টিউশন ফি আদায়, তবু বেতন নেই

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:০৭

বদরুল আলম মজুমদার

নভেল করোনাভাইরাস মহামারিকালেও নানা কৌশলে টিউশন ফি আদায় করছে দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। টিউশন ফি আদায় করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণও করছে অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ। মহামারির শুরুর দিকে টিউশন ফি আদায় অনেকটা কষ্টসাধ্য হলেও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফি আদায়ও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো উদাসীন। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে এখনো অভিযোগ মিলছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সদরে।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, পাঠদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর নিয়মিত পরিশোধ করা হবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা। যদিও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে অল্পসংখ্যক শিক্ষককে নামমাত্র বেতন দিয়ে যাচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে যেসব শিক্ষক অনলাইন পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত নেই তাদের বিনা বেতনে ছুটি দেওয়ার মতো করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এভাবে প্রতিটি স্কুলের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষককে বসিয়ে রাখা হয়েছে বিনা বেতনে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা যথাযথভাবে পরিশোধ করার ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপ আছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের তাগিদ আছে। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না তেমন।

শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আদায় স্বাভাবিক হওয়ার পরও শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ না করার বিষয়ে এমপিওভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক প্রতিনিধি ও অধ্যক্ষ বলেন, এটা উদ্যোক্তাদের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়েই চলে। মহামারির শুরুর দিকে ২-৩ মাস টিউশন ফি পাওয়া না গেলেও এখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ৮০-৯০ শতাংশ ফি এরই মধ্যে আদায় করে ফেলেছে আগের বকেয়াসহ। আর ১০-১৫ শতাংশ ফি আদায় হয়নি বা নাও হতে পারে। বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে স্বাভাবিক সময়েও এমন বাঁক থাকে। বলতে গেলে টিউশন ফি না পাওয়ার সঙ্কট কেটে গেছে। এখন শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের আছে। তারপরও অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে না। এজন্য সরকারের তদারকি বাড়ানোর তাগিদ দেন তারা।

উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শেখ আহমদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের উত্তরায় অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া নিয়ে এখনো গড়িমসি করছে। এখন সব কিছু স্বাভাবিক, চাইলেই মালিকপক্ষ বেতন দিয়ে দিতে পারে কিন্তু দিচ্ছে না। আমার পরিচিত কয়েকজন শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন বেতন না পেয়ে। উত্তরার স্কুল-কলেজগুলোতে যে পরিমাণ টিউশন ফি আদায় হয় তাতে ইচ্ছা করলেই বেতন দেওয়া যেতে পারে।’

কুমিল্লা মহানগরের নামকরা একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক মো. রাছেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই করোনা! বিগত ৭টি মাস শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারা সম্পূর্ণ স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, কলেজগুলো লাখ লাখ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ওইসব প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষকদের অনেকে নীরবে নিভৃতে কাঁদে। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ফল বিক্রি করে, কেউ অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে, কেউ ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহের জন্য যা পারছে তাই করছে। আজ যদি সরকারি/এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বন্ধ থাকত আমি নিশ্চিত যে টকশোর বাজার গরম হতো এবং গার্মেন্ট ও পরিবহনের সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিত। যেহেতু বিনা পরিশ্রমে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সরকারি বেতনধারীরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, সামনেও পাবেন তারা কি কখনো চাইবেন সহসাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলুক। ওখানে করোনাই বড় অজুহাত। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সক্ষমতা থাকার পরও বেতন দিচ্ছে না, যেন দেখার কেউ নেই।’

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় সব কিছু স্বাভাবিক হলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে যারা গড়িমসি করছে তাদের বিষয়ে রেগুলেটরি বডির তৎপরতা বাড়ানো উচিত। তবে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সংস্থান হয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানের ভবনের ভাড়া, বিভিন্ন সেবা সংস্থার বিল পরিশোধসহ অন্যান্য খরচও তারা এই অর্থে পরিশোধ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় বন্ধ আছে। তাছাড়া এই দুর্যোগের মধ্যে ফি আদায়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে ঢাকা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি সংস্থাগুলো। এসব কারণে তারা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছে। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা চেয়ে আবেদন করেছে। সে প্রস্তাব আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। প্রণোদনা দেওয়ার কাজটি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনভাতা প্রসঙ্গে ইউজিসির পরিচালক ড. ফখরুল ইসলাম সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের স্টাডি হচ্ছে, রাজধানীতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ হাজারের ওপরে এবং মফস্বলে ৮০০ থেকে ১ হাজার, সেসব বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে সচ্ছল। তাদের শিক্ষক-জনবলের বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সাময়িক আয় বন্ধের ইস্যুকে সামনে এনে এর প্রভাব বেতনের ওপর পড়ে থাকলে সেটা দুঃখজনক।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৫৫ হাজার বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে সংকটে। এগুলোর মধ্যে ৪০ হাজারই কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এছাড়া আছে বিভিন্ন রকম আধা-এমপিও, বেসরকারি ও প্রাইভেট স্কুল ৭ হাজার, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পৌনে ১০ হাজার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৬টি। কেজি স্কুলগুলোতে ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী আছেন। কারিগরি প্রতিষ্ঠানে জনবল প্রায় আড়াই লাখ। বেসরকারি ৯ হাজার নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় আছেন আরো অন্তত ৯০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। আর ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ২৯ হাজার। এছাড়া ইংরেজি মাধ্যমের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরো কয়েক হাজার শিক্ষক-কর্মচারী আছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সংকট।

পিডিএসও/হেলাল