসে ছবি দেখতে পারেন এখানে।

একেবারে বন্ধ হওয়ার শঙ্কা কেন? যেখানে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ দেশি সিনেমার জোয়ার তুলেছে-এমন প্রশ্নে ইফতেখার বললেন, পাঁচ-সাত বছর ধরে খরা চলছে। ’পরাণ’, ‘দিন: দ্য ডে’ এবং ‘হাওয়া’ আসাতে লোকজন কিছুটা আসা শুরু করেছিল। ‘পরাণ’ আর ‘হাওয়া’ চার সপ্তাহ করে চলছে। ‘দিন: দ্য ডে’ চলেছে দুই সপ্তাহ। আরা আবার ‘পরাণ’ চালিয়েছি।

এরপরের ছবিগুলো বিলো স্ট্যান্ডার্ড। এগুলো চালানো শেষ। ভালো ছবি নেই। দর্শক হলে আসছে না। বিদ্যুৎ বিলই উঠছে না। বাধ্য হয়ে ছবি চালানো বন্ধ।

ইফতেখার বলেন, মাসে আমাদের তিন-চার লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। বেতন না পেয়ে অনেক কর্মচারী চলে গেছে। আমরাও কিছু কমিয়েছি। আগে যেখানে ১০ জন কর্মচারী কাজ করত, এখন সেটা চার-পাঁচজন দিয়ে করাতে হচ্ছে। তার মতো অনেক হল মালিকই কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান ইফতেখার।

এর মধ্যে বেশ কিছু সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, তাতেও কি দর্শক খরা কাটেনি- প্রশ্নে তিনি বলেন, এগুলো সব নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা। সাধারণ দর্শক দেখে না। সিনেপ্লেক্সগুলো সকালে চালায়। দর্শক বাড়লে এরপর বিকালে শো দেয়। সিনেপ্লেক্স চালাতে পারে। তাদের চার-পাঁচশ সিট। আমাদের ১১-১২শ সিট। যদি দর্শক না আসে, আমরা কি করে এসব ছবি চালাই?

হলের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেকে বলে হলের পরিবেশ নেই। ভালো ছবি না আসলে পরিবেশ ভালো হবে কী করে? ‘ভালো’ সিনেমা ছাড়া দিন বদলাবে না বলেই মনে করেন ইফতেখার। তিনি বলেন, এক সময় কিন্তু এইসব পরিবেশেই দর্শক উপচে পড়েছে। কারণ তখন ভালো সিনেমা ছিল। ভালো আর্টিস্ট ছিল। জসিম ভিলেন থেকে হিরো হয়েছেন। তার ছবি দেখতে দুই গুণ, তিন গুণ টাকা দিয়ে ব্ল্যাকে টিকেট কেটেছে দর্শক। জফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন, ফারুক, রাজ্জাক, আলমগীররা ছিলেন। আরও কত বড় বড় আর্টিস্ট ছিল। ঢাকাই সিনেমার নায়ক শাকিব খানেরও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও হতাশা ঝরে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শকের কথায়। এখন কয়টা আর্টিস্ট আছে? বাপ্পি আর সিয়াম ছাড়া কে আছে? শাকিব খান অনেক বছর সিনেমাকে টেনে নিয়ে গেছে। এখন সিনেমা করেই না। সে একের পর এক কন্ট্রোভার্সির জন্ম দিচ্ছে। অনেকে বলে হলের পরিবেশ নেই। ভালো ছবি না আসলে পরিবেশ ভালো হবে কী করে?

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মধুমিতা,সিনেমা হল,নওশাদ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close