এ আর রাশেদ, ইবি

  ০৮ ডিসেম্বর, ২০২১

মেসে স্থানীয়দের হামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী আহত, মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসের পাশের শেখপাড়া এলাকার এক মেসে স্থানীয়দের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ত্রিবেনী রোডের সাকসেস কোচিং-সংলগ্ন রবিউল ইসলাম মেসে এ ঘটনা ঘটে। আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার জাহিদুল ইসলামের মদদে স্থানীয় ২০-৩০ জন এ হামলা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনার পর আশপাশের অন্য শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা তাদের ওপরও চড়াও হয়। এ সময় স্থানীয়রা জড়ো হয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসে। এমনকি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নেয়। পরে শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। মারধরের ঘটনার শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর পুনরায় হামলার প্রস্তুতি ও স্থানীয়দের সাথে বাকবিতণ্ডার এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও প্রক্টরিয়াল বডির কোনো সদস্য সেখানে উপস্থিত হননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থল থেকে ক্যাম্পাসে আসার পর শৈলকুপা থানার পুলিশ উপস্থিত হয়ে স্থানীয়দের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেন। পাশাপাশি পুলিশ বুধবার (৮ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বিষয়টি সুরাহা করার আশ্বাস দেন। আহত শিক্ষার্থীদের বিশ্বদ্যিালয়ের কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আহত শিক্ষার্থীরা হলেন—আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের কামাল উদ্দিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সুলতান মাহমুদ, ভূগোল বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের জুয়েল রানা, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাজহারুল ইসলাম ও দাওয়াহ বিভাগের ২০১৭-১৭ শিক্ষাবর্ষের আব্দুর রহমান।

এ ঘটনার পর ওই মেসসহ আশপাশে থাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগ নেতা ও ত্রিবেণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রেজাউল করিম খান শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্র জানায়, ত্রিবেনী রোডের সাকসেস কোচিং-সংলগ্ন রবিউল ইসলাম মেসে ১২ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করেন। এদের মধ্যে আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের কামাল উদ্দীনের মাস্টার্স শেষ হয়েছে। এজন্য সোমবার রাতে তারা মেসে ট্যুরের পরিকল্পনা করছিলেন।

মেসের পাশেই বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার জাহিদুল ইসলামের। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে জাহিদ তাদের মেসে আসেন এবং কামালকে ডাকেন। এরপর শিক্ষার্থীদের ডাকাডাকির কারণে তার ঘুম ভেঙে যায় বলে জানান। এর আগেও শিক্ষার্থীরা মেসে চিল্লাচিল্লি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরে মেসে থাকা অন্য শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে জাহিদ চটে যান এবং শিক্ষার্থীদের শাসাতে থাকেন। একপর্যায়ে জাহিদ শিক্ষার্থীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এরপর জাহিদ শিক্ষার্থীদের দেখে নেওয়া এবং হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান।

পরে রাত সোয়া ৯টার দিকে জাহিদ অন্তত ২০ থেকে ৩০ জনকে নিয়ে মেসে ঢুকেন। এ সময় মেসের সাটার বন্ধ করে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। হামলাকারীদের হাতে লাঠি, বাঁশ, কাঠ, রড লাইট ছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এতে একজন গুরুতরসহ অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

এ সময় হামলাকারীরা মেসের সাটার নামিয়ে শিক্ষার্থীদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। অবরুদ্ধ থাকাবস্থায় মেসের অন্য শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেনকে ফোনে বিষয়টি জানান। এ সময় প্রক্টর পুলিশ পাঠাবেন বলে তাদের আশ্বাস দেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

পরে তারা আশপাশের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানালে সাটার খুলে সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করেন। একজন শিক্ষার্থীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। এরআগে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখে স্থানীয়রাও আস্তে আস্তে জড়ো থাকে। এ সময় পর্যন্তও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি কিংবা পুলিশ প্রশাসন কেউ উপস্থিত হননি।

শিক্ষার্থীরা কর্মকর্তা জাহিদের খোঁজ করতে চাইলে স্থানীয়রা তদের সাথে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। আনন্দনগর মসজিদ এলাকাসহ তিন দিক থেকে থেকে প্রায় দুই শতাধিক স্থানীয় লোকজন দা, রড, শাবলসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জন্য এগোতে থাকে।

শিক্ষার্থীরা অবস্থা বেগতিক দেখে আবারও প্রক্টরিয়াল বডির কাছে ফোন দিয়ে সাহায্যে চান। এ সময়ও প্রক্টরিয়াল বডি কিংবা পুলিশ কেউই ঘটনাস্থলে যাননি। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েন। তবে কয়েকজন ঘটনাস্থলে থেকে যায়। পরে ত্রিবেণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী রেজাউল করিম খানসহ এলাকায় কয়েকজন প্রতিনিধি স্থানীয়দের আটকান।

পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয়দেরকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধি ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে বসেন এবং বিষয়টি সুরাহা করার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেসে অবস্থানের বিষয়ে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। তবে এরমধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির কেউই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের ভাইয়েরা মার খেয়েছে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে স্থানীয়রা আমাদের ওপর চড়াও হয়। তিনদিক থেকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর হামলার জন্য এগিয়ে আসে। অনেকবার আমরা প্রক্টরিয়াল বডিকে জানিয়েছি কিন্তু একটি বারের জন্য কেউই আমাদের রক্ষার জন্য ঘটনাস্থলে আসলেন না।

ভুক্তভোগী কামাল উদ্দীন বলেন, জাহিদ ভাই আমাদের পাশের মেসে থাকেন। মঙ্গলবার রাতে আমাদের মেসে আসেন এবং আমরা প্রতিনিয়ত চিল্লাচিল্লি করি বলে অভিযোগ করেন। একইসাথে তিনি রাগারাগি করেন এবং আমাদের হুমকি ধামকি মেস থেকে চলে যান। পরে তিনি ৩০/৪০ জনকে নিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা করেন। তিনি (জাহিদ) নিজেও আমাকে মেরেছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। মারামারির ঘটনার সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। উল্টো শিক্ষার্থরা আমাকে বিনা কারণে অভিযুক্ত করে আমার বাড়ির গেটে ইট পাটকেল মেরেছে। আমি বিষয়টি প্রক্টরকে জানিয়েছি। আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেস মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আমি বিচার চাইব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঘটনা শুনার পরই আমি পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলি এবং তাদেরকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার অনুরোধ জানাই। পাশাপাশি সহকারী প্রক্টর ড. শফিকুল ইসলামকে ঘটনাস্থলে যেতে বলি।

তবে এ বিষয়ে সহকারী প্রক্টর ড. শফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশনা পাননি বলেন জানান। তিনি বলেন, ঘটনা শোনার পর নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলাম। তাই ঘটনাস্থলে যেতে দেরি হয়েছিল।

মধ্যরাতে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

এদিকে স্থানীয়দের দ্বারা মেসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মধ্যরাতে ছাত্র আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্যাম্পাসে। হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে মিছিল ও উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় তারা হামলার নেতৃত্বদানকারী আল-কোরআন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার জাহিদুল ইসলামের স্থায়ী বহিষ্কার দাবি, হামলার সাথে জড়িতদের বিরূদ্ধে যথাযথ ব্যববস্থা গ্রহণ, ক্যাম্পাস-পার্শ্ববর্তী মেসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও প্রক্টোরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ জানান তারা।

এ সময় এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন বক্তব্য দেন তারা। শিক্ষার্থীরা বলেন, মেসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বন্দি করে হামলা অত্যন্ত অমানবিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। আমরা ঘৃণাভরে এর প্রতিবাদ জানাই। মারধরের পর মেসে অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীরা সাহায্য চেয়ে প্রক্টরিয়াল বডির কাছে ফোন দেওয়ার পরও সেখানে প্রশাসনের কোনো ভূমিকাই ছিল না।

বরং অন্য শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ধার ও প্রতিবাদ করতে গেলে তারাও হামলার মুখে পড়ে জীবন নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। এসব ঘটনার দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্তাব্যক্তি শিক্ষার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে জাননি, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, এ ঘটনার মূলহোতা কর্মকর্তা জাহিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি মারধরের সাথে জড়িত স্থানীয়দের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরে রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন ও সহকারী প্রক্টর ড. শফিকুল ইসলাম উপাচার্যের বাসভবনের সামনে যান এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। এ সময় তারা বুধবার ১১টায় শিক্ষার্থীদের এসব দাবি নিয়ে উপাচার্যের সাথে বসার আশ্বাস দেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ক্যাম্পাস,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,ইবি,হামলা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close