লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান

  ০১ জুন, ২০২২

মাঙ্কিপক্স : প্রয়োজন সতর্কতা ও সচেতনতা  

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

আড়াই বছর ধরে পৃথিবী কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইরত। এ অতিমারি শেষ না হতেই আফ্রিকা অঞ্চলের বিরল মাঙ্কিপক্স হঠাৎই আফ্রিকার সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে পৃথিবীব্যাপী। এরই মধ্যে ২০টি দেশে প্রায় ৩০০ জনের মধ্যে সংক্রমণ ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী বৈঠক করেছে এবং বিশ্ববাসীকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও এশিয়ার কোনো দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি।

মাঙ্কিপক্সের পরিচয় : প্রকৃতপক্ষে মাঙ্কিপক্স মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশসমূহের গভীর অরণ্য এলাকার এক ধরনের ভাইরাস-সংক্রমিত রোগ। তবে রোগটির নাম মাঙ্কি ভাইরাস হলেও এ রোগের জীবাণুর আধার কিন্তু শুধু বানর নয়, ইঁদুর বা কাঠবিড়ালি জাতীয় প্রাণীর দেহেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সর্ব প্রথম গবেষণায় ব্যবহৃত বানরের দেহে এ রোগ শনাক্ত হয় বলে এর নাম মাঙ্কিপক্স বলে ধারণা করা হয়। মূলত সংক্রমিত ইঁদুর বা কাঠবিড়ালি জাতীয় প্রাণীকে খাবার হিসেবে ব্যবহারই প্রাথমিকভাবে এ রোগের কারণ হিসেবে জানা যায়।

গোড়ার কথা : ১৯৫৮ সালে ডেনমার্কের এক গবেষণাগারে ব্যবহৃত বানরের শরীরে এ রোগ শনাক্ত হয়। তবে মানুষের শরীরে এ রোগের অস্তিত্ব মিলে মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে ১৯৭০ সালে। ১৯৭০-৮০ সাল পর্যন্ত অর্ধশত মানুষ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয়। তৎপরবর্তী সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে ১৯৮০-৯০ সময়কালে একই দেশে তিন শতাধিক রোগীর সন্ধান মিলে, যাদের ৩৩ জনের মৃত্যু ঘটে। এ সময় প্রতিবেশী দেশ লাইবেরিয়া, আইভরিকোস্ট, সিয়েরালিওন ও নাইজেরিয়ায় এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯১-৯৯ সালে কঙ্গোতে দ্বিতীয়বারের মতো এ রোগের সন্ধান মেলে। এ সময় প্রায় ৫০০ জনের দেহে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। ২০০৩ সালে সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭০ জনের দেহে মাঙ্কিপক্স রোগ দেখা দেয়। জরিপে দেখা যায়, ঘানা থেকে আমদানি করা একটি ইঁদুরের খামারে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মূলত এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কঙ্গোতে পুনরায় ২০১১-১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রায় ২০০০ জনের মধ্য এ রোগের সংক্রমণ ঘটে। এ যাবৎকালে সবচেয়ে বেশি ৩০০০ জন আক্রান্ত হয় নাইজেরিয়ায় ২০১৭-১৯ সাল পর্যন্ত। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যে এবং ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরে সর্বপ্রথম একজন করে ব্যক্তি মাঙ্কিপক্স রোগে সংক্রমিত হয়, যারা সমসাময়িককালে নাইজেরিয়া ভ্রমণ করেছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই ব্যক্তির দেহে মাঙ্কিপক্স শনাক্ত করা হয়, তারা দুজনই নাইজেরিয়া ফেরত ছিল। তবে ২০২২ সালের মে মাসেই প্রথম কমিউনিটিতে মাঙ্কিপক্স ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি তাদের আফ্রিকার কোন দেশে সফরের প্রমাণও মিলেনি।

মাঙ্কিপক্স রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মাঙ্কিপক্সের প্রাথমিক উপসর্গ হচ্ছে মাথাব্যথা, পেশিব্যথা, জ্বর ও অবসাদ লাগা প্রভৃতি। উপসর্গগুলো জলবসন্ত, হাম এবং গুটি বসন্তের মতো। তবে গলায়, কানে, থুতনি ও ঊরুর কুচকিতে লিম্ফ নোডগুলো ফুলে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান; বিশেষ করে মুখ, হাত ও পায়ের তালু, যৌনাঙ্গ এবং চোখে পানিসহ ফুসকুরি দেখা যায়। এসব উপসর্গের স্থায়িত্ব প্রায় ২ থেকে ৪ সপ্তাহ হয়ে থাকে। যদিও মাঙ্কিপক্সের সুপ্তাবস্থা বলা হয়ে থাকে ১০-১৪ দিন, তবে ৬-১৩ দিনের মধ্যেও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। মৃত্যুহারের দিকে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কঙ্গো ধরনটির মৃত্যুহার অপেক্ষাকৃত বেশি (১০%) এবং পশ্চিম আফ্রিকার ধরনে মৃত্যুহার কম (১০%)।

মাঙ্কিপক্সের বিস্তার : প্রধানত সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শ, আঁচড়, কামড়, মাংস ভক্ষণ, নিঃসৃত বিভিন্ন তরলের সংস্রবের মাধ্যমে এ রোগ মানুষের দেহে ছড়ায়। মানুষের দেহে সংক্রমণের পর তার সংস্পর্শে আসা, একই বিছানা ও কাপড়চোপড় ব্যবহার বা শরীরের যেকোনো ধরনের নিঃসরণের মাধ্যমেও অন্যের দেহে এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ভাইরাস শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষত, নাক, মুখ ও চোখের ঝিল্লির মাধ্যমেও ছড়ায়। ২০২২ সালের সংক্রমণের পর সিডিসি বলেছে, কারো সংস্রব বা যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে এ রোগের সংক্রমণের হার বেশি। তবে আক্রান্তের একান্ত সান্নিধ্যে না আসাদের মধ্যে সংক্রমণের হার কম। মাঙ্কিপক্স যৌনবাহিত রোগ কি না তা নিয়ে মতপার্থক্য ও গবেষণা চলছে। কারণ ইউরোপ ও আমেরিকায় নতুনভাবে যাদের দেহে সংক্রমিত হয়েছে, তাদের কারোরই আফ্রিকার কোনো সংক্রমিত দেশ ভ্রমণের তথ্য মিলেনি। এ ভাইরাসের ধরন বা বিস্তার কৌশল পরিবর্তনের ওপরও গবেষণা চলছে।

রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা : আক্রান্তের শরীরের ক্ষত থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে এ ভাইরাস শনাক্ত নিশ্চিত করা যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সিডিসি বলেছে, এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। কিন্তু এফডিএর মতে, প্রচলিত গুটি বসন্তের ভ্যাকসিন এ রোগের বিরুদ্ধে শতকরা ৮৫ ভাগ সফল। কতক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধেরও অনুমোদন দিয়েছে এ রোগের চিকিৎসায়; যেমন : Tecovirimat, Brincidofovir  ইত্যাদি। পাশাপাশি উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার পরামর্শও দিয়েছেন তারা। চিকিৎসা বা সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী বা স্বজনদের এ রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে গাউন, মাস্ক, গ্লাভস ও গগলস প্রভৃতি পিপিই ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাঙ্কিপক্স রোগ বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য হয়তো অচিরেই আসবে। তবে সুসংবাদের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার কোনো দেশে এ পর্যন্ত এ রোগের সংক্রমণের কোনো খরব এখনো পাওয়া যায়নি। তাই কর্তৃপক্ষ এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিমান, স্থল ও নৌবন্দরসমূহকে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশনা দেন। আক্রান্ত দেশসমূহ থেকে আগত যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপসর্গযুক্ত যাত্রীদের কমপক্ষে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন বা সঙনিরোধে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালসমূহকে লক্ষণযুক্ত রোগীকে আইসোলেশনে রাখার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আতঙ্ক নয়; মাঙ্কিপক্স রোগ বিষয়ে আমাদেশ সতর্ক ও সচেতন হওয়াই জরুরি।

লেখক : সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মাঙ্কিপক্স,সচেতনতা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close